বনহুর নিজের শয্যায় অর্ধশায়িত অবস্থায় বসে চিন্তা করছিলো। আঙ্গুলের ফাঁকে অগ্নিদগ্ধ সিগারেট। দৃষ্টি তার সম্মুখের দেয়ালে সীমাবদ্ধ।
গভীর রাত।
সমস্ত আরাকান শহর নিস্তব্ধ।
শহরের শেষ প্রান্তে মিঃ লারলং এর বাড়িও ঘুমিয়ে পড়েছে অন্ধকারের কোলে।
গেটে রাইফেলধারী পাহারাদার ঝিমাচ্ছে।
বনহুর শুধু জেগে আছে তার কক্ষে।
টেবিলে লণ্ঠন জ্বলছে।
হঠাৎ দেয়ালে একটা ছায়া পড়লো।
বনহুর চমকে উঠলোনা, কিন্তু তার মনের চিন্তাধারা বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলো। সজাগ দৃষ্টি মেলে তাকালো ছায়া ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে। বনহুরের হাতখানা বালিশের তলায় চলে গেলো, দ্রুত হস্তে রিভলভার খানা টেনে নিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়ালো কে?
একি! মিস এলিনা আপনি এতো রাতে!
এলিনা গম্ভীর গলায় বললো– তবু যা হোক আপনি সজাগ ছিলেন।
মিস এলিনা আপনি কি মনে করেছিলেন আমি একেবারে অচেতন?
না, ঠিক তা নয়। কুমার বাহাদুর, এতো রাতে এখানে কেনো এসেছি জানেন?
জানার বাসনা আমার নেই মিস এলিনা। আপনি এখানে এসে ভাল করেন নি। কারণ আপনার বাবা যদি জানতে পারেন তাহলে কি হবে জানেন নিশ্চয়ই?
কুমার বাহাদুর, আমি একটা কথা বলতে এসেছি…
ঠিক সেই সময় শোনা গেলো মিঃ লারলং এর কণ্ঠস্বর এলিনা! এলিনা! এলিনা…
বনহুর বললো- মিস এলিনা, আপনার কথা শোনার সময় হলোনা। এখন যেতে পারেন আপনি।
এলিনা সিঁড়ি বেয়ে নীচে নেমে যেতেই মিঃ লারলং কঠিন কণ্ঠে বললেন– এলিনা, আমি ভাবতে পারিনি তুমি এতো অধঃপতনে গেলে কি করে! ছিঃ ছিঃ তোমার চরিত্র সম্বন্ধে আমি অত্যন্ত। বিশ্বাসী ছিলাম কিন্তু তুমি আমার চোখে ধূলো দিয়ে…
বাবা, আমি চরিত্রহীনা মেয়ে নই।
আগে তাই জানতাম, কিন্তু রাজকুমারের রূপে তুমি পাগল হয়ে গেছো।
বাবা!
তুমি মুখে না বললেও আমি সব বুঝতে পেরেছি। যাও, নিজের ঘরে যাও। ঘুমাওগে।
এলিনা আর কোন কথা বলতে পারলোনা, চলে গেলো।
সেদিন এলিনা তার কক্ষ থেকে বেরিয়ে বারেন্দা দিয়ে সোজা বাগানে চলে যাচ্ছিলো। হঠাৎ শুনতে পেলো পিতার কক্ষে ভোলা নাথের কণ্ঠস্বর।
থমকে দাঁড়ালো এলিনা। কান পেতে শুনতে লাগলো সে।
ভোলানাথ বলছে তার পিতাকে অতি সাবধানে কাজ শেষ করতে হবে যৌথ। তোমার মেয়ে যেন এর বিন্দুমাত্র জানতে না পারে।
কথাগুলো এলিনার শিরায় শিরায় আলোড়ন জাগালো। কি এমন কাজ করবে যা সে জানলে ভয়ানক ক্ষতি হবে তাদের? এলিনা আরও সরে দরজার পর্দা ঘেষে দাঁড়ালো।
মিঃ লারলং এর গলার আওয়াজ এলিনা জানবেনা, ওকে আমি জানতে দেবোনা ভোলা, তুমি নিঃসন্দেহ থাকো।
তাহলে কবে ফাংশন করবে মনস্থ করছো? ভোলার কণ্ঠ।
লারলং বললেন– আগামী পরশু রাত্রি আমার মেয়ে এলিনার জন্মদিন। ঐ দিনটাই আমি বেছে নিয়েছি। হা রাজকুমারকে ঐদিন আমি আমন্ত্রণ জানাবো। আমরা এক সঙ্গেই খাবো বুঝলে, কিন্তু রাজকুমারের খাদ্যের সঙ্গে থাকবে বিষ মিশানো। অতি ভয়ঙ্কর মারাত্মক বিষ, বুঝলে? কিন্তু মৃত্যুর পর তার লাশটা…
হাঃ হাঃ হাঃ তুমি না একজন এ ব্যাপারে অভিজ্ঞ লোক? তোমার মুখে এ কথা শোভা পায়না লারলং। রাজকুমারের মৃত্যুর পর তার মৃতদেহ সৎকারের ভার আমার উপর ছেড়ে দিতে পারো।
নিশ্চিন্ত করলে বন্ধু। কিন্তু এজন্য আমাকে কি বখসী দেবে তাতো বললেনা?
