এলিনা বুঝতে পারে, ভৃত্য হলেও রহমান মিয়া রাজকুমারের একজন অনুগত হিতাকাঙ্খী। রাজকুমারের প্রতি তার অত্যন্ত হৃদ্যতা লক্ষ্য করে এলিনা খুশি হলো, বললো সে তোমার কথামতো আমি…
কথামতো নয় দিদিমনি, কথা দিন, তাহলে আমি নিশ্চিন্ত হয়ে দেশে যেতে পারি।
এতোবড় দায়িত্বভার আমি গ্রহণ করতে পারবো তো?
দিদিমনি, আপনিই এখন আমার ভরসা। কথাটা বলে রহমান নিজেই যেন আতঙ্কে শিউরে উঠলো। সর্দার সম্বন্ধে সে কি করে এতো বড় একটা অবান্তর ভাবধারা কল্পনায় আনতে পারলো! কিন্তু পরক্ষণেই মনকে সুস্থ করে নিলো রহমান, কারণ এখন যে অবস্থায় তার সর্দার উপনীত হয়েছে তাতে সূক্ষ্ণ বিবেচনা করে অগ্রসর হওয়া সম্ভব নয়। যেমন করে হোক, যেমন ভাবে হোক। সর্দারকে স্বাভাবিক করে নিতে হবে। যে ঔষধে কাজ করে তাই প্রয়োগ করতে হবে তার উপর। বললো রহমান পারবেন আপনি। আপনারা নারী জাতি, মায়ের জাত। আপনারাই পারবেন পথহারাকে পথ দেখাতে…একটু থেমে বললো রহমান আবার ফিরে এসে যেন মালিককে তার স্বাভাবিক জীবনে দেখতে পাই।
রহমান কথা শেষ করে যেমন এসেছিলো তেমনি সরে যায় সতর্কতার সঙ্গে।
মিস এলিনা কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে সেখানে দাঁড়িয়ে থাকে, গভীরভাবে কি যেন চিন্তা করে। টাঙ্গীচালক রহমান মিয়া যা বলে গেলো তা অতি আনন্দপূর্ণ বাক্য। রাজকুমার তা হলে তার প্রিয়জন মানে তার স্ত্রীকে হারিয়েছে। একটা খুশি দোলা দিয়ে গেলো এলিনার হৃদয়ে। তবু যা হোক রাজকুমার আজ একা। ওকে আপন করে নিতে কতক্ষণ!
মিস এলিনা বাগান থেকে এক থোকা গন্ধরাজ ফুল হাতে তুলে নিয়ে সিঁড়ি বেয়ে উপরে এগিয়ে চললো।
সিঁড়ির মুখে পৌঁছতেই দারওয়ান জানালো–রাজা বাহাদুর এখন তাঁর বিশ্রামকক্ষে আছেন।
এলিনা তার কথায় কান না দিয়ে এগিয়ে গেলো রাজ বাহাদুরের সঙ্গে আমার জরুরী দরকার আছে।
আরও কয়েকজন আপত্তি জানালো, এখন রাজকুমারের সঙ্গে দেখা হবে না।
কিন্তু আজ এলিনা কারো কথা মানলো না।
গন্ধরাজের থোকাটা হাতে নিয়ে সোজা এগিয়ে গেলো এলিনা বনহুরের বিশ্রাম কক্ষে।
বনহুর তার দারোয়ান-বয়-বাবুচী সবাইকে নিষেধ করে দিয়েছিলো, কেউ তার সঙ্গে দেখা করতে চাইলে তারা যেন রাজি না হয়, কারণ তার শরীর অসুস্থ!
একমাত্র রহমানই এখানে আসতো যেতো নিজ ইচ্ছামত, তাছাড়া একটি প্রাণী এ বাড়িতে প্রবেশে সক্ষম হতোনা। বনহুর তাই আপন মনে শুধু নূরীর কথাই ভাবতো, আর যেন কোনো চিন্তাই ছিলোনা তার।
মিস এলিনা আজ কারো বাধা না মেনে সোজা বনহুরের বিশ্রামকক্ষে প্রবেশ করলো।
দরজার কাছে দাঁড়িয়ে থমকে দাঁড়ালো এলিনা।
বনহুর তখন একা একা মেঝেতে পায়চারী করছে। পদশব্দে ফিরে তাকালো বনহুর, এলিনাকে তার কক্ষে প্রবেশ করতে দেখে অবাক হয়ে তাকালো।
এলিনা হাস্য উজ্জ্বল মুখে বললো–বড় একা একা লাগছিলো তাই একটু গল্পসল্প করতে এলাম। নিশ্চয়ই আপনি অসন্তুষ্ট হননি?
