এলিনা কথাটা শুনে শিউরে উঠেছিলো। রাজকুমার যদি না আসতো তবু খুশি হতো সে।
এলিনা সুযোগ খুঁজতে লাগলো, এক ফাঁকে হাজির হলো সে উপর তলায়।
কিন্তু রাজকুমারকে কোনো কথার বলার মত সুবিধা করে উঠতে পারলোনা। অন্যান্য লোকজন থাকায় কিছু বলতে পারলোনা সে তাকে।
বনহুর তখন ভেবেছিলো, এলিনা তাকে নিজে এসেছে দাওয়াৎ করবে। কাজেই হেসে বলেছিলো সে মিস এলিনা, আপনার জন্মদিনে আমন্ত্রিত হয়ে নিজকে ধন্য মনে করছি।
এলিনা কোনো জবাব দিতে পারেনি সেই মুহূর্তে। বিবর্ণ মলিন হয়েছিলো তার মুখমণ্ডল।
বনহুর বলেছিলো আবার মিস এলিনা, আপনার জন্মদিনে কি উপহার দেবো ভেবে পাচ্ছিনা।
এলিনা হাসবার চেষ্টা করে বলেছিলো তখন আপনার আশীর্বাদ আমার পরম সম্পদ কুমার বাহাদুর।
এরপর এলিনা ফিরে গিয়েছিলো।
সন্ধ্যার পর থেকে নানা রকম লোকজনে ভরে উঠলো মিঃ লারলং এর বাড়িখানা।
ঝকঝকে গাড়ি আর গাড়ি বাড়ির সম্মুখ-পথে ভীড় জমে গেলো এলিনা নিজে সবাইকে সাদর সম্ভাষণ জানিয়ে ভিতরে নিয়ে যাচ্ছে। আনন্দ আর খুশি ভরা দিনেও এলিনার মুখে হাসি নেই। কেমন যেন একটা বিমর্ষ ভাব এলিনাকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে।
বন্ধু-বান্ধব আর বান্ধবী এলিনার কম নেই, সবাই এসেছে তাকে জন্মদিনের অভিনন্দন জানাতে।
এলিনাকে সকলের সঙ্গে হাতে হাত মিলাচ্ছে।
অনেকেই এলিনার বিমর্ষ মুখোভাব লক্ষ্য করে বলছে হ্যালো মিস এলিনা, তোমাকে আজ বড় ভাবাপন্ন লাগছে, ব্যাপার কি বলতো তো?
এলিনা হেসে বলেছে– শরীরটা আজ বড় কেমন লাগছে।
সেকি এলিনা, শরীর খারাপ? হয়তো প্রশ্ন করেছে তার ক্লাবের কোনো বন্ধু কিংবা বান্ধবী।
এলিনাও প্রসঙ্গ এড়িয়ে চলেছে।
এমন সময় এলো বনহুর, রাজকুমারের ড্রেস তার শরীরে। অদ্ভুত অপূর্ব সুন্দর লাগছে আজ বনহুরকে।
এলিনা অভিনন্দন জানালো রাজকুমারকে।
কিন্তু এলিনার চোখ দু’টো ছল্ ছল্ করে উঠলো যেন। দৃষ্টি তুলে ভালো করে তাকাতে পারলো না সে রাজকুমারের মুখে।
বান্ধবীরা টিপ্পনী কাটলো এবং বললো–বুঝতে পেরেছি রাজকুমার শুধু তোমার অতিথি নয়, তোমার হৃদয় সিংহাসনের রাজা।
এলিনা সে কথায় কোনো জবাব দিতে পারেনি।
অন্যান্য আমন্ত্রিত ব্যক্তিদের মধ্যে বনহুর এসে বসলো।
অদূরে ভোলানাথ আজ মুখে একমুখ দাড়ি লাগিয়ে একপাশে চুপটি করে বসেছে।
আর মিঃ লারলং অতিথিদের সমাদর করে বসাচ্ছিলেন।
টেবিলে এখনও খাবার দেওয়া হয়নি।
এলিনার মনের মধ্যে ঝড় বইছে। আর অল্পক্ষণ পরেই রাজকুমারের ঐ সুন্দর মুখখানা বিষাক্ত খাবার ভক্ষণে কালো হয়ে উঠবে। মৃত্যুর করাল ছায়া নেমে আসবে তার সমস্ত দেহে। উঃ! কি সাংঘাতিক ঘটনা ঘটবে আর একটু পরে।
এলিনার মধ্যে একটা চঞ্চলতা দেখা দেয়।
বন্ধু-বান্ধবীরা ধরেছে তাকে একটা গান গেয়ে শোনাতে হবে। কিন্তু এলিনার গলা দিয়ে কোনো সুর আজ বের হচ্ছে না। অনেক চেষ্টা করেও একটা গান গাইতে পারলো না এলিনা।
বনহুর এলিনার জন্য সবচেয়ে মূল্যবান একটি লকেট এনেছিলেন লকেটটি সে হাতে দিলো এলিনার।
এলিনা লকেটখানা হাতে নিয়ে খুশি হলো অত্যন্ত। কিন্তু পরক্ষণেই লকেট খানা ছুঁড়ে ফেলে দিলো মেঝেতে এ লকেটখানা নকল। আমাকে নকল লকেট দিয়ে আপনি অপমান করলেন।
শুধু বনহুরই নয় কমথ্যে সকলে এলিনার এই অসৎ ব্যবহারে আশ্চর্য হয়ে গেলো।
মিঃ লারলং লকেটখানা হাতে তুলে নিয়ে পরীক্ষা করে বললেন এ লকেট আসল হীরা দিয়ে তৈরী। কে বলেছে নকল?
