অজ্ঞাত বন্ধু এবার কথা বললো–কয়েক মিনিট বেশি বাঁচতে পারলে। একটা তোমার ভাগ্য।
সেজন্য আমি নিজকে গৌরবান্বিত মনে করছি অজ্ঞাত বন্ধু। কিন্তু আগমণের কারণ জানতে পারি কি?
নিশ্চয়ই পারো।
তবে বলো বন্ধু?
বনহুরের কথায় মুখোসের মধ্যে অজ্ঞাত বন্ধুর চোখ দুটো চক চক্ করে উঠলো, ক্রুদ্ধ হয়ে উঠেছে সে বোঝা গেলো তার নিশ্বাসের শব্দে।
বনহুর আবার বললো কি চাও বন্ধু বলো জীবন না অর্থ?
জীবন।
হাঃ হাঃ হাঃ লক্ষ টাকার বিনিময়ে আমার জীবন নিতে এসেছো তুমি, কিন্তু আমি যদি তোমাকে লক্ষ টাকা দেই?
মুখোস-পরা লোকটা বনহুরের হাসির শব্দে বোধ হয় একটু আনমনা হয়ে পড়েছিলো, বনহুর দরজার দিকে তাকিয়ে হঠাৎ বলে উঠলো–রহমান তুমি অসময়ে?
মুহূর্তের জন্য মুখোস-পরা লোকটা ফিরে তাকালো।
সঙ্গে সঙ্গে বনহুর তার হাত থেকে রিভলভারখানা এক ঝটকায় কেড়ে নিয়ে চেপে ধরলো। ওর বুকে–খবরদার একটুও নড়বেনা।
মুখোস-পরা লোকটা ধীরে ধীরে হাত তুলে দাঁড়ালো, বনহুর দক্ষিণ হাতে লোকটার মুখের আবরণ টেনে খুলে ফেললো।
সঙ্গে সঙ্গে বনহুরের মুখ দিয়ে বেরিয়ে এলো–মিঃ লারলং আপনি!
লারলং এর চোখ দুটো ধক ধক্ করে জ্বলে উঠলো কোনো কথা বললো না।
বনহুর বললো–আমি ভেবেছিলাম আর একজনকে কিন্তু আপনি? বলুন মিঃ লারলং যৌথ নিশ্চয়ই আপনি ভাড়ার জন্য এসেছিলেন, তাই নয় কি? কিন্তু এতো রাতে ভাড়ার তাগাদায় আপনার নিজের আসা উচিৎ হয়নি। কারণ গত রাতেই আপনার কন্যার মৃত্যু ঘটেছে সে মৃত্যু স্বাভাবিক মৃত্যু নয়। কাজেই আপনার কন্যার অশরীরি আত্মা আপনার বাড়ির আশে পাশে ঘুরে বেড়াচ্ছে যে তাকে হত্যা করেছে, তার টুটি ছিঁড়ে নেবে সে।
বনহুরের চোখ দিয়ে যেন আগুন ঠিকরে বের হচ্ছে। দাঁতে দাঁত পিষে কথাগুলি উচ্চারণ করলো সে। পর মুহূর্তেই বনহুরের দক্ষিণ হস্তের রিভলভার মিঃ লারলং এর বুকে এসে ঠেকলো, কঠিন কণ্ঠে বললো সেমিঃ যৌথ, আপনার কন্যার হত্যাকারী কে নিশ্চয়ই আপনি জানেন, এবং বলতে হবে কে সে?
আমি জানি না।
আপনার কন্যার হত্যাকারী তা হলে আপনি নিজে?
বলবো না।
বলতে হবে মিঃ লারলং?
যদি না বলি?
হত্যা করবো।
আপনি হত্যা করবেন আমাকে? আমার বাড়িতে বসে আপনি আমাকে হত্যার হুমকি দেখাচ্ছেন কুমার বাহাদুর।
হুমকি নয় সত্যিই আপনাকে আমি হত্যা করবো এবং এই দন্ডে আমি তিনবার আপনাকে অনুরোধ করবো। তার পরই আপনার প্রাণহীন দেহটা লুটিয়ে পড়বে ধুলায়। বলুন, কে আপনার কন্যাকে হত্যা করেছে বলুন? বলুন?
