আমাকে একটু নিরিবিলি থাকতে দাও রহমান। তুমি এসেছো ভালই হলো। এখানে থাকা আর চলবেনা।
কেন, কেন সর্দার?
প্রশ্ন করোনা। আমি তোমাকে কোনো কথা বলতে রাজি নই।
তাহলে?
হাঁ, আমি আরাকান ত্যাগ করে চলে যাবো।
আচ্ছা, আমিই ব্যবস্থা করবো।
বেশ, এখন যেতে পারো।
রহমান তবু দাঁড়িয়ে রইলো চুপ করে।
বনহুর বিরক্ত ভরা কণ্ঠে বললো আবার তবু দাঁড়িয়ে রইলে কেনো? কথা শেষ হয়নি বুঝি?
সর্দার, আমি বলছিলাম কি—
বলো দ্রুত বলে ফেলো?
এখন আপনার কান্দাই ফিরে যাওয়াই শ্রেয়।
তোমার চেয়ে আমি ভাল জানি, কোটা আমার জন্য শ্রেয়।
সর্দার বৌ-রাণী বার বার আপনার কথা জিজ্ঞাসা করছিলেন। তার শরীরের অবস্থাও খুব ভাল নয়। বেগম সাহেবা বললেন, সব সময় নাকি কাঁদাকাটা করেন উনি।
আমি জানি মেয়েরা শুধু কাঁদতেই জানে, মনিরাও কাঁদে কাঁদতে দাও।
সর্দার!
এখানে থাকা আমার আর সম্ভব নয়। আমি চলে যেতে চাই এখান থেকে।
সর্দার, আপনার আদেশ শিরোধার্য। আমি ব্যবস্থা করবো।
রহমান আর দাঁড়ায় না চলে যায় নীচে।
সিঁড়ির মুখে রহমানের জন্য অপেক্ষা করছিলো মিস্ এলিনা। রহমান গম্ভীর মুখে নেমে আসতেই এলিনা তাকে ডাকলো–রহমান মিয়া?
রহমান থমকে দাঁড়ালো ডাকছেন দিদিমনি?
রহমান তুমি যা বলেছিলে, চেষ্টা করেছিলাম কিন্তু পারলাম না। তোমার রাজকুমার অদ্ভুত মানুষ।
হতাশ ভরা গলায় বললো রহমান–আমি আপনাকে কি বলে যে কৃতজ্ঞতা জানাবো ভেবে পাচ্ছি না দিদিমণি। কুমার বাহাদুরের জন্য আপনি যা করেছেন সব আমি শুনেছি বাবুর্চি আর চাকর বাকরের মুখে। কিন্তু দুঃখ কুমার বাহাদুর আপনাকে কোনো দিন আন্তরিকতা জানান নি।
তাতে আফসোস নেই, তোমার কুমার বাহাদুর যদি সুস্থ হয়ে উঠতো তাহলেও আমি ধন্য। হতাম রহমান মিয়া। কিন্তু জানি না, তার মনে কোনো পরিবর্তন আনতে সক্ষম হয়েছি কিনা।
রহমান কোনো কথা বললো না, ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে রইলো এলিনার মুখের দিকে।
*
রহমানের সকল প্রচেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়ে বনহুর আবার পালিয়ে গেলো আরাকান জঙ্গলে। যেখানে সে হারিয়েছে তার শিশু বেলার সাথী-সঙ্গিনী নূরীকে।
আবার সেই গহন বন।
চারিদিকে নানারকম হিংস্র জীবজন্তুর হুঙ্কার!
