এমন সময় নূর এসে দাঁড়ালো তার পাশে বললো–দাদীমা, তাজ কোথায় গেলো? ওকে তো দেখছিনা!
চলে গেছে দাদু।
কেনো গেলো? আমার বাপির সঙ্গে গেছে বুঝি!
হাঁ তোমার বাপির সঙ্গে তাজও চলে গেছে।
আবার কবে আসবে?
নূরের কথায় কোনো জবাব দিতে পারলেন না মরিয়ম বেগম। আঁচলে অশ্রু মুছে নিয়ে। বললেন–চলো দাদু, সরকার দাদার সঙ্গে আজ স্কুলে যাবে।
স্কুলের কথায় খুশি হলো নূর, পড়াশোনায় নূরের অত্যন্ত আগ্রহ। আরাকান স্কুলে সে তার সঙ্গীদের মধ্যে পড়াশোনা বা খেলাধুলায় ছিলো সেরা ছাত্র। নূরের সুন্দর চেহারা আর তার সর্বদিকে গুণাগুণ দেখে স্কুলের মাষ্টার গণ মুগ্ধ হয়ে যেতেন।
মরিয়ম বেগম নূরকে নিয়ে ফিরে গেলেন অন্দর বাড়িতে।
তারপর সরকার সাহেবকে বলে কান্দাই স্কুলে ভর্তি করে দিলেন মরিয়ম বেগম তার একমাত্র সন্তানের স্মৃতিচিহ্ন নূরকে।
নূরকে নিয়ে মরিয়ম বেগম আর মনিরা গড়তে লাগলো কতো আশার স্বপ্নে। নূর লেখাপড়া শিখে মানুষ হবে, একদিন তার সুনাম ছড়িয়ে পড়বে গোটা শহরে।
মরিয়ম বেগম ভাবলেন পুত্রকে নিয়ে তার বাসনা পূর্ণ হয়নি। পুত্রের সন্তানকে নিয়ে রচনা। করবেন এক কল্পনার রাজ্যে।
মনিরাও নূরকে পেয়ে উপস্থিত স্বামীর কথা ভুলে থাকতে চেষ্টা করতে লাগলো। মনকে ভরসা দিলো এমন তো আরও কতদিন চলে গেছে আবার ফিরে এসেছে তার পথে।
কিন্তু মনিরা এবার অন্যান্য বারের মত আশ্বস্ত হতে পারলো না কারণ এবার সে স্বামীকে যেন সর্বান্তকরণে পায়নি, কোথায় যেন একটা বাধা তাদের উভয়ের মধ্যে প্রাচীর সৃষ্টি করেছিলো। স্বামীর আনমনা উদাসীন ভাব মনিরার অন্তরে শুধু ব্যথাই দেয়নি, একটা অসহ্য জ্বালা অনুভব করেছে সে মনে।
স্বামীর পূর্বের আচরণ স্মরণ করে হাহাকার করে উঠেছে মনিরার হৃদয়। কোথায় যেন হারিয়ে গেছে তার স্বামী। পাশে পেয়েও যেন না পাওয়ার শূন্যতা তাকে অস্থির করে তুলেছে। কত কথা কত হাসি গান ছিলো মনিরার মনের গহনে কিন্তু স্বামীর ব্যবহারে সব নিঃশেষ হয়ে শুকিয়ে গিয়েছিলো এতোটুকু প্রকাশ করতে পারেনি সে।
মনিরার পাশ থেকে যখন তার স্বামী চলে গেলো তখন সে শুধু অশ্রু বিসর্জনই করে নি, স্বামীকে সে যেন আজ নুতন করে হারালো।
*
চোরের মত চুপি চুপি পা টিপে টিপে রহমানের কাছে এসে দাঁড়ালো নাসরিন। চারিদিকে সতর্ক দৃষ্টি নিক্ষেপ করে নিয়ে বললো সে–রহমান ভাই, একটা কথা তোমাকে জিজ্ঞাসা করবো ঠিক জবাব দেবে?
রহমান তার রাইফেলটা পরিস্কার করছিলো, নাসরিনের কথায় মুখ না তুলেই বললো– দেবার মত হলে নিশ্চয়ই দেবো।
নাসরিন তার একবার এপাশ-ওপাশ তাকিয়ে দেখে নিয়ে বললো–আচ্ছা রহমান ভাই, সর্দারের কি হয়েছে বলতে পারো?
