কয়েকদিন অবিরত ভেবেছে, রহমানের কথাগুলোই তার বার বার মনে হয়েছে “দিদিমনি, আপনি নারী মায়া-মমতায় আপনার হৃদয় পরিপূর্ণ। আমার রাজকুমারকে ফিরিয়ে আনতে। আপনিই পারবেন। আমার রাজকুমারকে সুস্থ করতে আপনিই পারবেন…এলিনা যতই ভাবে। ততই রাজকুমার তার সমস্ত অন্তর জুড়ে দাগ কেটে বসে, কেমন যেন ভালো লাগে ওর কথা ভাবতে। এলিনা সুযোগ খোঁজে আবার কেমন করে যাবে সে উপরে।
এলিনা একদিন উপরে গিয়ে বনহুরের বাবুর্চির সঙ্গে ভাব জমিয়ে নিলো, বাবুর্চির হাতের রান্না সে নিজের হাতে করলো, আলটা মডার্ণ মেয়ে হয়ে আজ সে নিপুণ গৃহিনীর মতোই রান্না করলো। সুন্দর করে খাবার টেবিলে নিজের হাতে সাজিয়ে আড়ালে চুপটি করে দাঁড়িয়ে রইলো, বাবুর্চিকে বলে দিলো কিছুতেই যেন তার কথা রাজকুমারকে না বলে।
বাবুর্চী তার কাজে সহায়তা পেয়েছে, বলবে কি খুশীতে সে ডগমগ হয়ে উঠেছে।
এলিনা টেবিলে সুন্দর করে খাবার সাজিয়ে আড়ালে সরে যেতেই বাবুর্চি রাজকুমারকে খাবার টেবিলে আসার জন্য জানালো।
বনহুর প্রতিদিনের মত আজও খাবার টেবিলে এসে বসলো। কিন্তু অবাক হলো সে আজ খাবার টেবিলে বসে। সুন্দর করে সাজানো খাবারগুলি, মুখে দিয়ে আরও বিস্মিত হলো। তার আরাকানী বাবুর্চি আজ হঠাৎ এমন সুন্দর পাক করতে শিখলো কি করে। আরাকানের আসার পর তার মুখ কোনোদিন এমন রান্না খায়নি। বনহুরের সুস্বাদু পাক খাওয়া অভ্যাস নয়, তবে ভাল। রুচিকর জিনিস সকলেরই প্রিয়। তাই বনহুরের কাছে আজ খাবারগুলি অত্যন্ত সুস্বাদু লাগলো, অনেকদিন পর আজ পেটপুরে খেলো বনহুর।
খেতে খেতে বললো বনহুর–বাবুর্চি, আজ কে রান্না করেছে?
বাবুর্চির দৃষ্টি নিজের অজ্ঞাতে চলে গেলো ওদিকের দরজায়। সেখানে দাঁড়িয়ে এলিনা চোখের ইশারায় বারণ করে দিলো যেন না বলে সে।
তারপর থেকে প্রায়ই বনহুর লক্ষ্য করলো তার জন্য খাবারগুলো কে যেন সুন্দর করে রান্না করে দেয়। টেবিলে সাজিয়ে দেয় অতি নিপুণ হস্তে। এর আগে বনহুর খেতে বসে দু’এক বার খেয়ে আর মুখে করতে পারেনি, কেমন বিস্বাদ লেগেছে বাবুর্চির হাতের রান্নাগুলো। টেবিলে খাবারগুলো এমনভাবে সাজানো থাকতো যেন কে এসব অৰ্দ্ধভক্ষণ করে রেখে গেছে।
বনহুর কোনোদিন তৃপ্তিসহকারে খেতে পারেনি। না খেলে নয়, তাই এসে বসতো খাবার টেবিলে।
বনহুর আরও লক্ষ্য করেছে আজকাল তার কক্ষের বিছানাপত্র, আলনা, বইএর সেলফ কে যেন নিপুণ হস্তে সুন্দর করে গুছিয়ে রেখে যায়। কই, আগে তো এমন করে তার বিশ্রামকক্ষ কেউ গুছিয়ে রাখতো না। রহমান যখন আসতো তখন যতটুক পারতো তার নাওয়া-খাওয়া, ঘর গোছানো সব করে যেতো, কিন্তু এখন কে তার এমন করে যত্ন নিচ্ছে। নিশ্চয়ই এ চাকর-বাকর আর বাবুর্চির কাজ নয়।
