শুধু ভোলানাথ নই, আমি তোমার নূরীকে হত্যা করেছি; এলিনার বুকে ছোরা বসিয়ে দিয়েছি, যৌথের বুকে গুলী বিদ্ধ করে তার কণ্ঠ চিরতরে রুদ্ধ করে দিয়েছি, এবার তোমার বুকের রক্ত শুষে নেবো কুমার
ভোলানাথের কথা শেষ হয় না, আরাকানের পুলিশবাহিনী সহ কক্ষে প্রবেশ করে রহমান।
ইন্সপেক্টার কঠিন কণ্ঠে বলে উঠেন–হ্যান্ডস্ আপ।
মুহূর্তে কক্ষমধ্যে যেন একটা বজ্রপাত হয়, ভোলানাথ ও তার সঙ্গীগণের মুখ বিবর্ণ ফ্যাকাসে হয়ে উঠে। একটি শব্দ কারো মুখ দিয়ে বের হয়না।
বনহুরের মুখমন্ডলহাস্য-উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। ইন্সপেক্টারের আদেশে পুলিশবাহিনী ভোলানাথ ও তার দলবলের হাতে হাত কড়া পরিয়ে দিলো।
দুজন পুলিশ ভোলানাথের দলের হাতের পিস্তলগুলি নিয়ে এক জায়গায় জড়ো করে রাখলো।
ইন্সপেক্টার রহমানকে রক্ষা করে বললেন রহমান, তোমার বুদ্ধি বলে আজ আমরা ডাকু ভোলানাথ ও তার দলবলকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হলাম। এই শয়তানদের জন্য আরাকান শহরবাসী অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিলো। পথেঘাটে সদা-সর্বদা রাহাজানি নারী-হরণ, চুরি ডাকাতি লেগেই থাকতো। আজ শয়তান ভোলানাথের মুখে নিজ কানে শুনেছি সে শুধু ডাকুই নয়, পর পর কয়েকটা নরহত্যা সে করেছে। কাজেই বিচারে মৃত্যুদন্ড তার সুনিশ্চিত। তারপর বনহুরের দিকে হাত বাড়ালেন ইন্সপেক্টার কুমার বাহাদুর, আপনাকে ঠিক সময় উদ্ধার করতে পেরেছি সে জন্য আনন্দ বোধ করছি।
বনহুর গম্ভীর কণ্ঠে বললো–ইন্সপেক্টার, আপনার কাছে চির কৃতজ্ঞ রইলাম।
হেসে বললেন ইন্সপেক্টার–আপনার ভত্য রহমান মিয়াই প্রথমে ধন্যবাদের পাত্র। আমি সরকারের তরফ থেকে তার মোটা বখশীসের ব্যবস্থা করে দেবো।
বনহুর আর রহমান একবার দৃষ্টি বিনিময় করলো।
রহমান বিনীত কণ্ঠে বললো –শুকরিয়া ইন্সপেক্টার সাহেব।
পুলিশবাহিনী মিঃ লারলং যৌথের লাশ পোষ্টমর্টেমের জন্য মর্গে পাঠানোর ব্যবস্থা করে বিদায় গ্রহণ করলেন।
সবাই বিদায় গ্রহণ করার পর বনহুর রহমানকে বুকে জড়িয়ে ধরে বাষ্পরুদ্ধ কণ্ঠে বলে। উঠে আজ তোমার কাছে আমার পরাজয়। রহমান।
সর্দার, এ আপনি কি বলছেন।
হাঁ রহমান। তোমার কাছে আজ আমি নতি স্বীকার করছি।
দস্যু বনহুর এই প্রথম কোনো ব্যক্তির কাছে নিজ মুখে কথাটা উচ্চারণ করলো।
রহমানের চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়তে লাগলো ফোঁটা ফোঁটা আনন্দ অশ্রু।
*
মুখ ভার করে বসেছিলো মনি।
সম্মুখে ছড়ানো নানা রকম খেলনা। পুতুল, ঘোড়া, মোটর গাড়ি, চাবি দেওয়া রেলগাড়ি, ফুলঝাড়, বাঁশি, আরও কত রকম খেলনায় ভরে উঠেছে টেবিলটা। শুধু খেলনাই নয়, নানা রকমের খাবার –বিস্কুট, লজেন্স, চকলেট, সন্দেশ আরও কত কি। কিন্তু মনি কিছুই হাতে ধরছে না বা মুখে দিচ্ছে না।
চোখ দুটো ছলছল করছে ওর।
মনিরা আঁচলে মনির চোখ মুছিয়ে দিয়ে বললো–একটু দুধ খাও বাবা।
না, আমি কিছু খাবো না। আগে আমার বাপি আর মাম্মিকে এনে দাও।
মরিয়ম বেগম হেসে বললেন–দাদু, এইতো মাম্মি। তোমার মাম্মিকে চিনতে পারছো না?