তুমি বন্ধু লোক, জানোতো রাজকুমারের মৃত্যুতে আমার লাভ লোকসান কিছুই নেই। শুধু প্রতিশোধ আমি নিতে চাই। রাজকুমার আমার মুখের গ্রাসই শুধু বিনষ্ট করেনি। আমার বিশ্বস্ত অনুচরদের নিহত করে সে আমাকে পঙ্গু করে দিয়েছে। আমি চাই প্রতিশোধ …… হাঃ হাঃ হা?
তুমি বেশি উত্তেজিত হয়ে পড়ছে ভোলানাথ, কৌশলে কার্যসিদ্ধি করতে হবে।
যদি আমি মনের ঝাল মিটাতে পারি তাহলে তুমি আমার কাছে মোটা অঙ্ক পাবে। অবশ্য এতে আমার ক্ষতি ছাড়া লাভ হবেনা।
প্রতিহিংসার জ্বালা মিটাতে হলে কিছু ক্ষয়ক্ষতি হবে বৈকি।
আচ্ছা, তোমার কথাই ঠিক রইলো যৌথ।
কক্ষমধ্যে ভোলানাথ বোধ হয় উঠে দাঁড়ালো। আর মুহূর্ত বিলম্ব না করে এলিনা সরে গেলো সেখান থেকে।
এলিনার মনে ঝড় শুরু হলো, আজ রাত ও কালকের দিন পর রাত্রিতে তার জন্মদিনের উৎসব উদযাপিত করবে এ ক’দিন এলিনা জন্মদিনের উৎসব আনন্দ কিভাবে উদযাপিত করবে এ নিয়ে নানাভাবে জল্পনা-কল্পনা করেছে মনের মধ্যে। ঐদিন আসবে তার কত বন্ধু-বান্ধব আর বান্ধবী। তাদের নিয়ে নানা রকম হাসি গান বাজনা চলবে। আর চলবে খানাপিনা। কত রকম গল্পের ফুলঝুরি।
আজ এলিনার মন থেকে তার জন্মদিনের উৎসবের আনন্দ খেয়াল নিমিষে মুছে গেলো। জন্মদিন তার কাছে যেন বিষাক্তময় ক্ষণ বলে মনে হতে লাগলো। একটি নিরপরাধ জীবনের হবে পরিসমাপ্তি ঐ দিন।
এলিনা নানাভাবে চিন্তা করে চলে, কি করে রাজকুমারকে বাঁচানো যায়।
রাজকুমার যদিও তার প্রতি কোনো সময় সদয় ব্যবহার করেননি, তবু এলিনা পারেনা তার মৃত্যু চিন্তা করতে। নিজের অজ্ঞাতে সে ভালোবেসে ফেলেছিলো রাজকুমারকে।
সময় কারো মুখাপেক্ষী নয়।
এলিনার জন্ম দিন এসে পড়ে।
মিঃ লারলং এর বাড়ি আলোয় আলোকময়। নানারকম ফুল আর পাতা দিয়ে গোটা বাড়িটা সুন্দর করে সাজানো রয়েছে।
মিঃ লারলং নিজে গিয়ে আমন্ত্রণ জানিয়ে এসেছে উপর তলায় রাজকুমারকে। বনহুর প্রথমে অমত করেছিলো, কিন্তু মিঃ লারলং এর অনুরোধে কথা দিয়েছিলো যাবো বলে।
