পুত্রের এই আনমনা ভাব মরিয়ম বেগমকেও ভাবিয়ে তোলে আগে তো সে কোনো দিন অমন ছিলো না। সদা চঞ্চল-উচ্ছল স্বভাব ছিলো তার মনিরের। মা পুত্রের চিন্তিত ভাব লক্ষ্য করে উদ্বিগ্ন হয়ে উঠেন।
সেদিন দ্বিপ্রহরে মরিয়ম বেগম নিজের ঘরে বসে বসে পত্রিকা দেখছিলেন, এমন সময়। কক্ষে প্রবেশ করে মনিরা। চোখে-মুখে একটা বিষণ্ণতার ছাপ।
কক্ষে প্রবেশ করে বলে মনিরা–মামীমা।
কে মনিরা আয় মা আয় কিছু বলবি?
মামীমা, আমি যে আর সহ্য করতে পারছি না, ওর এই উদাসীনতা আমাকে পাগল করে তুলেছে। আমি যে আর সহ্য করতে পারছি না মামীমা–
কি জানি মনিরের কি হয়েছে, আমি নিজেও যে ভেবে উঠতে পারছি না ও তো অমন ছিলো না কোনো দিন–মরিয়ম বেগম কথাগুলো অত্যন্ত ব্যথাপূর্ণভাবে বললেন।
মনিরা ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগলো।
এমন সময় বনহুর মনিকে কোলে নিয়ে কক্ষে প্রবেশ করলো। ডাকলো বনহুর মাকে –মা।
মনিরা তাড়াতাড়ি আঁচলে অশ্রু মুছে নিয়ে সরে বসলো।
বনহুর মনিকে কোল থেকে নামিয়ে দিয়ে বললো–মা, দেখো মনি কি সুন্দর গল্প বলতে শিখেছে।
গল্প? কই দাদু এসোতো শুনি?
মরিয়ম বেগম মনিকে টেনে নিলেন কোলের কাছে। আদর করে বললেন–কই কি শোনাবে এসো।
বনহুর চলে যাচ্ছিলো।
মরিয়ম বেগম পিছু ডাকলেন–বোস তোর সঙ্গে আমার কথা আছে। আচ্ছা দাদু তোমার গল্প পরে শুনবো, এখন মায়ের সঙ্গে ও ঘরে গিয়ে গল্প করো গে কেমন?
মনি ঘাড় কাত করে সম্মতি জানালো।
মনিরা বুঝতে পারলো মামীমা তাকে ঘর থেকে বেরিয়ে যাবার জন্য ইংগিত করলেন।
মনি এগিয়ে গেলো তার মায়ের পাশে। মনিরা ওকে সঙ্গে করে বেরিয়ে গেলো কক্ষ থেকে।
মরিয়ম বেগম বললেন –বোস আমার কাছে।
বনহুর লক্ষী ছেলের মতো বসে পড়লো মায়ের শয্যায়।
মরিয়ম বেগম এবার গম্ভীর কণ্ঠে বললেন–মনির তুমি কচি খোকা নও। সব তুমি বোঝ। ছোট বেলায় তোমাকে হারিয়ে আমার অন্তর পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। এখন যদি আমাকে সেই আগুন পোহাতে হয়–
ঐ তো পুরোন কথা মা।
কি হয়েছে মনির, আমি তোর মা আমার কাছে লুকোবি না। বল্ কি হয়েছে তোর?
আমার। কই কিছু তো হয়নি?
হয়নি বললেই আমি বিশ্বাস করব? আমি তোর মা আমাকে ছুঁয়ে বল্ তোর কিছু হয়নি?
মা!
মনির তোর উদাসীন ভাব শুধু আমাকেই ভাবিয়ে তোলে নি মনিরার মনে দাহ শুরু করেছে। কত দিন পর বাড়ি ফিরে এসেছিস কই প্রাণ খুলে কোনো দিন তো মনিরার সঙ্গে কথা বললি না? সে তোর স্ত্রী-স্বামীর ভাবাপন্ন ভাব নারীর কি যে যাতনাকর সে তুই বুঝবিনে।
মা আমি সব জানি, সব বুঝি। কিন্তু আমি পারি না প্রাণ খুলে হাসতে কথা বলতে।
কেন! কি হয়েছে তোর?
