এবার মনি কিছুতেই মনিরাকে মা বা মাম্মি বলতে পারছিলো না। একটা সংঙ্কোচ তার কচি মনে বাধার সৃষ্টি করছিলো।
মা ও ছেলের মধ্যে এসেছিলো একটা বিরাটা ব্যবধান। মনিরা মনিকে যতই বুকে আঁকড়ে ধরতে যায় ততই মনি নিজকে সরিয়ে নেয় দূরে।
কিন্তু মরিয়ম বেগমকে মনি ভালবাসেন সেই অপরিচিত জায়গায় পরিচিত কাউকে না পেয়ে তাকেই সে অবলম্বন হিসাবে গ্রহণ করেছে। মরিয়ম বেগমের কাছে থাকে সে। মরিয়ম বেগমের পাশে ঘুমায়।
মনিরা ব্যথা ভরা বুকে নীরবে অশ্রু বিসর্জন করে। দূর থেকে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখে আর দীর্ঘশ্বাস ফেলে।
মরিয়ম বেগম মনিরাকে নির্জনে নিয়ে বুঝান মা, সন্তানকে ফিরে পেয়েছিস সেইতো তোর ভাগ্য। একদিন ওর মনের ভ্রম ভেঙে যাবে। তুই মা–বুঝতে পারবে সে।
কিন্তু আমি যে আর সহ্য করতে পারছি না মামীমা।
দুঃখ করিসনে। তুই তবু ফিরে পেলি তোর নয়নের মনিকে। আর আমি–আমার দিকে তাকিয়ে দেখতে এই বুকটা আমার জ্বলে পুড়ে খাক হয়ে যাচ্ছে। কি আগুন আমি পেটে ধরেছিলাম যার জ্বালায় আমি জ্বলে পুড়ে নিঃশেষ হয়ে গেলাম–
মা! মাগো।
হঠাৎ একটা কণ্ঠস্বরে এক সঙ্গে চমকে উঠলো মরিময় বেগম আর মনিরা। আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে উঠলো মুহূর্তে তাদের মুখমন্ডল।
দরজায় দাঁড়িয়ে বনহুর।
মরিয়ম বেগম অস্কুট ধ্বনি করে উঠলেন মনির! বাবা তুই এসেছিস!
মা! বনহুর ছুটে গিয়ে মাকে জড়িয়ে ধরলো–তুমি ভাল আছো মা? তারপর মনিরার দিকে। ফিরে তাকিয়ে বললো–তুমি কেমন আছো মনিরা?
মনিরার চোখ দুটো অশ্রু ছল ছল হলো, অভিমানে মুখ ভার করে বললো–ভালো আছি।
বনহুর শয্যায় বসে বললো–মা, তোমার হাতে আমাকে এক গেলাস পানি খেতে দাও মা।
বাছা, একি চেহারা হয়েছে তোর? অসুখ করেনি তো?
না মা, অসুখ আমার করেনি।
তবে এমন চেহারা? মরিয়ম বেগম পুত্রের মাথায় মুখে-বুকে হাত বুলিয়ে দেন। তারপর বলেন–আমি তোর জন্য পানি আনছি আবার যেন পালিয়ে যাস নে।
আর পালাবো না মা। এখন থেকে আমি সব সময় তোমাদের কাছে থাকবো।
সত্যি বলছিস বাবা?
