রহমান যেদিন এলিনাকে দুর্যোগময় রাত্রিতে তার টাঙ্গীতে করে এ বাড়িতে পৌঁছে দিয়েছিলো সেদিন সে বুঝতে পারেনি মিঃ লারলং কত বড় সাংঘাতিক মানুষ। এবং সেদিন মিঃ লারলংকে চিনতে পারেনি বলেই রহমান তার রাজকুমারের জন্য বেছে নিয়েছিলো শহরের এক প্রান্তে নির্জন এ বাড়িটা। ভেবেছিলো এই নিরিবিলি পরিচ্ছন্ন জায়গাটা তার সর্দারের বিদগ্ধ অন্তরে আনবে একটা শান্তিধারা।
কিন্তু রহমান সেদিন বুঝতে পারেনি কত বড় সাংঘাতিক ফাঁদে তারা পা দিলো।
আজ ভোলানাথ স্বচক্ষে দর্শন করলো রাজকুমার ও তার সঙ্গীটিকে। ভোলানাথের অন্তরে বিষের আগুন জ্বলে উঠলো দাউ দাউ করে। এই রাজকুমার শুধু তার মুখের গ্রাসই কেড়ে নেয়নি। তার বহু অনুচরের জীবন বিনষ্ট করে দিয়েছে।
দাঁতে দাঁত পিষে বললো ভোলানাথ রাজকুমার! দাঁড়াও বন্ধু আমি তোমার রাজকুমার জীবন প্রদীপ কেমন করে নিভিয়ে দেই, একবার দেখো।
মিঃ লারলং চারিদিকে তাকিয়ে বললো– আস্তে, বন্ধু আস্তে। এলিনা যদিতে জানতে পারে তাহলে তোমার সব অভিসন্ধি মাঠে মারা যাবে।
পিতা আর ভোলানাথ যখন রাজকুমারকে নিয়ে গোপন আলোচনা চালাচ্ছিলো তখন এলিনা দেয়ালের ওপাশ থেকে সব শুনছিলো কান পেতে।
এলিনাকে রাজকুমার উপেক্ষা করুক না কেনো, সে তবু তার অমঙ্গল চিন্তা করতে পারেনা। এলিনার হৃদয় জুড়ে রাজকুমার বিরাজ করছে। ওকে ওর ভাল লাগে। আপনভোলা মানুষটি!
পিতার কথায় ভোলানাথ বললো– যৌথ, তোমার কন্যাটি বড় বেয়াড়া।
শুধু বেয়াড়াই নয় বন্ধু আমার প্রত্যেকটা কাজে সে আজকাল বাধার সৃষ্টি করে চলেছে কিন্তু কি করবো, মা-মরা মেয়েটাকে দূরে সরিয়ে দিতে পারিনি।
ভোলানাথ হাসলো।
শয়তান ভোলানাথের হাসির শব্দ এলিনার শরীরে যেন আগুন ধরিয়ে দিলো।
ভোলানাথ হাসি থামিয়ে বললো– যৌথ, তুমি জানোনা রাজকুমারের দেহে অসীম বল। আমার পঞ্চসবুজ অনুচরদের তিন জনকে সে একা হত্যা করছে। শুধু তাই নয়, আমার দলের আরও বিশজন নিহত হয়েছে ঐ রাজকুমারের রিভলভারের গুলীতে।
বলো কি?
হাঁ, অব্যর্থ লক্ষ্য তোমার ঐ ভাড়াটে যুবকের। যৌথ, আমি ওর বুকের রক্ত শুষে নেবো। আমি ওর বুকের রক্ত শুষে নেবো..
