কুমার বাহাদুর আমাকে ক্ষমা করবেন, কেন এসব করতে এসেছি তা বলতে পারবো না।
মিস্ এলিনা, আপনাকে বলতে হবে?
আমি যদি না বলি তাহলে আপনি কি করবেন!
আপনার পিতাকে সব জানিয়ে দেবো।
মুহূর্তে মিস্ এলিনার মুখ কালো হয়ে উঠলো, কিছু বলতে গিয়ে চুপ হয়ে গেলো সে।
বনহুর দৃঢ় কণ্ঠে বললো–আপনি আধুনিক তরুণী। আপনার দাস-দাসীর সীমা নেই। আমি আশ্চর্য হচ্ছি আপনি এতো নীচ কাজে কি করে…
না, যে কাজ আমি করেছি বা করছি এ কাজ নীচ নয়। এ কাজ নারীদের জন্য। আমাকে আপনি আজও চিনতে পারেননি। যে রূপ আমার দেখছেন সে রূপ আমার আসল রূপ নয়, আমি ভালোবাসি সুন্দর একটি সংসার আর…না না, আর বলতে পারবোনা।
মিস এলিনা, আপনি ভুল করছেন, এখানে সুন্দর সংসার বা অন্য কিছুর আশা নেই…
চুপ করুন রাজকুমার। চুপ করুন। আমাকে আপনার সেবা করবার একটু অধিকার দিন। আমাকে বঞ্চিত করবেন না।
মিস এলিনা!
কুমার বাহাদুর, আপনি রাজপুত্র আপনার সেবা করার অধিকার আমার নেই, তবু অনুগ্রহ করে আমাকে অনুমতি দিন….
বনহুর অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলো এলিনার মুখের দিকে। আলটা-মডার্ণ তরুণী এলিনার মুখে আজ একি ভাবময় প্রতিচ্ছবি!
বনহুর দৃষ্টি নত করে নিলো, তারপর ধীর কণ্ঠে বললো–তাতে যদি শান্তি পান, বেশ।
খুশিতে উজ্জ্বল হয়ে উঠলো মিস্ এলিনার মুখমন্ডল। উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বললো–কুমার বাহাদুর!
বনহুর গিয়ে দাঁড়ালো ওপাশের মুক্ত জানালার কাছে। তাকালো সীমাহীন আকাশের দিকে, একি সমস্যায় পড়লো সে আবার। বিব্রত বোধ করতে লাগলো, আরাকানে কিছুদিন থাকবে বলে এ বাড়ীতে আশ্রয় নিয়েছিলো কিন্তু তা আর হলো না। রহমান এলেই তাকে আরাকান ত্যাগ করতে হবে। কিন্তু কোথায় যাবে! যেখানেই যাক্ বনহুর আর শান্তি পাবে না, নূরীকে হারানোর ব্যথা তার অন্তরকে নিস্পেষিত করে ফেলেছে। আগে সে জানতো না তার হৃদয়ের এতোখানি অধিকার করে নিয়েছিলো নূরী।
নূরীর কথা ভাবতে গিয়ে বনহুর আবার বিমর্ষ হয়ে পড়লো, চোখ দুটো অশ্রু ছল ছল হয়ে উঠলো তার।
মিস এলিনা লক্ষ্য করলো তার মুখভাব। এগিয়ে গেলো এলিনা বনহুরের পাশে কুমার বাহাদুর!
ফিরে না তাকিয়ে বললো বনহুর–আমাকে একটু একা থাকতে দিন মিস এলিনা।
আমি যদি না যাই আমাকে আপনি তাড়িয়ে দেবেন?
বনহুর কোনো জবাব দেয় না।
মিস্ এলিনা বললো আবার–আজ আপনাকে আমার সঙ্গে বেড়াতে যেতে হবে।
বনহুর বিরক্ত ভরা চোখে তাকালো এলিনার দিকে।
এলিনা আজ অন্যদিনের মতো ছুটে পালিয়ে গেলোনা। রহমানের মুখে শুনেছে তার। রাজকুমারে মনে দারুন একটা ক্ষত আছে, সেই ক্ষতে ঔষধ দিয়ে আরোগ্য করতে হবে তাকে। এলিনা রহমানকে কথা দিয়েছে যেমন করে হোক তার মালিককে শুধরে নেবে, পারবে সে একাজ করতে। কাজেই এতো সহজে অভিমান বা রাগ করলে চলবেনা তার।
এলিনা বললো–আজ আপনাকে আমার সঙ্গে যেতেই হবে। কথাটা বলে আলনা থেকে কোট নিয়ে বনহুরের দিকে বাড়িয়ে ধরে–নিন পরুন।..