দাঁড়ান দাঁড়ান বলছি–বলছি আমি–কিন্তু–
বনহুরের রিভলভার গর্জে উঠবার পূর্বেই মিঃ লারলং এর রক্তাক্ত দেহ মুখ থুবড়ে পড়ে গেলো বনহুরের পায়ের কাছে।
বিস্মিত বনহুর ফিরে তাকাবার পূর্বেই কয়েকজন মুখোস পরা লোক উদ্যত পিস্তল হস্তে কক্ষমধ্যে প্রবেশ করে তাকে ঘিরে দাঁড়ালো।
প্রায় বিশ-পঁচিশ জন পিস্তলধারী লোক একসঙ্গে বনহুরের দেহ লক্ষ করে তাদের অস্ত্র বাগিয়ে ধরেছে।
বনহুর এভাবে কোনো দিন বিপদে পড়ে নাই।
বাধ্যহলো সে নিজ হস্তের রিভলভার ফেলে দিতে। মুখোস পরা লোকগুলির মধ্যে হতে এগিয়ে এলো একজন বনহুরের সম্মুখে। দাঁতে দাঁত পিষে বললো লোকটা আমার মুখের গ্রাস কেড়ে নিয়ে তুমি বাঁচবে মনে করেছো? আমি তোমার বুকের হাড়গুলি টেনে ছিঁড়ে বের করে নেবো।
বনহুর অবাক কণ্ঠে বললো–তোমার মুখের গ্রাস আমি কেড়ে নিয়েছি?
হাঁ, মনে নেই আরাকান জঙ্গলের কথা?
বনহুরের মনের আকাশে ভেসে উঠলো নূরীর মুখখানা তবে কি এই সেই ব্যক্তি যে তার নূরীকে হত্যা করেছে!
বনহুরকে চিন্তা করতে দেখে বলে উঠে মুখোস-পরা লোকটা মনে পড়েছে আমার শিকার তুমি ছিনিয়ে নিয়ে এসেছিলে?
হাঁ মনে পড়েছে। কিন্তু তাকে আমি তোমার কাছ হতে কেড়ে নেই নি। তুমি তাকে আমার কাছ থেকে কেড়ে নিয়েছে। বনহুর হারিয়ে ফেলে তার স্বাভাবিক জ্ঞান, ভুলে যায় তার চার পাশে অসংখ্য পিস্তলধারী উদ্যত পিস্তল হস্তে দাঁড়িয়ে। চেপে ধরে বনহুর মুখোসধারীর গলা বলো শয়তান কে তুমি? প্রচন্ড এক ঘুষি লাগিয়ে দেয় ওর মুখে।
লোকটার মুখের মুখোস খসে পড়ে বনহুর অবাক হয়ে দেখে এই সেই লোক যাকে এলিনার জন্মদিনে মিঃ লারলং যৌথের পাশে বসে গল্প করতে দেখেছিলো আর দেখেছিলো এলিনার মৃতদেহের পাশে দাঁড়িয়ে তার কাঁধে হাত রেখে বলেছিলো—“ঠিকই বলেছেন কুমার বাহাদুর এলিনা শেষ পর্যন্ত নিজকে রক্ষা করতে পারলোনা।” বনহুর বুঝতে পারলো এ যে হোক তার নূরীকে হত্যা করেছে। নূরীকে লক্ষ্য করে তীর নিক্ষেপ করেছিলো এই শয়তান। বনহুর তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করে তাকালো তার দিকে।
বন্দী সিংহের ন্যায় গর্জে উঠলো নরপিশাচ তুমি শুধু নূরীর হত্যাকারীই নও, তুমি মিস এলিনাকেও হত্যা করেছে।
হাঁ, আমিই তোমার অজ্ঞাত বন্ধু কিন্তু আমি মিঃ যৌথকে দিয়ে তোমার মন পরীক্ষা করে দেখছিলাম। তুমি কম সুচতুর নও কিন্তু তোমার চেয়ে আমি অনেক বেশি বুদ্ধি রাখি।
তা তো তোমার কার্যকলাপে বুঝতে পারছি। তুমি আমার পূজনীয়। আমার নূরীর জীবন প্রদীপ তোমার হস্তে নিভে গেছে। তোমাকে আমি অতিকষ্টে নিজকে সামলে নিলো বনহুর।
মুখোসধারী নিজের দাড়ি-গোফ জোড়া খুলে ফেললো আমার নাম তুমি জানোনা কুমার বাহাদুর আমিই আরাকান সর্বশ্রেষ্ঠ ডাকু ভোলানাথ।