হাঁ, দেখো আর আমি যাবোনা।
মরিয়ম বেগমের অন্তরে একটা শান্তির ধারা বয়ে গেলো। তিনি খুশি মনে বেরিয়ে গেলেন তার মনিরের জন্য পানি আনতে। শুধু পানি নিয়েই ফিরবেন না, খাবারও আনবেন নিজ হাতে তৈরী করে।
স্বামীর সাদর সম্ভাষণের প্রতিক্ষা করছিলো মনিরা। ক্ষুব্ধ অন্তর তার লালায়িত হয়ে উঠেছিলো স্বামীর আবেগ-ভরা বাহু-বন্ধনে আবদ্ধ হবার জন্য। কিন্তু আজ মনিরাকে বিফল হতে হলো।
বনহুর অন্যমনস্কভাবে কি যেন ভাবছে।
মনিরা ব্যথা পেলো, এমন তো কোনোদিন হয়নি। মনিরা ভেবেছিলো তার স্বামী মাকে পানি আনবার কথা বলে সুযোগ খুঁজছিলো হয়তো মনিরাকে কাছে পাবার জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠেছে। সে কিন্তু মা চলে যাবার পর স্বামীর মধ্যে যখন একটা আনমনা ভাব লক্ষ্য করলো, তখন তো কোনো দিন তাকে দেখে নি মনিরা।
মনিরা আর দাঁড়াতে পারলো না, বেরিয়ে গেলো কক্ষ হতে। পুত্র মনির ব্যবহারেই মনিরা সর্বান্তকরণে মুষড়ে পড়েছিলো। আবার স্বামীর এই দারুণ উপক্ষোয় ডুকরে কাঁদতে ইচ্ছা হলো তার। মনিরা বেরিয়ে গেলো নিজের কক্ষে–বালিশে মুখ গুঁজে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগলো।
মনিরা যখন কক্ষ থেকে বেরিয়ে যায় তখন বনহুর একটু অন্য মনস্ক হয়ে পড়েছিলো, পরক্ষণেই ডাকে–মনিরা। মনিরা–
কিন্তু মনিরা তখন কোথায়–নিজের ঘরে বিছানায় বালিশে মুখ গুঁজে ফুপে ফুপে কাঁদছে।
মরিয়ম বেগম নাস্তার থালা আর গেলাস ভরা ঠান্ডা পানি নিয়ে আসেন। কক্ষে প্রবেশ করে মনিরাকে না দেখে বলেন–মা মনিরা মনিরা। কথার ফাঁকে টেবিলে খাবার প্লেট রেখে বলেন –মনিরা গেলো কোথায় একটু খাওয়াবে।
বনহুর কোনো কথা না বলে পানির গেলাসটা হাতে তুলে এক নিশ্বাসে ঠান্ডা পানি পান করে গেলাস নামিয়ে রাখলো।
মরিয়ম বেগম বললেন–সেকি বাবা,শুধু পানি খেলি?
হাঁ মা, বড় পিপাসা। বড় পিপাসা—
মনিরা গেলো কোথায়?
চলে গেছে।
মনিরা চলে গেছে–কোথায় গেলো? বাবা তুই খা, একটু মুখে দে।
বনহুর মায়ের কথায় খাবার না খেয়েই বললো–মনি, কোথায় মা? কেমন আছে?
মনি ভালই আছে। সরকার সাহেবের সঙ্গে একটু বাইরে গেছে। তুই খেয়ে নে বাবা।
ক্ষুধা নেই মা, এখন কিছু খাবো না।
*
আচ্ছা, তোমার কি হয়েছে বলো তো? কোনো দিন তো অমন ছিলে না? স্বামীর ভাবাপন্ন মুখের দিকে তাকিয়ে বলে।
বনহুর আনমনে বসেছিলো জানালার পাশে। মনিরার কথায় চোখ তুলে তাকালো তার দিকে। কোনো কথা বললো না সে।
মনিরা বাষ্পরুদ্ধ কণ্ঠে বললো আবার –মনি আমাকে চিনতে পারো না। তুমিও কেমন হয়ে গেছো! আমি কি নিয়ে বেঁচে থাকবো–অমি কি নিয়ে বেঁচে থাকবো বলো?
মনিরার গন্ড বেয়ে গড়িয়ে পড়ে তপ্ত অশ্রু।
বনহুর আবার মুক্ত জানালা দিয়ে তাকায় দূরে–অনেক দূরে বেলা শেষের সূর্য যেখানে অস্তমিত হচ্ছে।
স্বামীর এই উদাসীন ভাব মনিরার অন্তরে শেল বিদ্ধ করে চলেছে। আজ কদিন হলো এসেছে বনহুর কিন্তু একটিবার সে প্রাণ খুলে হাসে নি। সচ্ছ মনে কথা বলেনি মনিরার সঙ্গে। মনিরা লক্ষ্য করেছে তার স্বামী নির্জনে বসে সব সময় কি যেন ভাবে। কারো পদশব্দে যেন চমকে উঠে, মনিরা পাশে থাকলে মুখভাব গম্ভীর হয়।
মনিরা সব সহ্য করে এসেছে–শুধু তার স্বামীর হাস্য-উজ্জ্বল মুখ স্মরণ করে আজও বেঁচে আছে সে।