এলিনা আড়ালে দাঁড়িয়ে শিউরে উঠলো। নীচের ঠোঁটখানা উপরের দাঁত দিয়ে কামড়ে ধরলো, সেও দেখে নেবে কেমন করে রাজকুমারের বুকের রক্ত ভোলানাথ শুষে নেয়।
আবার শোনা গেলো ভোলানাথের কণ্ঠ বন্ধু তোমাকে সহায়তা করতে হবে। আমি সমস্ত অন্তর দিয়ে তোমাকে সাহায্য করবো। কথাগুলো মিঃ লারলং যৌথ বললেন।
ভোলানাথ গলার স্বর খাটো করে নিয়ে কি যেন সব ফিসফিস করে বললো।
এলিনা অনেক চেষ্টা করেও শুনতে পেলোনা ভোলানাথের শেষ উক্তি গুলি।
পিতার সঙ্গে ভোলানাথের পরামর্শ শুনা পর্যন্ত এলিনার মনে একটা গভীর চিন্তা আলোড়ন সৃষ্টি করলো। এতোকাল সে তার পিতাকে নানা রকম কুকর্মে লিপ্ত হতে দেখেও কোনো প্রতিবাদ করেনি। আজ তার মন বিদ্রোহী হয়ে উঠলো। একজন নিরপরাধ ব্যক্তির জীবন বিনষ্ট করবার জন্য এতো আগ্রহশীল কেননা তার বাবা! কি অন্যায় সে করেছে তার? ভোলানাথের মুখের গ্রাস কেড়ে নিয়েছে, তাতে তার পিতার কি লাভ লোকসান?
কিন্তু সে বেঁচে থাকতে রাজকুমারের কোনো অমঙ্গল করতে পারবেনা।
এলিনা লক্ষ্য করলো, সিঁড়ি বেয়ে রহমান মিয়া নেমে আসছে। হয়তো রাজকুমারকে তার কক্ষে পৌঁছে দিয়ে ফিরে যাচ্ছে সে।
এলিনা চারিদিকে তাকিয়ে দেখে নিলো, তারপর দ্রুত সিঁড়ির মুখে এসে দাঁড়ালো।
রহমান নেমে আসতেই এলিনা বললো– রহমান মিয়া, আজ আমাকে তোমার টাঙ্গী করে বেড়াতে নিয়ে যাবে?
রহমান ব্যস্তভাবে নেমে আসছিলো, বললো এবার আজ নয় দিদিমনি, আর একদিন নিয়ে যাবো।
না, তা হবেনা, আজকেই আমাকে বেড়াতে নিয়ে যেতে হবে।
একটু চিন্তা করে বললো রহমান– বেশ সন্ধ্যার আগে যাবেন। আমার একটু জরুরী কাজ আছে কিনা।
বেশ, মনে থাকে যেন।
নিশ্চয়ই মনে থাকবে দিদিমনি।
রহমান চলে যায়।
এলিনা তাড়াতাড়ি কক্ষমধ্যে চলে যায়।
সন্ধ্যায় এলিনার কথামত এলো রহমান, টাঙ্গী রেখে নেমে দাঁড়ালো।
এলিনা রহমানের প্রতিক্ষায় ছিলো, এগিয়ে গেলো টাঙ্গীর দিকে।
অমনি পিছন থেকে মিঃ লারলং ডাকলেন– এলিনা, কোথায় যাচ্ছো মা?
একটু বেড়াতে।
বেশ তো, আমিও যাবো তোমার সঙ্গে, আজ সারাটা দিন বাইরে বের হইনি কিনা।
এলিনার মুখ বিষণ্ণ হলো, কারণ দ্বিপ্রহরে তার পিতার আর ভোলানাথের মুখে শোনা কথাগুলো শোনার পর থেকে স্বস্তি ছিলোনা তার মনে। এখানে থাকলে রাজকুমারের জীবন যে কোনো মুহূর্তে বিনষ্ট হতে পারে। সেই জন্য এলিনা রহমানকে গোপনে বলবে তার রাজকুমারকে। নিয়ে দূরে কোথাও চলে যেতে। কিন্তু তার বাবা সঙ্গে গেলে কিছু বলা হবে না। বরং রাজকুমার বাড়িতে একা থাকবে সেই সময় ভোলানাথ কোনো চক্রান্ত করতে পারে।
এলিনা বললো– তা তুমি গেলে ভালই হতো বাবা। কিন্তু আমার এক বান্ধবী আজ বেড়াতে আসার কথা আছে, একটুও মনে ছিলোনা। তারপর রহমানের দিকে মুখ ফিরিয়ে বললো– তোমাকে কষ্ট দিলাম মনে কিছু করোনা, কেমন?
না না দিদিমনি, আমরা গরীব মানুষ, আমাদের আবার কষ্ট কি?
এলিনা কথার মধ্যে ফিস ফিস করে বললো তোমার সঙ্গে কথা আছে, কাল এসো।
রহমান আশ্চর্য হলোনা, সে প্রথমেই বুঝতে পেরেছিলো দিদি কোনো গোপন কথা বলবার জন্য তাকে নিভৃতে নিয়ে যেতে চায়। রহমান বললো- আসবো।
