না-না-না, আমি নূর–আমি নূর–যাই দাদীমা আমাকে ডাকছে নূর বেরিয়ে যায়।
বনহুর বসে পড়ে মনিরার পাশে দক্ষিণ হস্তে মনিরার চিবুক উঁচু করে ধরে বলে লক্ষীটি আমার উপর রাগ করেছো?
মনিরা হঠাৎ স্বামীর বুকে মুখ লুকিয়ে উচ্ছ্বসিতভাবে কেঁদে উঠে। কোনো কথা বলতে পারেনা সে।
পাশের ঘরে তখন মরিয়ম বেগম আর নূরের কণ্ঠস্বর শোনা যায়। নূর বলছে–দাদীমা আমাকে এখন থেকে নূর বলে ডেকো মা বলেছে নূর নাকি খুব সুন্দর নাম।
আচ্ছা দাদু, আমিও তোমাকে নূর বলে ডাকবো। কিন্তু তোমাকে আর একটা কাজ করতে হবে, বলো করবে?
নিশ্চয়ই করবো, বলো দাদীমা?
বলছি, কাজ মানে সোজা কাজ–পড়াশোনা করা।
ওঃ এই কথা। তুমি বুঝি জানোনা দাদী মা, আমি কত পড়তে পারি।
তাই নাকি? আচ্ছা, আজকেই আমি সরকার সাহেবকে বলবো তোমার জন্য বই কিনে আনতে।
আমি স্কুলে ভর্তি হবো দাদীমা।
বেশতো, কালকেই তোমাকে স্কুলে ভর্তি করে দেবো। লেখাপড়া শিখে মস্ত-বড় নামকরা মানুষ হবে, কেমন?
নূর তখনই পাশের টেবিল থেকে একটা বই নিয়ে দাদীমার বিছানায় উঠে বসে, এই দেখো আমি সব অক্ষর চিনি।
চমৎকার আমার দাদু, আমি তো কিছু চিনিনা, তুমি আমাকেও শেখাবে বুঝলে?
শেখাবো, নিশ্চয়ই শেখাবো। জানো দাদীমা আমি লেখাপড়া শিখে কি করবো?
কি করবি দাদু?
পাশের ঘরে সব শুনতে পাচ্ছিলো বনহুর আর মনিরা।
স্বামীর বুকে মাথা রেখে চোখ বুজে ছিলো সে।
বনহুর ধীরে ধীরে হাত বুলিয়ে দিচ্ছিলো মনিরার মাথায়।
মরিয়ম বেগমের কথায় বললো নুর–আমি লেখাপড়া শিখে মস্ত বড় পুলিশ অফিসার। হবো। মস্ত মস্ত দস্যুকে আমি গ্রেপ্তার করবো–
মনিরা শিউরে উঠলো, তাকালো স্বামীর মুখের দিকে।
মরিয়ম বেগমের অন্তরটাও কেঁপে উঠলো শিশু নূরের কথায়। তার কোনো কথা আর শোনা গেলো না।
*
গভীর রাতে ঘুম ভেঙে যায় মনিরার। পাশ ফিরতেই চমকে উঠে, শিউরে উঠে তার অন্তর। শুন্য বিছানা, স্বামী তার পাশে নেই। আশঙ্কা ভরা আকুল হৃদয় নিয়ে উঠে বসে ব্যাকুল। আঁখি মেলে তাকায় কক্ষমধ্যে চারিদিকে।
একটা বেদনা মোচড় দিয়ে উঠে মনিরার হৃদয়ে।
মনিতো এখন তার দাদীমার কাছে শোয়, তার বিছানায় একমাত্র তার স্বামী ছিলো। এই গভীর রাতে কোথায় গেলো তবে সে! তবে কি পালিয়ে গেছেমনিরা চিন্তিতভাবে উঠে দাঁড়ালো শয্যা ত্যাগ করে। দরজায় দৃষ্টি পড়তেই বিস্মিত হলো দরজা অর্ধ ভেড়ানো রয়েছে।
মনিরা ছুটে গেলো দরজার পাশে, দরজা খুলে বেরিয়ে এলো বাইরে মামীমা, মামীমা
মরিয়ম বেগমের ঘুম ভেঙে গেলো, দ্রুত কক্ষ থেকে বেরিয়ে মনিরার আকুল ভরা কণ্ঠস্বরে ভয়াতুরভাবে বলে উঠলেন কি হয়েছে মনিরা? কি হয়েছে?