বনহুর এসে দাঁড়ালো যে স্থানে নূরীর মৃত্যু ঘটেছে। তাকিয়ে রইলো নির্বাক আঁখি মেলে। সেইদিকে। একটি সুন্দর জীবন-প্রদীপ শিখা নিভে গেছে চিরতরে। বনহুরের অন্তর হু হু করে। কেঁদে উঠে, গণ্ড বেয়ে গড়িয়ে পড়ে অশ্রুধারা।
নূরীর স্মৃতি তার সমস্ত অন্তরে অগ্নি শিখার মত দাউ দাউ করে জ্বলছে। বুকের মধ্যে যেন একটা শূন্যতা হাহাকার করে কেঁদে ফিরছে। বনহুর নিজেই ভেবে পায় না নূরীকে সে কখন এতোখানি ভালোবেসে ফেলেছিলো।
নূরীর স্মৃতি আজ বনহুরকে বিস্মৃতির পথে টেনে নিয়ে চলেছে, বনহুর ভুলে গেছে সে একজন বিশ্ববিখ্যাত দস্যু। তার নাম স্মরণে দেশবাসীর হৃদকম্প শুরু হয়, তার দর্শনে ভুলে যায় মানুষ তার অস্তিত্ব। এ হেন দস্যু-সম্রাট আজ উদ্ভ্রান্তের মত উদাসীন। নূরীর স্মৃতি তাকে ভুলিয়ে দিয়েছে। মনিরার কথা। যে মনিরার জন্য বনহুর কোনোদিন নূরীকে স্থান দেয়নি নিজের হৃদয়ে। মনিরার ভালোবাসার মধ্যে বনহুর হারিয়ে ফেলেছিলো নিজেকে, নূরী সরে পড়েছিলো দূরে। কিন্তু আজ নূরীকে হারিয়ে সে ভুলতে বসেছে সবকিছু।
*
বনহুর যখন আরাকান জঙ্গলের নূরীর মৃত্যুশোকে মূহ্যমান তখন রহমান তার সর্দারের সন্ধানে এসে চিন্তিত হয়ে কক্ষমধ্যে পায়চারী করে চলেছে। কোথায় গেলো তার সর্দার, কক্ষমধ্যে সব পড়ে আছে এমন কি বনহুরের বাইরে যাবার জামা-কাপড় পোষাক-পরিচ্ছদ সব যেমন যেখানে তেমনি রয়েছে। নাইট ড্রেস পরেই সর্দার চলে গেছে; রাতের অন্ধকারে পালিয়ে গেছে সে। আরাকান জঙ্গলে।
শুধু তাজ তার সঙ্গী হিসেবে গিয়েছে।
রহমান আর বিলম্ব না করে দুলকী নিয়ে ছুটলো, আরাকান জঙ্গলে তাকে পৌঁছতে হবে। যেমন করে হোক সর্দারকে ফিরিয়ে আনতে হবে। কিন্তু কি করে বেঁধে রাখবে রহমান তাকে ভেবে পায় না। রহমান দুলকীর পিঠে ছুটে চলে আর ভাবে সর্দারকে কি করে রক্ষা করা যায়। যে কোনো মানুষ হলে তাকে স্বাভাবিক করে আনতে এতো বেগ পেতে হতো না কিন্তু অস্বাভাবিক মানুষ তার সর্দার।
বনহুর যে আবার আরাকানের জঙ্গলে গেছে এ সন্দেহ তার মনে দানা বেঁধেছিলো, কারণ বনহুরের রিভলভারখানাও বালিশের তলায় তেমনি পড়েছিলো। একমাত্র নূরীর কথা স্মরণ হওয়া ছাড়া, তার সর্দার কোনো সময় অস্ত্র না নিয়ে বাইরে যায় না বা যেতে পারে না। রহমান যখন দেখলো সর্দারের রিভলভারখানা বালিশের তলায় রয়েছে গেছে, তখনই সে বুঝতে পেরেছে। কোথায় গেছে তার সর্দার।
রহমানের সন্দেহ সত্যে পরিণত হলো যখন সে পৌঁছলো আরাকান জঙ্গলে।
অনেক সন্ধানের পর রহমান এসে হাজির হলো সেই স্থানে যেখানে এক রাত্রিতে সে কোনো অজ্ঞাত জনের ফুঁপিয়ে কাঁদার শব্দ পেয়েছিলো গাছের ডালে বসে।
আশ্চর্য হলো রহমান, ঝরণার পাশে একটা টিলার উপরে বসে দু’হাতে মুখ ঢেকে ফুঁপিয়ে কাঁদছে তার সর্দার।
কিছুক্ষণ রহমান স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো, অদূরে তাজ দাঁড়িয়ে আছে প্রভুর দিকে মুখ করে।
রহমান এগিয়ে গেলো, বনহুরের পাশে গিয়ে দাঁড়ালো সর্দার।
সর্দার…