এবার রহমান সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে তাকালো নাসরিনের মুখে। রহমানের মুখমন্ডল গম্ভীর হয়ে উঠেছে বললো ধীর শান্ত গলায় সর্দারের মনের অবস্থা ভাল নেই নাসরিন।
তাতো দেখতেই পাচ্ছি। সব সময় নির্জনে বসে কি যেন ভাবনে, যেখানে বসে থাকেন আর যেন উঠতে চান না। কই আগে তো তিনি কোনোদিন এমন ছিলেন না? এবার তাকে সব সময় ভাবাপন্ন দেখছি। কি হয়েছে তার বলোনা রহমান ভাই?
একটা অভাব তাকে গভীরভাবে আচ্ছন্ন করে ফেলেছে নাসরিন, যে অভাব তার কোনদিন পূরণ হবে না।
কি এমন অভাব বলোনা রহমান ভাই?
একটা দীর্ঘশ্বাস রহমান চেপে গেলো যেন!
নাসরিন বললো–শুধু সর্দারকেই নয়, এবার তোমরা ফিরে আসার পর তোমাদের দু’জনাকেই কেমন যেন সদা সর্বদা উদাসীন লাগে তোমারও যেন কিছু হয়েছে। তবে কি তুমিও কিছু হারিয়েছো?
সর্দারের অভাবটা আমার বুকেও শেল বিদ্ধ করেছে নাসরিন। আমি নিজকেও সর্দারের সঙ্গে জড়িয়ে ফেলেছি।
নাঃ তোমার হেয়ালী ভরা কথা আমি কিছু বুঝতে পারছি না। কি হয়েছে তোমাদের দুজনার বলবে তো?
শুনলে তুমিও ভেঙে পড়বে নাসরিন তাই কথাটা তোমাকে বলা হয়নি। শুধু তোমাকেই নয় আস্তানার কেউ জানেনা ও কথা।
কি এমন কথা যা বলতে তোমাদের এতো আপত্তি? অথচ তোমরা উভয়ে হৃদয়ে হৃদয়ে গুমড়ে মরছো সেই গোপন কথাটার জন্য। সর্দার কি কোনো মেয়েকে ভালবেসে ফেলেছেন?
সর্দার নতুন করে কাউকে ভালবাসেননি তবে ভালবাসার জনকে হারিয়েছেন।
সেকি! সর্দার কি তবে বৌ-রাণীকে–
না।
তবে?
নাসরিন, নূরীর মৃত্যু ঘটেছে।
নূরীর মৃত্যু ঘটেছে। অস্ফুট আর্তনাদ করে উঠলো যেন নাসরিন।
রহমান অতিকষ্টে নিজকে সামলে নিয়ে বললো–তোমরা জানো আমি নূরীকে দূরে কোনো গোপন স্থানে লুকিয়ে রেখেছি। কিন্তু আসলে নূরী ইহজগতে আর বেঁচে নেই।
উঃ এ সব তুমি কি বলছো রহমান ভাই?
নাসরিনের চোখ দুটো দিয়ে পানির ধারা নামলে কাঁদতে লাগলো নাসরিন। নূরীকে সে শুধু ভালই বাসতো না নূরী তার ছোট বেলার সঙ্গী সাথী। এক সঙ্গে খেলা-ধুলা করে এতো বড় হয়েছিলো ওরা। আজ সেই নূরীকে হারিয়ে নাসরিন যেন ভেঙে পড়লো কান্নায়!
কিছুক্ষণ পর নাসরিন অনেকটা প্রকৃতিস্থ হয়ে উঠেলো।
রহমান বললো–নূরীর শোকে সর্দার মুষড়ে পড়েছেন নাসরিন। একটু থেমে পুনরায় বললো সে–আগে জানতাম না তাকে এতো ভালবাসতেন সর্দার।
হাঁ সত্যি বলছো রহমান ভাই-নূরীকে সর্দার এতো ভালবেসেছিলো আগে বুঝতে পারিনি।
রহমান আর নূরী নিশ্চুপ হয়ে রইলো কিছুক্ষণ।
রহমানই বললো আবার নূরীর মৃত্যু-সংবাদ আস্তানায় কাউকে বলো না তুমি। দাইমা কথাটা শুনলে সব সময় কান্নাকাটি করবে। এতে সর্দারের মনের অবস্থা আরও খারাপ হবে।