মামীমা, সে চলে গেছে।
মরিয়ম বেগম স্তব্ধ হয়ে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে বললেন–জানতাম ওকে ধরে রাখা যাবে না।
মনিরা ডুকরে কেঁদে উঠলো।
মরিয়ম বেগম মনিরার পিঠে-মাথায় হাত বুলিয়ে সান্ত্বনা দিতে লাগলেন।
মরিয়ম বেগম উঠে আসতেই নূরের ঘুম ভেঙে গিয়েছিলো। নূরও এসে দাঁড়ালো সেখানে,বললো সে দাদীমা, মা মণি কাঁদে কেনো?
মরিয়ম বেগম নূরকে বুকের কাছে টেনে নিয়ে বললেন–তোমার বাপি চলে গেছে।
বাপি চলে গেছে? তাই মা-মনি কাঁদছে বুঝি?
হাঁ নূর, তোমার বাপি চলে গেছে তাই তোমার মা-মণি কাঁদছে।
নূর এবার মনিরার পাশে গিয়ে নিজের হাত দিয়ে তার চোখের পানি মুছিয়ে দিয়ে বললো–কেঁদোনা মা-মণি বাপি চলে গেছে আমি তো আছি। আমি তোমাকে ছেড়ে কোথাও যাবো না।
মনিরা নূরকে বুকে চেপে ধরে অস্ফুট কণ্ঠে বললো–বাপ আমার।
মরিয়ম বেগম একটা শান্তির নিশ্বাস ফেললেন।
*
এখানে যখন মনিরা শিশু নূরকে বুকে আঁকড়ে ধরে সান্তনা খুঁজছিলো তখন তাজের পিঠে বনহুর ছুটে চলেছে। বন-প্রান্তর পেরিয়ে উল্কা বেগে ছুটছে রাত্রির অন্ধকার ভেদ করে এগুচ্ছে তাজ।
তাজের জমকালো দেহটা যেন মিশে গেছে নিচ্ছিদ্র অন্ধকারে। বনহুরের শরীরে নাইট ড্রেস। কারণ সে ঘুম থেকে জেগেই পালিয়েছে, নাইট ড্রেসটা পাল্টে নেবার সময়ও তার হয়নি।
বনহুর যেদিন তার বাড়িতে গিয়ে হাজির হয়েছিলো, তাজের পিঠেই গিয়েছিলো সে। তাজ সেদিন হতে চৌধুরী-বাড়ির বাগান মধ্যে অবস্থান করছিলো।
মনিরাও তাজকে আদর করতো, স্বামীর সঙ্গে তাজের পাশে দাঁড়িয়ে ওর গায়ে-পিঠে হাত বুলিয়ে দিতো। কখনও বা নিজের হাতে ছোলা-ঘাস খাইয়ে দিতো। শুধু মনিরাই নয় মাঝে মাঝে তাজের কাছে যেতেন মরিয়ম বেগম। কিন্তু নিকটে যেতে সাহসী হতেন না। তাজের বিরাট উচ্চতা আর তার চর্চকে জমকালো চেহারা মরিয়ম বেগমের মনে একটা ভীতির সৃষ্টি করতো।
তাজকে মরিয়ম বেগম ভয়ও করতেন, যেমন তেমনি তাজের বলিষ্ঠ সুন্দর দেহটা দেখে মনে মনে আনন্দ বোধ করতেন গর্বে ভরে উঠতো তার বুক দস্যু বনহুরের অশ্বই বটে।
নিস্পলক নয়নে তাকিয়ে থাকতেন তিনি তাজের দিকে। জীবনে তিনি কত অশ্ব দেখেছেন কিন্তু এমন অশ্ব তিনি কখনও দেখেননি। তাজকে দেখলে লোকের মনে সন্দেহ জাগতে পারে তাই মরিয়ম বেগম সরকার সাহেবকে বলে দিয়েছিলেন, তাজকে বাগানবাড়িতে হেফাজতে লুকিয়ে রাখতে।
প্রতিদিন ফজরের নামাজান্তে মরিয়ম বেগম বাগানবাড়ীতে যেতেন, দূর থেকে তাজকে তিনি দেখতেন। খুশিতে মন তার ভরে উঠতো।
এটা মরিয়ম বেগমের কতকটা অভ্যাসে পরিণত হয়েছিলো। অন্যান্য দিনের মতো আজও মরিয়ম বেগম এসে দাঁড়ালেন বাগান বাড়িতে। যেখানে তাজ বাঁধা থাকতো সেই দিকে তাকিয়ে রইলেন নিষ্পলক নয়নে। শূন্য জায়গাটা খাঁ খাঁ করছে। মরিয়ম বেগমের মুখমন্ডল বিষণ্ণ-মলিন হয়ে উঠলো, একটা ব্যথা মোচড় দিয়ে উঠলো তাঁর মনের মধ্যে। গন্ড বেয়ে গড়িয়ে পড়লো ফোঁটা ফোঁটা অশ্রু।
