বেশ আমি কাউকে বলবো না। কিন্তু সর্দার নূরীর জন্য যেভাবে ভেঙে পড়েছে তাতে আমাদের আস্তানা কেমন করে টিকবে রহমান ভাই?
আমিও সেই চিন্তায় অত্যন্ত বিচলিত হয়ে পড়েছি। সর্দার যদি এভাবে মুষড়ে পড়েন। তাহলে সব নষ্ট হয়ে যাবে। শুধু আমাদের আস্তানা আর দলবলই ভেঙে যাবে না সমস্ত দেশে আবার শুরু হবে ভদ্র নামি ভন্ড শয়তানদের পৈশাচিক নৃত্য। যারা দেশের জনগণের মঙ্গলের নামে তাদের বুকের রক্ত শুষে শুষে খায় আবার তারা মাথা চাড়া দিয়ে উঠবে।
তাহলে কি করবে রহমান ভাই?
সেই কথা আমাকেও ভয়ানকভাবে ভাবিয়ে তুলেছে। কি করে সর্দারের মনের অবস্থা ফেরানো যায়? আমি সর্দারকে অনেকভাবে বুঝিয়ে সুঝিয়ে তার মা এবং বৌ-রাণীর কাছে পাঠিয়েছিলাম, কিন্তু সেখানেও তিনি টিকতে পারেননি। আমি সব জানি–বৌ-রাণীর সঙ্গে সর্দার এবার বড় উদাসীনভাবে কথাবার্তা বলেননি। তাই ভাবছি একি হলো নাসরিন একি হলো?
অত্যন্ত দুশ্চিন্তার কথা রহমান ভাই বৌ-রাণী আর তার মাও সর্দারকে স্বাভাবিক করতে পারেননি।
নাসরিন আর একটা কথা তোমাকে বলবো জীবন গেলেও তুমি কাউকে বলবে না।
বলো, বলবো না।
নাসরিন তোমাকেও বলতাম না কথাটা কিন্তু না বলে যে আমি পারছি না সহ্য করতে।
তুমি বলো রহমান ভাই আমি জীবন গেলেও কাউকে বলবো না।
যা অসম্ভব তাই আমি করেছিলাম। সে অপরাধের জন্য আমিই দায়ী। দোষ নেই কোনো সর্দারের–
কি হয়েছে বলো না?
নূরীকে আমি ভালবাসতাম জানো?
জানি তুমি তাকে গভীরভাবে ভালবাসতে।
কিন্তু নূরী আমাকে কোনোদিন ভালবাসতে পারেনি।
হাঁ, আমাকে সে অনেকদিন বলেছিলো এ কথা। বলতো নূরী–নাসরিন, জানিস আমি কত বড় হৃদয়হীন। রহমান আমাকে কত ভালবাসে কিন্তু আমি ওকে একটুও ভালবাসতে পারি না। সত্যিই ওর জন্য আমার বড় করুণা হয়। কিন্তু কি করবো মনের সঙ্গে তো যুদ্ধ চলে না।
তোমাকেও সে বলেছিলো তাহলে কথাটা?
