রহমানের কথায় এলিনা চিন্তা করলো, তারপর বললো–বেশ, তোমাকে ভরসা দিচ্ছি, আমাকে বললে তোমার রাজকুমারের যদি কোনো উপকার হয় তা হলে বলো।
আপনাকে নিভৃতে বলবো।
বেশ চলো।
এলিনা এগিয়ে যায় বাগানের নির্জন স্থানে। রহমানের মুখোমুখি দাঁড়ায় সে এবার, হাসিভরা মুখে বলে–বল রহমান মিয়া, কি বলতে চাও তুমি?
রহমান যত সহজে বলবে ভেবেছিলো তত সহজে বলা তার হলোনা। যার সম্বন্ধে বলবে তার বিষয়ে ব্যাপারটা অত্যন্ত কঠিন কাজ। সর্দারের স্বভাব তার অজ্ঞাত নয়। তবু সে পুরুষ মানুষ এখন তার যে মনের অবস্থা তাতে একমাত্র নারীই পারবে তার মনের পরিবর্তন আনতে। তাছাড়া সর্দারকে আবার তার স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে কেউ পারবেনা।
রহমানকে নত মস্তকে ভাবতে দেখে মিস এলিনা বললো–কি ভাবছো রহমান মিয়া?
কথা দেন দিদিমনি, আমার কথা আপনি রাখবেন?
বলো, রাখবো!
আমার রাজকুমারের মনে একটা দারুণ ক্ষত হয়েছে। সে ক্ষতের কোনো ঔষধ আমি আবিষ্কার করতে পারছি না, যে ঔষধে তিনি আরোগ্যলাভ করতে পারেন।
এলিনা অবাক হয়ে বললো–তোমার কথা আমি ঠিক বুঝতে পারছি না রহমান মিয়া? আমি সব বুঝিয়ে বলছি দিদিমনি। বেশ বলো?
দিদিমনি, যদিও আপনার সঙ্গে আমার বেশি দিনের পরিচয় নয়, তবু আপনার অন্তরের যে পরিচয় আমি পেয়েছি তা আমার মনে এনেছে একটি আশার বাণী। আমার রাজকুমার তার প্রিয়জনকে হারিয়েছে। তাকে হারিয়ে সে আজ উদ্ভ্রান্ত উদাসীন এমনকি নিজের নাওয়া খাওয়া পর্যন্ত ছেড়ে দিয়েছেন। দিদিমনি, আপনি নারী দয়া-মায়া-মমতায় আপনার হৃদয় পরিপূর্ণ। আমার মালিককে আপনি সুস্থ করে দিন দিদিমনি, আপনিই পারবেন তার মনকে সচ্ছ-স্বাভাবিক করতে। তার বিনিময়ে যা চান তাই আমি দেবো আপনাকে।
হঠাৎ এলিনার মুখভাব ভাবাপন্ন হয়ে পড়লো। মনে পড়লো পর পর কয়েকটা ঘটনার কথা। প্রথম যেদিন রাজকুমারের সঙ্গে তার পরিচয় হলো সেদিন সে লক্ষ্য করেছে রাজকুমার একটি বারের জন্যও তার মুখের দিকে তাকায়নি। রাজকুমারের সৌন্দর্যে সে মুগ্ধ হয়েছিলো বটে কিন্তু খুশি হয়নি তার ব্যবহারে। এরপর আরও কয়েকদিন এলিনা রাজকুমারের সঙ্গে সাক্ষাৎ আশায় উনুখ হয়ে এগিয়ে গেছে সিঁড়ি বেয়ে উপরে, কিন্তু বিফল হয়ে ফিরে এসেছে। দারওয়ান বলেছে, কুমার বাহাদুর এখন দেখা করতে পারবেন না! কোনোদিন বা বলেছে, তার শরীর ভাল নেই। আবার গেছে এলিনা তবু মনের আকর্ষণে, কিন্তু কোনোদিন তার সাক্ষাৎ লাভ ঘটেনি তার ভাগ্যে। আজ মিস এলিনা বুঝতে পারলো কেনো রাজকুমার তার সঙ্গে এমন ব্যবহার করেছে। রাজকুমারের মনের অবস্থা তাহলে স্বাভাবিক নেই এবং সেই কারণেই সে সাক্ষাৎ আশায় গিয়ে বার বার ব্যর্থ হয়ে ফিরে