তবে আমাকে নিয়ে চলো কাকু, আমার মাম্মির কাছে যেতে ইচ্ছে হচ্ছে। কত দিন আমার মাম্মিকে দেখিনা।
হাঁ যেও, যেও মনি, কিন্তু সে যে অনেক অনেক দূরের পথ।
আমি সেখানেই যাবো। আমার মাম্মিকে ছাড়া আমি যে আর থাকতে পারছি না কাকু। কত দিন আমি মাম্মিকে দেখিনি।
রহমান অতিকষ্টে এতোক্ষণ নিজকে সংযত রেখেছিলো, কিন্তু পারেনা, মনিকে সরিয়ে দিয়ে দ্রুত বেরিয়ে যায় সে; যাবার সময় বলে যায়–মনি তুমি থাকো, আমাকে এক্ষুনি টাঙ্গী নিয়ে বাইরে যেতে হচ্ছে।
মনি অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে।
রহমান ততোক্ষণে বেরিয়ে গেছে বাইরে।
মনি ছুটে যায় বারেন্দায়, কিন্তু রহমান তখন টাঙ্গী নিয়ে রাস্তায় নেমে পড়েছে।
*
সোজা রহমান তার সর্দারের বাড়ী গিয়ে হাজির হলো। টাঙ্গী গাড়ি বারেন্দায় রেখে সিঁড়ি বেয়ে উঠে গেলো উপরে।
বনহুর তখন রেলিং এ ভর দিয়ে তাকিয়ে আছে নির্জন প্রান্তরের দিকে। বাড়িখানার পিছনে আর কোনো লোকালয় ছিলো না, শুধু বিস্তৃত প্রান্তর।
বনহুর আজকাল প্রায়ই এই রেলিং এর পাশে এসে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকতো। সিগারেটের পর সিগারেট নিঃশেষ করে চলতো সে, কখন দিনের আলো নিভে গিয়ে সন্ধ্যার অন্ধকার নেমে আসতো খেয়াল থাকতো না তার।
আজও বনহুর এই রেলিং এর পাশে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে সিগারেটের পর সিগারেট পান করছিলো। সম্মুখস্থ ধুম্রকুন্ডলির দিকে তাকিয়ে ভাবছিলো কত কথা। আজ বার বার তার চোখের সামনে ভেসে উঠছে একটি মুখ, সে মুখখানা আর কোনোদিন ফিরে আসবেনা, চিরদিনের মতো হারিয়ে গেছে কোনো অতল গহবরে।
সর্দার…
রহমানের কণ্ঠস্বরে চমকে উঠে বনহুর।
কিন্তু ফিরে তাকায় না সে, যেমন দাঁড়িয়েছিলো তেমনি দাঁড়িয়ে থাকে।
রহমান আবার ডাকে–সর্দার!
বনহুর ফিরে তাকিয়েই জবাব দেয়–বলো?
রহমান ঘনিষ্ঠ হয়ে আসে, বলে সে–সর্দার, মনিকে যে আর রাখতে পারছি না।
এবার বনহুর তাকালো রহমানের মুখের দিকে, হাতের অর্ধদগ্ধ সিগারেটখানা দূরে নিক্ষেপ করে বললো-কি হয়েছে রহমান?
মনি বাপি আর মাম্মি মাম্মি করে অস্থির হয়ে পড়েছে। সব সময় আমাকে সে ব্যতিব্যস্ত করে তুলেছে। কি করি বলুন, বলুন সর্দার?
বনহুর গম্ভীরভাবে কিছু চিন্তা করলো, তারপর বললো–রহমান, মনিকে কান্দাই নিয়ে ওর। মায়ের কাছে পৌঁছে দাও।
কিন্তু মনি কি এখন তার মাকে চিনতে পারবে?
রহমান, রক্তের যেখানে সম্বন্ধ সেখানে চেনা-অচেনার প্রশ্ন উঠে না। মা সন্তানকে চিনে নিতে অসুবিধা হবেনা। একদিন যাকে খুশি করার জন্য ওকে চুরি করে এনেছিলাম সে আজ নেই কাজেই তাকে ফিরিয়ে দিয়ে এসো।
সর্দার! আর আপনি?