না, আমার মাম্মি নয়। আমার বাপি মাম্মিকে নিয়ে গেছে। আমাকে আমার বাপি আর মাম্মির কাছে নিয়ে চলো।
মনিরা দুধের গেলাস টেবিলে রেখে দু’হাতে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠে উঃ আমি আমি পারবো না মামীমা, আমি পারবো না আর সহ্য করতে। ওকে পাঠিয়ে দাও ওকে পাঠিয়ে দাও ওর বাপি আর মাম্মির কাছে। আমি ওর কেউ নই, আমি ওর কেউ নই।
মরিয়ম বেগম মনিকে কোলের কাছে টেনে নিয়ে বলেন–দাদু তুই জানি না কে তোর মাম্মি? দেখছিস না তোর জন্য মা কাঁদছে?
মরিয়ম বেগমের কথায় মনি ফ্যাল ফ্যাল করে তাকালো মনিরার দিকে। আবার বললেন মরিয়ম বেগম নূর–লক্ষ্মী ছেলে–
মনি গম্ভীর গলায় বলে উঠলো–আমার নাম নূর নয়। আমি মনি।
বেশ, তুমি মনি। তোমাকে মনি বলেই ডাকবো। তাহলে দুধটুকু খেয়ে নাও? লক্ষী দাদু আমার। তারপর মনিরাকে লক্ষ্য করে বললেন মরিয়ম বেগম–দাও মা, তোমার মনিকে দুধ দাও।
মনিরা আঁচলে অশ্রু মুছে টেবিল থেকে দুধের গেলাসটা তুলে নিয়ে মনির দিকে বাড়িয়ে ধরলো।
মনি লক্ষ্মী ছেলের মতো এবার দুধটুকু এক নিশ্বাসে খেয়ে গেলাসটা মায়ের হাতে ফিরিয়ে দিলো।
মরিয়ম বেগম বললেন–মনি বলো তো দাদু তোমার মাম্মি কে?
আমার মাম্মি এখানে নেই।
ঐতো তোমার মাম্মি, বলো বলো মাম্মি?
না, ও আমার মাম্মি নয়। আমার মাম্মি খুব ভাল।
মনিরা বললো এবার আর আমি বুঝি ভাল নই?
ছিঃ ও কথা বলতে নেই দাদু! তুমি তো এই মায়ের পেটে ছিলে। ওর কাছেই বড় হয়েছে?
না, আমি মাম্মির কাছে বড় হয়েছি। আমার মাম্মির কাছে আমি যাবো।
মনিরা রাগত কণ্ঠে বললো–দেখলে, দেখলে মামীমা। আমার নূরকে সেই রাক্ষসী কেমন করে পর করে দিয়েছে।
সব ঠিক হয়ে যাবে। সব ঠিক হয়ে যাবে মা।
মনিকে বুকে তুলে নিয়ে গালে চুমু দিয়ে বলেন মরিয়ম বেগম–তোমার মাম্মি আছে, আবার আসবে। এখন মার কাছে যাও। ও তোমার মা।
মনি তাকিয়ে থাকে, কোনো কথা বলেনা।
মনিরার বুক ফেটে কান্না আসে, দ্রুত বেরিয়ে যায় সে কক্ষ থেকে।
মরিয়ম বেগম নানাভাবে মনিকে বুঝাতে চেষ্টা করেন। এখন মনি আগের মতো ছোট্টটি নেই, সবাইকে চিনবার মতো তার শক্তি হয়েছে। আর একবার যখন মনিকে খুঁজে পেয়েছিলো মনিরা তখন সে ছিলো ছোট্ট কচি বাচ্চা। তাই সে কোনো দিন মনিরাকে মা বলতে ভুল করেনি।