এলিনা ক্রুদ্ধ কণ্ঠে বললো–আমি চাইনা ঐ লকেট আপনি চলে যান। চলে যান এখান থেকে।
বনহুর অন্যদিন হলে এলিনার কথায় রাগ করতোনা এখন তার ব্যাপারটা তলিয়ে ভাববার মতো মনের অবস্থা ছিলোনা। বনহুর দারুন অপমানে লজ্জিত হলো, কারণ তার লকেটটা নকল হীরার নয়। সে বহু অর্থ ব্যয় করে এ লকেট সংগ্রহ করে এনেছে।
এলিনার তীব্র কণ্ঠস্বরে বনহুর যেন সম্বিৎ ফিরে পেলো। মিঃ লারলং এর হাত থেকে লকেটখানা নিয়ে বেরিয়ে গেলো দ্রুত কক্ষ থেকে।
মুহূর্তে কক্ষমধ্যে একটা গুঞ্জনধ্বনি স্পষ্ট হয়ে উঠলো।
ভোলানাথ ব্যস্তসমস্ত হয়ে ছুটে এলো মিঃ লারলং এবং এলিনার পাশে ক্রুদ্ধ কণ্ঠে বললো সে একি করলে এলিনা ভদ্রলোককে তুমি অপমান করলে? ছিঃ ছিঃ ছিঃ কি লজ্জার কথা।
মিঃ লারলং এর মুখে কোনো কথা নেই, সে যেন কাষ্ঠ পুতুলের মত নির্বাক হয়ে গেছে।
এলিনা আর দাঁড়াতে পারে না, ছুটে চলে যায় নিজের কক্ষে। সশব্দে দরজা বন্ধ করে বিছানায় লুটিয়ে পড়ে কাঁদে। ফুলে ফুলে কাঁদে এলিনা। রাজকুমারকে কেনো সে এভাবে অপমান করলো আর কেউ না বুঝুক সে জানে। তাকে এ ভাবে অপমান করে তাড়িয়ে দেওয়ার পিছনে কত বড় সাংঘাতিক একটা কারণ রয়েছে। মূল্যবান লকেটখানাকে কেন সে নকল বলে। উপেক্ষা করলো। কেন কেন সে আজ রাজকুমারের প্রতি এমন কুৎসিৎ আচরণ করলো। কেউ না জানুক তার মন জানে, রাজকুমারকে সদ্য মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করার আর যে কোনো। পথ সে খুঁজে পাচ্ছিলোনা।
কিন্তু রাজকুমার কি মনে করলো! ছিঃ ছিঃ তার আচরণে সে মনে কত বড় আঘাত পেয়েছে কি করে বোঝাবে তখন সে যা বলেছে তা সত্য নয়। মিথ্যা মিথ্যা অভিনয় করেছে সে। তার সঙ্গে। অতোগুলি গণ্যমান্য ব্যক্তির সামনে যা বললো যা সে করলো, সেটা কি কোনো মানুষের কাজ হয়েছে। লোকজনই বা কি মনে করলো, রাজকুমার তখন তাদের সম্মুখ মাটিতে মিশে যাচ্ছিলো যেন।