বনহুর ভূকুঞ্চিত করে বললো–না। বসুন।
এলিনা গন্ধরাজের থোকাটা হাতের মুঠায় নাড়াচাড়া করতে করতে বসে পড়লো সোফায়, তারপর একটু হেসে বললো–তবু যা হোক কথা বলতে পারেন। আমি কিন্তু আপনাকে বোবা মনে করেছিলাম।
এলিনার বিদ্রূপ ভরা কথা বনহুরের কাছে অসহ্য মনে হলো। আজ তার মনের অবস্থা পূর্বের ন্যায় থাকলে এ কথাগুলো তাকে একটুও বিরক্ত করতো না। আজ এলিনার কথায় চট করে কোনো জবাব দিতে পারলো না বনহুর। যেমন নিশ্চুপ দাঁড়িয়েছিলো তেমনি রইলো।
এলিনা গন্ধরাজের থোকাটা টেবিলে রেখে বললো–আপনি বিরক্তি বোধ করলে, চলে যাই। কেমন?
এবার বনহুর চোখ তুললো।
এলিনার সঙ্গে চোখাচোখি হলো বনহুরের।
এলিনা সে দৃষ্টির কাছের একমুহূর্ত আর টিকতে পারলো না, ছুটে বেরিয়ে এলো বাইরে। তারপর দ্রুত পদক্ষেপে সিঁড়ি বেয়ে নীচে নেমে এলো, নিজের ঘরে গিয়ে মুক্ত জানালার পাশে। দাঁড়িয়ে হাঁপাতে লাগলো। রাজকুমারের কক্ষে কেননা গিয়েছিলো, কিসের লোভে গিয়েছিলো সে ওখানে। পরপর কয়েকদিন রাজকুমারের সঙ্গে দেখা করতে গিয়ে বিফল হয়েও কি তার শিক্ষা হয়নি? এতো অপমানের পর আবার কেনো গেলো সে তার সম্মুখে? জীবনে এলিনা বহু পুরুষের সঙ্গে মিশবার সুযোগ পেয়েছে কিন্তু তাকে কেউ এমনভাবে উপেক্ষা করেনি কোনোদিন। রাজকুমার যত ঐশ্বর্যের মালিকই হন না কেনো, তাদেরই বা কম কোথায়? তার বাবা মিঃ লারলং কোটিপতি, আরাকান শহরে বাড়ি-গাড়ি-ঐশ্বর্যের অভাব নেই। আর তার নিজের নারী জীবনেরই কোনোদিকে কম আছে! তার যৌবন-সৌন্দর্য যে কোনো পুরুষের কামনার বস্তু। কত পুরুষ তার সৌন্দর্যের ভিখারী হয়ে পিছনে পিছনে ছায়ার মত ঘুরে বেড়ায়, আর কোথাকার কে রাজকুমার। কত রাজা মহারাজা পর্যন্ত তার পাণিপ্রার্থী হয়ে তার পিতার নিকটে এসেছে। এলিনা কাউকে স্বামীত্বের অধিকার দেয়নি।
এলিনার মনে দারুণ ক্ষোভের সৃষ্টি হলো, রহমান মিয়ার কথাতেই তো সে গিয়েছিলো। সেখানে। না হলে সে কিছুতেই যেতোনা। রাজকুমার তাকে তাড়িয়ে না দিলেও তার চোখেমুখে দেখতে পেয়েছিলো এলিনা একটা উপেক্ষার ভাব। সে সহ্য করতে পারেনি রাজকুমারের সে চাহনী।
*
এলিনা তখন যতই রাগান্বিত বা ক্রোধান্ধ হয়ে চলে আসুক কিন্তু সে কিছুতেই রাজকুমারের উপর অভিমান করে থাকতে পারলো না। রাজকুমারের সৌন্দর্যে তার হৃদয় বাধা পড়ে গিয়েছিলো, কিছুতেই সে তাকে ভুলতে পারছিলো না। কোথাকার কে রাজকুমার, কোনোদিন যার সঙ্গে ছিলোনা তার পরিচয়, কি হবে তার কথা ভেবে…এমন নানা ভাবনা ভেবে মন থেকে মুছে ফেলতে চেয়েছিলো সে রাজকুমারকে। কিন্তু শত চেষ্টা করেও পারেনি, ব্যর্থ হয়েছে এলিনা নিজের মনের। কাছে।