আমি সব হারিয়েছি মা।
সব হারিয়েছিস তাতে দুঃখ কি। আমার তো কোনো অভাব নেই বাবা। তোর মতো এক গাদা সন্তান যদি আমার বসে বসে খায় তবু কারো কাছে হাত পাততে হবে না।
মা, তুমি বুঝবে না।
তুই কি চাস আমাকে বল আমি তাই দেবো তোকে।
পারবে না মা, পারবে না। একটা দীর্ঘশ্বাস ত্যাগ করে বনহুর।
মরিয়ম বেগম বুঝতে পারে তার সন্তান এমন কিছু হারিয়েছে যা সে আর পাবে না।
বনহুর উঠে বেরিয়ে যায় কক্ষ থেকে।
মরিয়ম বেগমের কক্ষ থেকে বনহুর বেরিয়ে আসতেই ছুটে এসে জড়িয়ে ধরে মনি–বাপি!
আড়ালে দাঁড়িয়ে লুকিয়ে দেখছিলো মনিরা।
বনহুর মনিকে কোলে তুলে নেয়।
মবি বলে উঠে–বাপি মা তোমাকে ডাকছে।
মা?
হাঁ, বাপি চলোনা মার কাছে।
বনহুরের হাত ধরে টেনে নিয়ে চলে মনি মনিরার কক্ষে।
মনিরা গম্ভীর মুখে খাটের পাশে গিয়ে বসেছিলো।
বনহুর আর মনি এসে দাঁড়ায়, মনির হাতের মুঠোয় বনহুরের হাত খানা।
মনি বলে–দেখো মা, আমি বাপিকে ধরে এনেছি।
আজ মনিরার বুক ভরে যায় মনির মুখে মা সম্বোধন তার অন্তরে সুধা বর্ষণ করে।
কদিন থেকে মরিয়ম বেগম মনিকে বুঝিয়ে দিয়েছে মনিরাই তার জননী। ছোট বেলায় তাকে লোকে চুরি করে নিয়ে গিয়েছিলো, তাই সে জননীর স্নেহ থেকে বঞ্চিত হয়েছে। যাকে সে মাম্মি বলে ডেকেছে সে মা নয় সে মাম্মি তার পালিত মা।
কথাটা মনির অন্তরে রেখাপাত করেছিলো, বাপিকে পেয়ে খুশী হয়েছিলো সে– বলেছিলো তার দাদীমার কথাগুলো সত্যি কি না।
বনহুর বলেছিলো–সব সত্যি। তোমার দাদীমা কি কোনো দিন মিথ্যা বলতে পারেন? আরাকানে যাকে তুমি হারিয়েছো সে তোমার মা নয় মাম্মি। তোমার পালিতা মা।
মনি দাদীমার কথায় যতটা আস্বস্ত হতে পারেনি, বাপির কথায় সে বিশ্বাস করেছিলো মনিরাই তার মা।
শেষ পর্যন্ত মনিরাকে বলেছিলো মনি–তুমি সত্যিই আমার মা?
মনিরা নিজকে প্রকৃতিস্থ রাখতে পরেনি তখন, মনিকে বুকে চেপে ধরে বলেছিলো-বাপ আমার, আমি সত্যিই তোমার মা।
তারপর থেকে মনি’র মন আকৃষ্ট হয়েছিলো মায়ের দিকে।
মনিরা বলেছিলো–আমি তোমায় নূর বলে ডাকবো বাপ। আমার ডাকে সাড়া দেবে তো?
ঘাড় কাৎ করে সম্মতি জানিয়েছিলো মনি।
বনহুরের হাত ধরে মনি টেনে নিয়ে গেলো মায়ের পাশে–মা, দেখো বাপিকে ধরে এনেছি।
মা, সত্যি তুমি রাগ করেছো? বলো বলো, তাহলে আমাকে নূর বলে ডাকলে আমি কথা বলবোনা। মনি মুখ গম্ভীর করে রইলো।
মনিরা এবার কথা না বলে পারলোনা, বললো–আমি তোমার বাপির উপর রাগ করিনি নূর।
বাপি, মা তোমার উপর একটুও রাগ করেনি, দেখছোনা মা কেমন সুন্দর হাসছে।
বনহুর এবার বললো–আমিও তোমাকে নূর বলবো কেমন রাগ করবেনা তো?
