নিজের কণ্ঠস্বর শুনতে পায় বনহুর নিজের কানে মিস এলিনা আপনি বেশি উত্তেজিত হচ্ছেন–
এলিনার কন্ঠ–না আমি যা বলছি সব সত্য। আমার বাবা হয়ে আমাকে কুৎসিৎ পথ অবলম্বন করাবার জন্য আগ্রহশীল। আপনি জানেন না কুমার বাহাদুর আমি কত সাবধানে নিজেকে রক্ষা করে চলেছি–বনহুর এবার অস্ফুট কণ্ঠে বললো মিস এলিনা আর নিজকে রক্ষা করতে পারলো না।
বনহুরের কাঁধে হাত রাখলো এক ভদ্রলোক ঠিকই বলেছেন কুমার বাহাদুর এলিন শেষ। পর্যন্ত নিজকে রক্ষা করতে পারলো না।
বনহুর অবাক হয়ে তাকালো ভদ্রলোকের মুখের দিকে। ইতিপূর্বে বনহুর তাকে আর একবার মাত্র দেখেছিলো এলিনার জন্ম উৎসবে। মুখে চাপ দাড়ি চোখে কালো চশমা মাথায় ক্যাপ ঠোঁটের ফাঁকে মোটা চুরুট।
বনহুর লোকটার আপাদমস্তক নিপুণ দৃষ্টি মেলে লক্ষ্য করে নিলো। তারপর বেরিয়ে যাচ্ছিলো কক্ষ থেকে।
ভদ্রলোক বনহুরের পথ রোধ করে দাঁড়ালো এতো তাড়াতাড়ি চলে যাচ্ছেন কেনো। আর একটু দাঁড়ান।
বনহুর কোনো কথা না বলে দ্রুত বেরিয়ে গেলো লোকটার পাশ কেটে।
বনহুরের কানে ভেসে এলো একটা হাসির শব্দ পিছন থেকে।
নিজ কক্ষে প্রবেশ করতেই বনহুর দেখতে পেলো রহমান তার জন্য অপেক্ষা করছে।
বনহুরকে কক্ষে প্রবেশ করতে দেখে বললো সে –সর্দার মিস এলিনা নাকি খুন হয়েছে?
হাঁ রহমান। তুমি কার কাছে শুনলে খবরটা?
বাবুর্চির কাছে। কিন্তু মিস এলিনা হঠাৎ খুন হবার কারণ বুঝতে পারছি না সর্দার?
বনহুর একটা সোফায় বসে পড়লো, তারপর ব্যথিত কণ্ঠে বললো–রহমান আমিই। এলিনার মৃত্যুর কারণ।
সর্দার।
হাঁ রহমান। নূরী নিজের জীবন দিয়ে আমাকে রক্ষা করে গেছে। এলিনাও বাঁচাতে চেয়েছে আমাকে। আমাকে বাঁচাতে চেয়েই সে নিজকে হারালো।
আমি ঠিক বুঝতে পারছি না আপনার কথা?
সব শুনলেই বুঝতে পারবে। শোন তবে–বনহুর গত রাতের সমস্ত ঘটনা ব্যক্ত করলো রহমানের কাছে।
সব শুনে রহমানের মুখমন্ডল বিবর্ণ হলো, ভীত কণ্ঠে বললো রহমান–সর্দার, আর একটি দিনও আমি আপনাকে এখানে থাকতে দিতে পারিনা।
কিন্তু এলিনার হত্যাকারীর সন্ধান না নিয়ে তো আমি যেতে পারিনা রহমান। এলিনা আমাকে বাঁচানোর জন্য নিজের জীবন দিলো দাঁতে দাঁত পিষে বলে উঠে বনহুর এলিনার বুকে যে ছোরা বসিয়ে দিয়েছে আমি তার বুকের রক্ত নিতে চাই–
রহমান বিস্ময় বিস্ফোরিত চোখে তাকালো বনহুরের মুখের দিকে। কতদিন পর আজ সর্দারকে তার স্বাভাবিক রূপে ফিরে আসাতে দেখে মনে মনে খুশিই হলো সে। নূরীর মৃত্যু সর্দারকে উন্মাদ উদ্ভ্রান্ত করে তুলেছিলো। নূরীর শোকে এতোই মুহ্যমান হয়ে পড়েছিলো যে নূরীর হত্যাকারীর প্রতিশোধ নেওয়ার কথাও তার অন্তরে দানা বাঁধেনি। আজ এলিনার মৃত্যু তাকে পুনঃ সম্বিৎ দানে সক্ষম হলো।
বনহুরের দক্ষিণ হাতখানা মুষ্টিবদ্ধ হলো রহমান, আমি এলিনার হত্যাকারীর টুটি ছিঁড়ে ফেলবো, তারপর আমার স্বস্তি।
সর্দার, আপনি এখন স্বাভাবিক নন, এমত অবস্থায় কি করে আপনি এলিনার হত্যাকারীকে খুঁজে বের করবেন?