হাঁ বলেছিলো–আরও বলেছিলো–হুঁরকে আমি ভালবেসেছি। ওকে মন-প্রাণ দিয়ে গ্রহণ করেছি। কি করে আমি আর একজনকে ভালবাসবো। আর কাউকে ভালবাসবার পূর্বে আমার যেন মৃত্যু হয়।
নাসরিনের কথায় রহমানের চোখ দুটো হঠাৎ অদ্ভুতভাবে দপ দপ করে উঠলো। বললো রহমান-নাসরিন নূরীর বাসনা সফল হয়েছে। যা সে চেয়েছিলো প্রাণভরে পেয়েছে। তার কামনার জনকে একান্ত আপন করে পেয়েছিলো–
সর্দার তাকে–
হাঁ নাসরিন আমিই তাকে সর্দারের হাতে সঁপে দিয়েছিলাম খোদাকে স্বাক্ষী করে। আর স্বাক্ষী ছিলো আরাকান জঙ্গলের বৃক্ষ লতা পাতা জীবজন্তু।
নাসরিনের দু’চোখে বিস্ময় ঝরে পড়তে লাগলো। কোনো কথা তার মুখ দিয়ে উচ্চারণ হলো না।
রহমান বলে চললো সেই আরাকানে সর্দার আর নূরী রচনা করলো সোনার স্বর্গ। কিন্তু সে স্বর্গ আজরাইলের এক ফুকারে ভেঙে চুরমার হয়ে গেলো। সর্দারের বুক থেকে আরাকান বাসি ডাকু ভোলানাথ ছিনিয়ে নিলো নূরীকে। তীর বিদ্ধ করে হত্যা করলো তাকে।
উঃ কি নিদারুন সংবাদ। উঃ আমিই সহ্য করতে পারছি না। আমিই সহ্য করতে পারছি না রহমান ভাই। নূরীর স্মৃতি আমাকে পাগল করে তুলেছে।
রহমান এবার স্থির কণ্ঠে বললো–কিন্তু ভেঙে পড়লে তো চলবে না। ধৈর্য ধরতে হবে, যে গেছে সে আর ফিরে আসবেনা কিন্তু রক্ষা করতে হবে আমাদের সর্দারকে।
সত্যি রহমান ভাই, সর্দারের মনোভাব সচ্ছ না হলে আমাদের সবকাজ পন্ড হয়ে যাবে।
কিন্তু কি করা যায় কি করে সর্দারের মনকে স্বাভাবিক করে তোলা যায়? এক কাজ করতে পারবে নাসরিন?।
বলো কি করতে হবে?
সর্দারের সেবা-যত্নের ভার তুমিই গ্রহণ করবে। যাতে তার মনোভাব ধীরে ধীরে আবার স্বাভাবিক হয় সেই চেষ্টা করবে তুমি। কেমন পারবে তো?
পারবো।
নাসরিন এখন তুমিই ভরসা আমি জানি বৌ-রাণী যা পারেনি তুমি তা পারবে।
নাসরিন কোনো কথা বললো না।
রহমান বললো–যাও নাসরিন, সর্দার তার কক্ষে আছেন। তিনি এখনও কিছু মুখে দেননি। তারজন্য খাবার নিয়ে যাও।
আচ্ছা যাচ্ছি।
নাসরিন চলে যায়।
কিন্তু অল্পক্ষণ পরে ফিরে আসে নাসরিন মুখে চোখে তার উদ্বিগ্নতার ছাপ রহমান ভাই, সর্দার তার কক্ষে নেই।
সর্দার তার কক্ষে নেই! বলো কি? একটু পূর্বেই তাকে তার কক্ষে দেখে এসেছি। চলো দেখি কোথায় গেলেন তিনি।
রহমান আর নাসরিন মিলে সমস্ত আস্তানা তন্ন তন্ন করে খুঁজলো কিন্তু কোথাও তারা সর্দারকে খুঁজে পেলোনা।
রহমান ছুটে গেলো ঘোড়াশালে। আরও অবাক হলো সে–সর্দার নেই তাজও নেই। এবার বুঝতে পারলো রহমান সর্দার তাজকে নিয়ে উধাও হয়েছে। কোথায় গেছে কে জানে।
সর্দারের অন্তর্ধানে সমস্ত আস্তানায় একটা গভীর অশান্তির ছায়া ঘনিয়ে এলো, বিশেষ করে রহমান মুষড়ে পড়লো দুশ্চিন্তায়।
*
বনহুর আজ তার নিজের ড্রেসে সজ্জিত হলো। শরীরে জমকালো ড্রেস, মাথায় কালো পাগড়ি মুখে গালপাট্টা বাঁধা। কোমরের বেল্টে রিভলভার। পায়ে কালো বুট।
তাজের পাশে এসে দাঁড়ালো বনহুর।
তাজ প্রভুকে দেখতে পেয়ে আনন্দে সম্মুখের পা দিয়ে মাটিতে আঘাত করতে লাগলো।
বনহুর উঠে বসলো তাজের পিঠে।
আবার সেই পথ সেই মাঠ-প্রান্তর–বনানী ঢাকা কত পল্লী। সব ছাড়িয়ে বনহুর তাজের পিঠে উল্কাবেগে ছুটে চলেছে। বনহুরের গন্তব্য স্থান সেই আরাকান জঙ্গল।
যে জঙ্গলে নূরী শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেছে।
