এলিনা যতই ভাবে ততই তার অশ্রু বাধা মানেনা, কেমন করে রাজকুমারকে বুঝিয়ে বলবে ব্যাপারটা। আর বলবেই বা কি করে সে সুযোগ কই।
আজকের এই আয়োজন এভাবে পন্ড হয়ে যাওয়ায় ভোলানাথ ও মিঃ লারলং অত্যন্ত উত্তেজিত হয়ে পড়লো। রাজকুমারের জীবন নাশ করতে না পারায় ক্ষেপে উঠলো যেন তারা।
সেদিন উৎসব শেষ হলো বটে কিন্তু উৎসবে কোনো জৌলুস বা আনন্দ ছিলোনা।
বনহুর কক্ষে ফিরে এসে ক্ষিপ্তের ন্যায় পায়চারী শুরু করলো। এলিনার অসৎ ব্যবহার তাকে ভীষণভাবে মর্মাহত করে দিয়েছে। আসল হীরক লকেট এলিনা ওভাবে নকল বলে ছুঁড়ে ফেলে দেবার কারণ কি? তবে কি লোকজনের মধ্যে তাকে এইভাবে অপমান করাই তার মূল উদ্দেশ্য ছিলো? কিন্তু তাকে এভাবে অপমান করে এলিনার লাভ কি?
বনহুর সেদিন কিছুতেই ঘুমাতে পারলোনা। গোটা রাত তার কেটে গেলো অনিদ্রায়।
গভীর রাতে রেলিং এর পাশে এসে দাঁড়ালো বনহুর।
সমস্ত শহর সুপ্তির কোলে ঢলে পড়েছে।
আকাশে অসংখ্য তারার মেলা।
বাতাস বইছে এলোমেলো, কোনো সূদূর জঙ্গল থেকে শেয়ালের ডাক ভেসে আসছে। মাঝে মাঝে শোনা যাচ্ছে কুকুরের ঘেউ ঘেউ আওয়াজ।
বনহুর রেলিংএ ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে আপন মনে সিগারেটের পর সিগারেট নিঃশেষ করে চলেছে।
হঠাৎ অন্ধকারে একটা ছায়ামূর্তি এসে দাঁড়ালো বনহুরের পাশে। অন্যমনস্কভাবে সে চিন্তা করছিলো পাশে নিঃশ্বাসের শব্দ শুনে চমকে ফিরে তাকালো গম্ভীর কণ্ঠে বললো–কে?
আমি।
মিস এলিনা আপনি!
হাঁ। আমাকে আপনি ক্ষমা করুন। ক্ষমা করুন কুমার বাহাদুর আমি আপনাকে ইচ্ছা করে অপমান করিনি।
বনহুর তার হাতের অর্ধদগ্ধ সিগারেটটা দূরে নিক্ষেপ করে সোজা হয়ে দাঁড়ালো।
এলিনা ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে অন্ধকার হলেও বনহুর অনুভব করতে পারছে তার চোখের পানি অঝোরে ঝরে পড়ছে।
বনহুর কোনো কথা বলেনা সে বুঝতে পেরেছিলো এলিনা নিজের ভুল স্মরণ করে এসেছে তার কাছে ক্ষমা চাইতে। বনহুর ক্রুদ্ধ কণ্ঠে বললো এবার মিস এলিনা আমি আপনাদের ভাড়াটিয়া। আমার সঙ্গে আপনাদের কোনো সম্বন্ধ নেই। অযথা আপনারা আমাকে আমন্ত্রণ জানিয়ে–
কুমার বাহাদুর সে কথা বলতেই আমি আজ এসেছি। আমাকে আপনি ক্ষমা করুন বা না করুন আপনি চলে যান, চলে যান কুমার বাহাদুর। আর একটি দিন আপনি এখানে থাকবেন না। চলে যান এ শহর ছেড়ে–
বনহুর এমনি একটা সন্দেহ করেছিলো এলিনার সেই ক্ষণটির আচরণের পিছনে কোন ইংগিৎ ছিলো। এবার বনহুর তীক্ষ্ণ-দৃষ্টি নিক্ষেপ করে এলিনার মুখের দিকে। অন্ধকারে চচ করে উঠে বনহুরের গভীর নীল চোখ দুটি।
এলিনা বলে চলেছে কুমার বাহাদুর, আপনাকে হত্যার ষড়যন্ত্র চলছে; আপনি পালিয়ে যান। আপনি পালিয়ে যান এ শহর থেকে–
এলিনার মাথাটা নুয়ে আসে বনহুরের বুকে।