আমাকে করতেই হবে–বনহুরের দৃঢ় কণ্ঠস্বর।
সেদিন রহমান কিছুতেই বনহুরকে ছেড়ে তার বাড়িতে ফিরে গেলোনা। রয়ে গেলো সে এ বাড়িতে।
কিন্তু বনহুর ক্রুদ্ধ হলো যখন সে জানতে পারলো রহমান এ বাড়িতে রয়ে গেছে। রহমানকে ডেকে বললো এক সময় রহমান তোমার কাজে তুমি চলে যাও। আমার জন্য তোমাকে ভাবতে হবে না।
সর্দার, আজকের দিনটা আমাকে এখানে থাকতে অনুমতি দিন।
সম্ভব নয়, তুমি যাও।
রহমান এরপর আর কোনো কথা বলতে পারলো না, চলে গেলো সে।
রহমান আর বনহুর যখন কথা হচ্ছিলো ঠিক তখন ওদিকের জানালার পাশ থেকে সরে গেলো একটি মুখ। সে মুখে হিংস্র পৈশাচিক নরহত্যাকারীর কঠিন ভাব ফুটে আছে। চোখ দুটিতে প্রতিহিংসার আগুন যেন দাউ দাউ করে জ্বলছে।
বনহুর না দেখলেও রহমান চলে যাওয়ার সময় অনুমান করলো, কেউ যেন সন্তর্পণে সরে গেলো পাশ থেকে। রহমান সিঁড়ি বেয়ে নেমে গেলো নিচে। পরক্ষণেই শোনা গেলো তার টাঙ্গী চালানোর শব্দ।
এলিনার মৃতদেহ মরগে পাঠানোর ব্যবস্থা করে পুলিশ চলে গেলো। ধীরে ধীরে দিনের আলো নিভে রাতের অন্ধকার নেমে এলো পৃথিবীর বুকে।
বনহুর নিজের ঘরে পায়চারী করছে। গভীর চিন্তারেখা ফুটে উঠেছে তার ললাটে। দক্ষিণ হস্তের আঙ্গুলে ধুমায়িত সিগারেট।
সমস্ত বাড়ি খানা নিস্তব্ধতায় ভরে উঠেছে।
রাত দুটো বেজে পঁয়ত্রিশ মিনিট হয়েছে।
বনহুর কার যেন প্রতিক্ষা করছে বলে মনে হলো।
বার বার তাকাচ্ছে সে দরজার দিকে।
সন্ধ্যায় বনহুর যখন চা পান করছিলো তখন একটি বালক এসে তার হাতে একখানা চিঠি দিয়ে যায়। চিঠিখানা এখনও পকেটে অবস্থান করছে।
বনহুর পায়চারী বন্ধ করে টেবিল ল্যাম্পের পাশে এসে দাঁড়ালো। সন্ধ্যায় পাওয়া চিঠিখানা বের করে মেলে ধরলো আলোর সামনে “রাত্রি আড়াই ঘটিকায় আসবো মোলাকাত হবে।
–অজ্ঞাত বন্ধু”।
বনহুর তাই দরজা খুলে প্রতিক্ষা করছিলো তার অজ্ঞাত বন্ধুর। চিঠিখানা পড়ে নিয়ে পকেটে রাখতেই বনহুর নিজের পিঠে শক্ত ঠান্ডা হিম শীতল একটা কোনো বস্তুর অস্তিত্ব অনুভব করলো।
ফিরে তাকাতেই দেখলো উদ্যত রিভলভার হস্তে মুখোস-পরা এক লোক দাঁড়িয়ে আছে তার পিছনে।
বনহুর একটুও ভড়কালো না বা চমকালো না, স্বাভাবিক সচ্ছ কণ্ঠে বললো তুমি ঠিক তোমার কথা অনুযায়ী আসতে পারোনি অজ্ঞাত বন্ধু। কয়েক মিনিট বিলম্ব হয়ে গেছে।