আমি আর ফিরে যাবো না রহমান। এ মন নিয়ে আমি মনিরার সামনে গিয়ে দাঁড়াতে পারবোনা।
সর্দার, বৌ-রাণী যদি আপনার কথা জিজ্ঞাসা করেন?
তাকে বলো–আমি ভালো আছি।
তাতেই কি বৌ-রাণী খুশী হবেন?
তুমি যা ভালো বোঝো তাকে বুঝিয়ে বলো। যাও যাও রহমান, আমি আর ভাবতে পারছি না কিছু।
সর্দার, আপনাকে এ অবস্থায় ফেলে আমি কান্দাই এ ফিরে যাবো কি করে? আমি এসে আপনাকে জোর করে খাইয়ে দি তবে খান, আমি এসে আপনাকে গোসলের জন্য তাগাদা করি, তবে গোসল করেন। সর্দার, আপনাকে এ অবস্থায় ফেলে আমি যেতে পারবোনা।
তাহলে মনিকে হারাবে। মনির মনের অবস্থা সচ্ছ নয়, তাকে শীঘ্র তার মায়ের কাছে পৌঁছে না দিলে হঠাৎ সে অসুস্থ হয়ে পড়তে পারে।
বেশ, আমি যাবো, মনিকে নিয়ে যাবো বৌ-রাণীর কাছে। কিন্তু কয়েক দিনের জন্য আমাকে এখানে থেকে যেতে হবে।
বেশি বিলম্বে খারাপ হতে পারে।
আমি মনিকে ক’দিনের জন্য সামলে নেবো।
যা ভাল মনে করো।
বনহুর নিজের কক্ষে চলে যায়।
রহমান বেরিয়ে যায় সেখান থেকে।
সিঁড়ি বেয়ে নীচে নেমে আসতেই দূরে বাগান মধ্যে দেখতে পায়, মিস এলিনা ফুল গাছে পানি দিচ্ছে।
এলিনার ছোটবেলা হতেই এ অভ্যাস, ফুল গাছের যত্ন করা তার বড় সখ। বাগানে যথেষ্ট মালি থাকা সত্বেও এলিনা এ কাজ নিজ হাতে করতো।
আজও এলিনা প্রতিদিনের মতো বাগানে পানি দিচ্ছিলো।
রহমান সিঁড়ির শেষ ধাপে দাঁড়িয়ে তাকিয়ে রইলো এলিনার দিকে। রহমান তাকে দেখতে পেলেও এলিনা রহমানকে দেখতে পায়নি। সে আপন মনে পানি দিচ্ছিলো।
রহমান নিপুণ দৃষ্টি মেলে তাকালো এলিনার দিকে, সত্যি এলিনা অপূর্ব সুন্দরী। নারী-দেহে যতটুকু সৌন্দর্যের প্রয়োজন সব আছে এলিনার মধ্যে। আজ রহমান এলিনার রূপ লাবণ্য আবিষ্কার করলো নতুন দৃষ্টি নিয়ে। রহমান ধীর পদক্ষেপে এলিনার পিছনে এসে দাঁড়ালো দিদিমনি!
ফিরে তাকালো কে, রহমান মিয়া!
জ্বি হা।
রহমান এলিনাকে দিদিমনি বলে ডাকতো। এলিনা, ওকে নাম ধরে বলতো। এলিনা রহমানকে ভালো নজরে দেখতো।
রহমানকে দেখে হেসে বললো এলিনা খবর কি রহমান মিয়া, তোমার রাজকুমার কেমন আছেন?
রহমান মুখ গম্ভীর করে বললো–রাজকুমারের খবর ভালো নয় দিদিমনি।
কেনো? কিসের অভাব তোমার রাজকুমারের?
একটা কথা আপনাকে বলবো দিদিমনি, যদি আপনি আমাকে ভরসা দেন?
রহমানের কথা বলার ভঙ্গি দেখে হাসে এলিনা, বলে সে এমন কি কথা রহমান মিয়া যা বলতে তোমার ভরসার দরকার?
একটু চিন্তা করে বলে আবার রহমান আমার রাজকুমারের জীবন নিয়ে কথা দিদিমনি। আপনি যদি আমাকে ভরসা দেন তাহলে আপনাকে বলবো কথাটা।
