বনহুর গম্ভীর হয়ে যায়, দৃষ্টি নিক্ষেপ করে সে দূরে অসীম আকাশের দিকে।
এলিনা বলে আবার–কুমার বাহাদুর, আপনি বড় চাপা মানুষ আপনার কাছে আমি তো কোনো কথা গোপন করিনা, আর আপনি আমার কাছে কোনোদিন মনের কথা বললেন না। দুঃখ আমাকে আপনি বিশ্বাস করেননা আজও।
বনহুর একটা দীর্ঘশ্বাস ত্যাগ করে বলে–মিস এলিনা, আপনি অযথা দুঃখ করছেন। আমার মনের কথ শুনে আপনার কোনো লাভ হবেনা।
তবে লোকসানটাই বা কোথায়। কুমার বাহাদুর, আমি জানি আপনার হৃদয়ে অনেক ব্যথা। জেনেও আপনাকে বিরক্ত করি জানিনা কেননা আপনাকে আমার বড় ভাল লাগে।
বনহুর তাকায় এলিনার মুখের দিকে।
এলিনা বনহুরের জামার আস্তিন চেপে ধরে বলে এবার আমাকে আপনি ভালবাসতে পারেন না কি?
এলিনা।
কুমার বাহাদুর!
না, আমি কুমার বাহাদুর নই। আমি কুমার বাহাদুর নই…
আপনি নিজকে কেনো এমনভাবে বিসর্জন দিচ্ছেন বলুন তো?আজ আমাকে বলতে হবে সব কথা?
এলিনা বনহুরের জামার অংশ মুঠায় চেপে ধরে রইলো।
বনহুর বিব্রত বোধ করতে লাগলো, হঠাৎ যদি কেউ দেখে ফেলে তখন কি ভাববে।
বললো বনহুর–বেশ ঘরে চলুন, সব বলছি।
এলিনা আর দস্যু বনহুর এসে বসলো পাশপাশি দুটো সোফায়।
এলিনা বললো–যদি বলতে অপনার খুব কষ্ট হয় তবে থাক।
কষ্ট! না হবেনা।
তবে বলুন? প্রবল আগ্রহ নিয়ে তাকায় এলিনা বনহুরের মুখের দিকে। বনহুর একটু কেশে গলাটা পরিস্কার করে নেয়, তারপর বলতে শুরু করে ছোট বেলায় মা বাবাকে হারিয়ে জীবনে স্নেহ মায়া মমতা থেকে বঞ্চিত হয়েছি। কাজেই নিজকে ঠিক মানুষের মত স্বাভাবিক করে তৈরী করে নিতে পারিনি। মানুষের মত আমার চেহারাটা হলেও আসলে অন্তরটা আমার মানুষের মত নয়। যে কোনদিন স্নেহ মায়া মমতা পায়নি, সে কি করে জানবে মায়া মমতা কি জিনিষ। তাই ওসব কাউকে দিতেও জানিনা।
এ সব কি আমি শুনতে চাইছি কুমার বাহাদুর?
শুনতে যখন চাইছেন তখন সব শুনতে হবে।
তাহলে বলুন?
মানুষ হয়েছি জঙ্গলে জীব জন্তু পশু পাখিদের মধ্যে। ছোট বেলায় ওরাই ছিলো আমার খেলার সাথী।
এলিনার দু’চোখে রাজ্যের বিস্ময়, অস্ফুট ধ্বনি করে উঠে–আশ্চর্য!
– হাঁ, আশ্চর্য বটে। বাঘের সঙ্গে লড়াই করা, সিংহের সঙ্গে বন্ধুত্ব করাই শিখলাম। দুর্বলতা পেলোনা আমার কাছে কোনো স্থান। তাহলে ভেবে দেখুন আমার চেহারার সঙ্গে মনের কোনো মিল নেই।
অদ্ভুত মানুষ তো আপনি!
তার চেয়েও অদ্ভুত আমার মন! আরও শুনতে চান?
হাঁ আমি শুনবো আপনার জীবন-কাহিনী।
আচ্ছা বলছি সব, কিন্তু সব শোনার পর আর এক মুহূর্ত আপনি আমার কক্ষে থাকবেন না। ঘৃণার অন্তর আপনার বিষিয়ে উঠবে, আপনি আমাকে–
আপনি বলুন, বলুন রাজকুমার?