বনহুর কোনো কথা বলতে পারলোনা।
মোহগ্রস্তর মতো কোটটা এলিনার হাত থেকে নিয়ে অনিচ্ছা সত্ত্বেও গায়ে পরে নিলো।
এলিনা হেসে বললো–বাড়ীতে আর কেউ নেই কিনা, তাই আপনাকে বিরক্ত করছি। চলুন।
কোথায় যাবেন? বললো বনহুর।
এলিনা একমুখ হাসি হেসে বললো–ক্লাবে।
ক্লাবে তো আমি যাইনা মিস্ এলিনা।
আজ না হয় একটু আমার সঙ্গে গেলেন। আসুন।
বনহুর অনুসরণ করে এলিনাকে।
এলিনা আর বনহুর সিঁড়ি বেয়ে নীচে নেমে এলো। বনহুরের মুখে তখন বিরক্তির ছাপ ফুটে উঠেছে।
এলিনা আড়চোখে তাকিয়ে দেখছিলো বনহুরের দিকে, একটু দুষ্টামির হাসি তার ঠোঁটের ফাঁকে দেখা দিলো। নীচে গাড়ি তাদের জন্যই যেন অপেক্ষা করছিলো, এলিনা আর বনহুর গাড়ির পাশে গিয়ে দাঁড়াতেই ড্রাইভার নেমে গাড়ির দরজা খুলে ধরলো।
এলিনা বনহুরকে লক্ষ্য করে বললো–কুমার বাহাদুর, উঠুন।
বনহুর তার অনুগত ছাত্রের মত আদেশ পালন করলো।
এলিনা বসলো তার পাশে।
এলিনার শরীরে যে আবরণ ঢাকা ছিলো খুলে রেখে দিলো পাশে।
বনহুর ওর মুখের দিকে তাকিয়ে একবার দেখে নিলো ভাল করে। কারণ এতোক্ষণ এলিনার মুখমন্ডল স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিলোনা।
এলিনা আজ আধুনিক ড্রেসে সজ্জিত হয়নি, তার দেহে সাধারণ সাজসজ্জা শোভা পাচ্ছিলো। বড় সুন্দর লাগছিলো আজ এলিনাকে। বনহুর ক্ষণিকের জন্য বিস্মৃত হলো তার নূরীকে।
এলিনা তার পাশে এতো ঘনিষ্ঠ হয়ে বসেছে যে ওর দেহের উষ্ণ তাপ বনহুরের ধমনিতে একটা অনুভূতি জাগিয়ে তুলছিলো। বনহুর সরে বসলো আর একটু।
হাসলো এলিনা–ওঃ আপনি রাজকুমার আর আমি সামান্য মহিলা, মাফ করবেন, ভুল হয়ে গেছে।
না না…বনহুর নিজকে সামলে নেয়।
এরপর থেকে এলিনার আব্দার রক্ষার জন্য বনহুরকে রোজ যেতে হয় তার সঙ্গে। কোনো দিন বা লেকের ধারে, কোনোদিন ফাংশানে। এলিনার জ্বালায় বনহুর যেন অস্থির হয়ে উঠে। কিন্তু যতই সে ওকে পরিহার করে চলতে চায় ততই ও যেন আরও বেশি করে উপদ্রব শুরু করে।
বনহুর হয়তো রেলিং এর পাশে দাঁড়িয়ে গভীরভাবে চিন্তা করছে, ভাবছে হয়তো তার নূরীর কথা, ঠিক এমন সময় এলিনা এসে পিছন থেকে চোখ দুটো টিপে ধরে ফেলে।
বিরক্ত হলেও মুখভাব হাসি টেনে বলে–একি হচ্ছে মিস এলিনা?
এলিনা বনহুরের চোখ মুক্ত করে দিয়ে বলে–সত্যি করে বলুন দেখি কি ভাবছেন আপনি?
