চোখ তুলে তাকালো বনহুর, গম্ভীর গলায় বললো– আবার কেনো এলে তুমি?
সর্দার, আপনি অবুঝ নন! আপনি জ্ঞানী-বুদ্ধিমান। সামান্য একটি নারীর জন্য আপনি উন্মাদ হয়ে যাচ্ছেন?
রহমান, নূরী সামান্যা নয়, জানোনা সে আমার কত বড় একজন।
জানি সর্দার, তাই বলে আপনি এভাবে ভেঙে পড়বেন? হাজার হাজার জনগণ আপনার মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। কত নর-নারী আপনার প্রতিক্ষায় প্রহর গুণছে। সর্দার, আপনি…
রহমান।
হা সর্দার, আপনি শুধু আমাদের রক্ষকই নন, আপনি আমাদের সর্দার। আপনার অভাবে সমস্ত কান্দাই নগরী খাঁ খাঁ করছে। বেগম সাহেবার চোখের অশ্রুর বন্যা, বৌ-রাণীর দীর্ঘশ্বাস, মনির আকুল আহ্বান কেমন করে আপনি উপেক্ষা করবেন, আমাদের জন্য আপনি ফিরে না তাকালেও তাদের জন্য আপনাকে ফিরে যেতে হবে কান্দাই এ।
রহমান, বার বার কেনো তুমি আমাকে একই কথার প্রতিধ্বনি শোনাচ্ছো। আমি সত্যই কি। উন্মাদ হয়ে গেছি? না, আমি পাগল হইনি রহমান, আমি পাগল হইনি।
সর্দার।
নূরীর স্মৃতি সব সময় আমাকে এখানে হাতছানি দিয়ে ডাকে। তাই আমি ছুটে আসি এই। আরাকান জঙ্গলে। থাকতে পারিনা রহমান, আমি থাকতে পারি না কোথাও।
সর্দার চলুন, উঠুন আপনি।
চলো রহমান। চলো একটু দাঁড়াও, তুমি দেখনি সেই দৃশ্য। উঃ কি মর্মান্তিক ভয়ঙ্কর সেই মুহূর্তটি– ঐ পাথরখন্ডটার উপর বসেছিলাম আমি। ও তখন রাজহংসীর মত সাঁতার কাটছিলো ঝরণার পানিতে। সচ্ছ সাবলীল পানির মধ্যে জলপরীর মত সুন্দর অপূর্ব লাগছিলো তখন ওকে। আমি নির্বাক হয়ে তাকিয়ে দেখছিলাম, ভুলে গিয়েছিলাম আমার অস্তিত্ব। তারপর জানো রহমান…
বলুন সর্দার?
হঠাৎ নূরী ঝরনা থেকে ঝড়ের বেগে উঠে এসে আমার সম্মুখে দাঁড়িয়ে আমাকে আড়াল করে দাঁড়ালো। আমি কিছু বুঝবার পূর্বেই নূরী তীব্র আর্তনাদ করে লুটিয়ে পড়লো ভূতলে। উঃ কি রক্ত। রহমান, আমি নূরীর দিকে একবার মাত্র তাকিয়ে দেখেছি, তারপর…
সর্দার আপনি বেশি নার্ভাস হয়ে পড়ছেন, যে গেছে তার কথা আর ভেবে কোনো লাভ হবে না। আপনি চলুন সর্দার।
রহমান বনহুরের হাত ধরে তাজের পাশে নিয়ে এলো। তাজের পিঠে বনহুরকে চাপিয়ে দিয়ে নিজে চেপে বসলো দুলকীর পিঠে।
*
বনহুর আর রহমান যখন ফিরে এলো আরাকান শহরে তার ভাড়াটিয়া বাড়িতে তখন মিঃ লারলং তার বন্ধুকে নিয়ে বেলকুনিতে দাঁড়িয়ে কোনো গোপন আলোচনা করছিলেন। মিঃ লারলং এর প্রধান বন্ধু ভোলানাথ যে নূরীকে হরণ করে নিয়ে গিয়েছিলো রহমানের কুঠির থেকে ভিখারীর বেশে।
বনহুর আর রহমান যখন অশ্বপৃষ্ঠে গেট দিয়ে ভিতরে প্রবেশ করছিলো ঠিক তখন ভোলানাথের দৃষ্টি চলে যায় তাদের উপর। চমকে উঠে সে, দু’চোখে যেন অগ্নি বর্ষণ করে সে।
মিঃ লারলং বলেন– ওরা আমার উপরের ভাড়াটে; তুমি ওদের চেনো ভোলা?