প্রথম প্রথম বনহুর এ সব লক্ষ্য করেনি তেমন করে। কারণ এ সব খেয়াল করবার মতো তার মনের অবস্থা ছিলোনা। কিন্তু পর পর যখন কয়েক দিন খেতে বসে দেখলো কেউ যেন তার। খাবারগুলি পরিপাটিরূপে রান্না করে সাজিয়ে রেখে যায় খাবার টেবিলে। বিছানার চাদরখানা আর। নীচে ঝুলে থাকেনা, টেবিলে বই-পত্র বা এ্যাসট্রে ছড়িয়ে থাকেনা। তবে কে কে সেই মায়াময়ী? বনহুরের মনে পড়ে…আর একজন তার সেবা-যত্ন এমনি করে আড়াল থেকে করতো। এমন কি সে যখন ঘুমাতো, চাদরখানা তুলে দিয়ে যেতো অদৃশ্যকারিনী তার শরীরে। মাথার চুলে হাত বুলিয়ে দিতো, তার নিশ্বাসের শব্দ আজও লেগে রয়েছে বনহুরের কর্ণকুহরে। সে আর কেহ নয় তার নূরী। কতদিন বনহুর নূরীকে হাতে-নাতে ধরে ফেলেছে, নূরী লজ্জায় মরিয়া হয়ে উঠেনি, হাসিতে মুখর হয়ে বলেছে–তুমি যে আমার, তাই তোমার সেবা করা আমার কর্তব্য। আজ আবার নূরীর কথাই স্মরণ হয় বনহুরের মনে।
তবে কি নূরীর আত্না তার সেবায় ছুটে আসে সুদূর পরপার থেকে। কে তার মুখে এমন করে সুস্বাদু খাবার তুলে দিচ্ছে। কে তার শয্যা সুন্দর করে গুছিয়ে রাখছে, কে তার জামা-কাপড় পরিপাটি করে দিয়ে যাচ্ছে, সে তার নূরী না অন্য কেউ?
বনহুর সেদিন চুপটি করে দরজার পাশে এসে দাঁড়ালো। ডাইনিং রুমে খাবার টেবিলের পাশে নজর পড়তেই চমকে উঠলো বনহুর। একটি নারীমূর্তি দাঁড়িয়ে টেবিলে তার খাবারগুলি সাজিয়ে রাখছে।
বনহুর কক্ষে প্রবেশ করে খাবার টেবিলের পাশে এসে দাঁড়ালো। নারীমূর্তি মুখ কালো। আবরণে ঢাকা ছিলো, পদশব্দে দ্রুত বেরিয়ে গেলো ডাইনিং রুম থেকে।
বনহুর থ’ মেরে দাঁড়িয়ে রইলো, যেন কত হাবা মানুষ সে। কে বলবে সে দস্যু বনহুর।
কয়েকদিন পরের কথা। সেদিন বনহুর অন্যমনস্কভাবে শয়নকক্ষে প্রবেশ করতে গিয়ে থমকে দাঁড়ালো। সমস্ত শরীরে আবরণ ঢাকা একটি নারী-মূর্তি তার শয্যায় বালিশগুলি সুন্দর করে গুছিয়ে রাখছে।
বনহুর অতি সন্তর্পণে এগুতে লাগলো, ঠিক তার পাশে এসে খপ করে ধরে ফেললো নারী মূর্তির হাতখানা। পরক্ষণেই তার মুখের আবরণ উন্মোচন করে ফেললো, সঙ্গে সঙ্গে অস্ফুট ধ্বনি করে উঠলো বনহুর মিস্ এলিনা, আপনি!
এলিনার মুখ বিবর্ণ হলো, কোনো কথা বলতে পারলো না সে।
বনহুর এলিনার হাতখানা মুক্ত করে দিয়ে গম্ভীর গলায় বললো–আমি ভাবতে পারিনি আপনিই সেই অদৃশ্য নারী। কিন্তু কেনো মিস এলিনা, কেন আপনি এসব করতে এসেছেন?