এসেছে। এলিনা মডার্ণ যুবতী কেমন করে পুরুষ মানুষকে মুগ্ধ করতে হয় জানে সে। তবে এলিনা সত্যিকারের কুৎসিত্মনা বা অসৎচরিত্র মেয়ে নয়। সে ক্লাব, ফাংশন বা পার্টিতে নিয়মিত যোগ দিলেও নিজের ইজ্জৎ সম্বন্ধে সব সময় সচেতন ছিলো। বয়স এলিনার। কম নয়, নিজের ভালোমন্দ বুঝবার মতো জ্ঞানও তার হয়েছিলো। কাজেই বহু পুরুষ বন্ধুর সঙ্গে মিলামিশা করলেও এলিনা আজও কাউকে মন দিয়ে গ্রহণ করেনি বা করতে পারেনি। সেদিন রহমান মিয়া যখন রাজকুমারের সঙ্গে তার পরিচয় করিয়ে দিলো তখন কেননা যেন এলিনা নিজকে হারিয়ে ফেলেছিলো, বিমুগ্ধ হয়ে গিয়েছিলো সে।
এলিনার বড় ভালো লেগেছিলো রাজকুমারকে, এতো দিনে মনের মতো একটি পুরুষ যেন সে খুঁজে পেলো। একটা অভূতপূর্ব আনন্দে হৃদয়মন নেচে উঠেছিলো তার। কিন্তু অল্পক্ষণেই মনের ভ্রম ভেঙে গিয়েছিলো; রাজকুমার তার অপরূপ সৌন্দর্যে, আলটা মডার্ণ সাজসজ্জায় এতোটুকু আকর্ষিত হয়নি। একবার তার দিকে ভাল করে তাকিয়েও দেখেনি সে!
সেদিনের কথা মনে হতেই এলিনার হৃদয় ক্রোধান্ধ হয়ে উঠে। আজ পর্যন্ত কোন পুরুষ তাকে উপেক্ষা করতে পারেনি, সবাই তার এতোটুকু আন্তরিকতা লাভের জন্য সর্বদা লালায়িত। থাকতো। আর এই রাজকুমার তার সৌন্দর্যের অবমাননা করলো। ঐ রাতে একটি বারের জন্য ঘুমাতে পারেনি এলিনা, সর্বদা রাজকুমারের ঔদাসিন্যতা মনকে উদভ্রান্ত করে তুলেছিলো। আজ এলিনা বুঝতে পারলো রাজকুমারের সে অপরাধ ইচ্ছাকৃত নয়, তার মনের দাহ তাকে চেতনালুপ্ত করে ফেলেছে। রহমানের কথায় আজ তার মন সচ্ছ হয়ে এলো। বললো এলিনা রহমান মিয়া, তোমার রাজকুমার সম্বন্ধে আমি ভেবে দেখবো। ‘
হাত দুখানা জোর করে রহমান দিদিমনি, দয়া করে এই উপকারটুকু করুন, করুন দিদিমনি। আমি আপনার কাছে চির উপকৃত থাকবো…
বেশ, কথা দিলাম আমি চেষ্টা করে দেখবো, কিন্তু রহমান মিয়া, তোমার রাজকুমার অদ্ভুত মানুষ।
দিদিমনি, তিনি অদ্ভুত মানুষ বলেই তো আপনার শরণাপন্ন হচ্ছি। আমি পারলামনা তাকে সামলে নিতে। পারলামনা স্বাভাবিক করে আনতে। আপনি নারী, আপনাদের মধ্যে এমন একটা গুণ আছে যা মরু হৃদয়ে বারিবর্ষণ করে। তাপিত হৃদয়ে আনে অনাবিল শান্তিধারা। দিদিমনি, আমি কাল আরাকান ছেড়ে চলে যাচ্ছি, ফিরতে কিছুদিন বিলম্ব হবে।
ওঃ এই কথা! এবার বুঝতে পেরেছি রাজকুমারকে একা ফেলে মন তোমার যেতে চাইছেনা। বলো সত্যি কি না?
হাঁ দিদিমনি, আপনি যা বলেছেন। রহমান এলিনার সঙ্গে ঠিক টাঙ্গীচালক বা একটি সাধারণ চাকরের মতো কথাবার্তা বলছিলো। সে যে একজন বিশ্ববিখ্যাত দস্যুর বিশ্বস্ত অনুচর এরকম কোনো নিদর্শনই ছিলোনা তার মধ্যে। নিজকে নিপুণভাবে টাঙ্গীচালক হিসেবে বানিয়ে নিয়েছিলো রহমান।