আমার শত্রু ওরা।
বলো কি?
লারলং, এর কথাই তোমাকে বলেছিলাম এবং কয়েকদিন আগেও আরাকান জঙ্গলের মধ্যে এর সন্ধানে আমি উল্কার মত ঘুরে ফিরেছি, তবুও পাইনি। আজ দেখছি সাপের গর্তে ব্যাঙ আস্তানা গেড়েছে।
হেসে বললো লারলং –তোমার মুখের গ্রাস এরাই কেড়ে নিয়েছিলো তা হলে?
হাঁ, তুমি জানোনা, লারলং, সেই অপূর্ব সুন্দরী যুবতীটিকে হারিয়ে আমি কতখানি ভেঙে পড়েছি। সত্য বলতে কি এমন চেহারার মেয়ে আমার চোখে আজ অবধি একটিও পড়েনি।
লারলং বললো আবার বয়স তো তোমার কম হলো না, তবু এখনও নারী লালসা..
চুপ, ওরা এদিকে আসছে।
ভয় নেই, ওরা সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে যাবে। প্রথম ব্যক্তি কে জানো ভোলা?
পরিচয় জানিনা তবে এটুকু জানি, লোকটা মস্ত বড় বীর যোদ্ধা বললেও ভুল হয়না। আর ওর সঙ্গীটি একজন টাঙ্গীচালক। হাঁ, যুবতীটিকে টাঙ্গীচালকের বাড়ি থেকেই হরণ করা। হয়েছিলো।
লারলং বললেন– প্রথম যুবক কান্দাই এর রাজকুমার আর ওর সঙ্গীটিকে ঠিক চিনতে পেরেছো, সে রাজকুমারের টাঙ্গী চালক। কিন্তু যে যুবতীটিকে তোমরা হরণ করেছিলে সে ওদের কে হয় তাতো শুনিনি!
আচ্ছা, আজ আমি ওদের সব জেনে নেবো। সাপের গর্তে যখন প্রবেশ করেছে তখন ভোলানাথের ছোবল থেকে মুক্তি পাবে না।
বনহুর আর রহমান তখন ঘোড়াশালে ঘোড়া রেখে সিঁড়ি বেয়ে উপরে চলে গেলো।
ভোলানাথ দাতে দাঁত পিষলো।
মিঃ লারলং শুধু ব্যবসায়ী নন, তার ব্যবসার মূল উদ্দেশ্য শহরের সমস্ত শয়তান লোকদের অর্থ দিয়ে সাহায্য করা। প্রচুর অর্থের অধিকারী লারলং যৌথ। আরাকান শহরের দুষ্ট লোকগণ কুকর্মের জন্য অর্থের প্রয়োজন মনে করলে লারলং এর অর্থে সুদে আসলে তার প্রাপ্য পরিশোধ করে দেয়। দূষিত আবর্জনার মত পাপকার্যে সঞ্চিত অর্থ স্থূপাকার হতে থাকে মিঃ লারলং এর লৌহসিন্দুকে। অর্থ পিপাসু লারলং তাই শহরের শেষ প্রান্তে গড়ে নিয়েছিলো তার ইমার।
শহরের যত দুষ্ট লোকজনের আনাগোনা ছিলো মিঃ লারলং যৌথের বাড়িতে; কিন্তু প্রকাশ্যে নয় অতি গোপনে। শহরের মানুষ জানতো মিঃ যৌথ সদাশয় এবং মহৎ ব্যক্তি। তার উপরের খোলস ছিলো অতি ভদ্র ও সাধু বেশি, কিন্তু ভিতরটা ছিলো অত্যন্ত মারাত্মক বিষাক্ত সর্পের চেয়েও সাংঘাতিক।
রাজকুমারকে তার বাড়িতে ভাড়াটে হিসাবে আশ্রয় দেবার পর মিঃ লারলং এর মনে নানা রকম কুৎসিৎ অভিসন্ধি উঁকি দিয়ে গিয়েছিলো, কিন্তু এলিনার জন্য সহসা কিছু করে উঠতে পারছিলো না। লারলং যতই দুষ্ট প্রকৃতির লোক হোক না কেনো এলিনা ছিলো ভাল মেয়ে, অন্তরটা ছিলো তার স্বচ্ছ। পিতার মত কলুষিত ছিলোনা তার ভিতরটা।