বনহুর পারেনা এলিনাকে দূরে সরিয়ে দিতে। হাত দিয়ে এলিনার চোখের পানির মুছিয়ে দিয়ে বলে আবার বনহুর মিস এলিনা আমি চলে যাবো। আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন, আপনি–
কুমার বাহাদুর, আমাকে আপনি নিয়ে যেতে পারেন না? এ পাপ পুরিতে আমি আর থাকতে পারছি না! অসহ্য কুমার বাহাদুর কি অসহ্য যাতনা বুকে নিয়ে আমি বেঁচে আছি, কি বলবো আপনাকে।
মিস এলিনা আপনি বেশি উত্তেজিত হচ্ছেন।
না, আমি যা বলছি সব সত্য। আমার বাবা হয়ে আমাকে কুৎসিৎ পথ অবলম্বন করাবার জন্য আগ্রহশীল। আপনি জানেন না কুমার বাহাদুর আমি কত সাবধানে নিজকে রক্ষা করে চলেছি। কিন্তু আর পিরবো না, আর পারবো না আমি নিজকে বাঁচাতে। অর্থের লালসায় আমার বাবা আমাকে আলটা মডার্ণ মেয়ে করে গড়ে তুলেছে কিন্তু আমার অন্তরটা সত্যি সত্যি আলটা মডার্ণ নয়। আমি চাই সাধারণ মেয়েদের মত সুন্দর সুষ্ঠু একটি জীবন। স্বামী সংসার সন্তান–
মিস এলিনা আপনি—
আমাকে বলতে দিন কুমার বাহাদুর। বলে যদি একটু শান্তি পাই। জানি আপনি আমার চেয়ে অনেক উঁচুতে, তবু এইটুকু আমার অনুরোধ আমাকে আপনি দয়া করে দূরে কোনো দেশে নিয়ে যান। যেখানে আমি একটু নিশ্চিন্ত মনে দিন কাটাতে পারবো।
বনহুর এলিনার কথার কোনো উত্তর দিতে পারে না।
এলিনা বনহুরের বুকে মুখ গুঁজে ফুলে ফুলে কেঁদে উঠে।
পাথরের মূর্তির মত স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে বনহুর। এলিনার চোখের পানিতে সিক্ত হয়ে উঠে বনহুরের জামার আস্তিন।
*
ভোরে ঘুম ভাঙতেই বাবুর্চি ব্যস্তসমস্ত হয়ে ছুটে এলো বনহুরের কক্ষে হুজুর, হুজুর, খুন–খুন–
বনহুরের কানে খু শব্দটা প্রবেশ করতেই ধড়মড় করে উঠে বসলো বিছানায় খুন!
হাঁ, হুজুর,দিদিমণি খুন হয়েছে।
মিস এলিনা খুন হয়েছে! বলো কি?
বনহুর দ্রুত শয্যা ত্যাগ করে স্লিপিং গাউনের বেল্ট বাঁধতে বাঁধতে সিঁড়ি বেয়ে নেমে গেলো নীচে।
মিস এলিনার কক্ষের দরজায় চাকর-বাকরদের ভীড় জমে গেছে।
মিঃ লারলং যৌথ মাথায় আঘাত করে বিলাপ করছেন। তার চুল গুলো এলোমেলো টেনে ছিঁড়ছেন ভদ্রলোক তাঁর নিজের মাথার চুল।
বনহুর ভীড় ঠেলে কক্ষে প্রবেশ করলো।
বিস্ময়-বিস্ফারিত চোখে তাকিয়ে দেখলো বনহুর শয্যায় ছিন্ন লতার মত এলিয়ে পড়ে আছে। এলিনা। সাদা ধপধপে বিছানার চাদরে জমাট বেঁধে আছে চাপ চাপ রক্ত।
বনহুর স্থির হয়ে তাকিয়ে রইলো। তার কানের কাছে যেন শুনতে পেলো এলিনার কণ্ঠস্বর–কুমার বাহাদুর আপনি আর একটি দিন এখানে থাকবেন না। চলে যান, চলে যান, এখান থেকে চলে যান–আপনার হত্যার ষড়যন্ত্র চলছে। আপনি পালিয়ে যান, দূরে অনেক দূরে–আমাকে আপনি নিয়ে যেতে পারেন না সঙ্গে করে– এ পাপ পুরিতে আমি আর থাকতে পারছি না। অসহ্য কুমার বাহাদুর কি অসহ্য যাতনা বুকে নিয়ে আমি বেঁচে আছি কি বলবো আপনাকে–