হাঁ কি বলছিলাম মিস এলিনা? হাঁ আমার চেহারার সঙ্গে আমার মনের মিল নেই এতোটুকু। আমার সেই কঠিন ইস্পাতের মত অন্তরের পাশে আর একটি কোমল প্রাণ অন্তরের সন্ধান পেলাম, যে হৃদয় স্নেহ-মায়া-মমতা প্রেম-ভালবাসায় পরিপূর্ণ। সে আমাকে তার সব কিছু উজাড় করে। দিয়েছে, আর আমি তাকে দিয়েছি কঠোর শাস্তি। নির্মম কষাঘাতে তাকে জর্জরিত করেছি। এতোটুকু করুণা সে পায়নি কোনোদিন আমার কাছে–কণ্ঠ ধরে আসে বনহুরের।
এলিনা অস্ফুট ধ্বনি করে উঠে–উঃ কি নিষ্ঠুর আপনি!
নিষ্ঠুর শুধু নই, কঠিন হৃদয়হীন পিশাচ আমি। নিতেই শুধু জানি, কাউকে দিতে জানিনা। তার কাছেও শুধু নিয়েই গেছি কিন্তু প্রতি দানে তাকে দেইনি কিছু।
দেবার তো এখনও আপনার অনেক আছে! কেন আপনি মিছামিছি হতাশ হচ্ছেন?
তাকে আর কোথায় পাব মিস এলিনা? সে আমার ধরা ছোঁয়ার বাইরে চলে গেছে। আর ফিরে আসবেনা কোনদিন–
কুমার বাহাদুর, আপনি তাকে বিয়ে করেছিলেন?
হাঁ।
তবু তাকে আপনি ভালবাসতে পারেননি?
কই আর পারলাম। ভালবাসা কি জিনিস আমি তো জানিনা মিস এলিনা।
আশ্চর্য কথা বললেন আপনি।
আপনাকে আমি তো সব বলেছি, আমার হৃদয়ে মায়া-মমতা-প্রেম ভালবাসা কিছু নেই, থাকলে আমি এতো পাষাণ হতে পারতাম না।
আপনি কি মানুষ!
না, আমি মানুষ নই মিস এলিনা। আমি অদ্ভুত জীব—
কুমার বাহাদুর, আপনি সুস্থ নন তাই–
না না, আমি সম্পূর্ণ সুস্থ, কিন্তু এখনও আপনি আমার সব কথা শোনেননি। সব শুনলে আর কোনো সময় এখানে আসবেন না, ভয়ে শিউরে উঠবেন আঁতঙ্কে পালিয়ে যাবেন–
হঠাৎ বনহুর হেসে উঠলো অদ্ভুতভাবে–হাঃ হাঃ হাঃ হাঃ হাঃ হাঃ হাঃ হাঃ—
মিস এলিনার চোখ দুটো ভয়ে কেমন যেন গোলকার হয়ে উঠলো, বিস্ময় ভরা চোখে তাকিয়ে রইলো বনহুরের মুখের দিকে।
হাসি থামিয়ে বলে উঠে বনহুর–আমার আসল পরিচয় জানলে আর কোনদিন আমার ছায়াও মাড়াতে চাইবেন না মিস এলিনা। আমার আসল পরিচয়—
ঠিক সেই মুহূর্তে কক্ষে প্রবেশ করে রহমান কুমার বাহাদুর।
রহমানকে দেখেই বনহুর চুপ করে গেলো, তাকালো তার দিকে। যা বলতে যাচ্ছিলো বলা। আর হলো না।
রহমান আর মিস এলিনার মধ্যে দৃষ্টি বিনিময় হলো।
রহমান বললো–দিদিমনি, আপনাকে নীচে ডাকছেন।
এলিনা বুঝতে পারলো, রহমান মিয়া তাকে নীচে যাবার জন্য ইংগিত করলো।
এলিনা আর বিলম্ব না করে বেরিয়ে গেলো।
বনহুর বললো–রহমান, মনিকে পৌঁছে দিয়েছো ওর মায়ের কাছে?
হাঁ সর্দার।
বেশ করেছে। বনহুর যেন অনেকটা আস্বস্ত হলো।
রহমান কিছুক্ষণ নিশ্চুপ থেকে বললো “সর্দার বৌ-রাণী কেমন আছেন, তাতো জানতে চাইলেন না। তা ছাড়া বেগম সাহেবা তিনিও–
