বাড়ির মালিক আরাকানবাসী ধনি ব্যবসায়ী মিঃ লারলং যৌথ, প্রচুর ঐশ্বর্যের অধিকারী তিনি। তার কন্যার নাম মিস এলিনা যৌথ। মিস এলিনা আলটা-মডার্ণ সুন্দরী যুবতী। সব সময়। ক্লাব-ফাংশান আর পার্টি নিয়ে এখানে সেখানে ঘুরে বেড়ায়। পিতা বয়স্ক হলেও বৃদ্ধ নয়, যৌবন ছাড়ি-ছাড়ি করলেও সম্পূর্ণ ছেড়ে যায়নি এখনও। সারাদিন বাড়ির মধ্যেই কাটান মিঃ লারলং যৌথ, বিশেষ দরকার ছাড়া বাইরে যান না। তেমন করে কারো সঙ্গে মেশেন না ভদ্রলোক।
বনহুর এহেন বাড়িওয়ালার ভাড়াটে হিসাবে আশ্রয় পেলো সেই বাড়িতে।
রহমানের পরিচয় প্রথম মি: লারলং যৌথের সঙ্গে নয়, মিস এলিনার সঙ্গেই তার প্রথম পরিচয় ঘটে। একদিন দুর্যোগপূর্ণ রাতে মিস এলিনা কোনো এক পার্টি থেকে বাড়ি ফিরবার পথে গাড়ির অম্বেষণে অস্থির হয়ে উঠেছিলো। পথে কোনো যানবাহনই ছিলোনা সেদিন। একা একা মিস এলিনা বিপদে পড়ে গিয়েছিলো প্রায় এমন সময় রহমান তার টাঙ্গীখানা নিয়ে বাড়ী ফিরছিলো।
দূরে কোনো আরোহীকে পৌঁছে দিয়ে ফিরতে তার বিলম্ব হয়ে গিয়েছিলো অনেক।
হঠাৎ রহমান পথের ধারে একটি যুবতীকে দেখে গাড়ি রেখে বলেছিলো–আপনি এই ঝড় বৃষ্টির মধ্যে কোথায় যাবেন? যদি মনে কিছু না করেন তবে আসুন আপনাকে গন্তব্যস্থানে পৌঁছেদি।
যুবতী রহমানের কথায় যেন অন্ধকারে আলোর সন্ধান পেলো। রহমান তাকে গাড়িতে তুলে নিয়ে নির্বিঘ্নে পৌঁছে দিয়েছিলো সেদিন তাকে তার বাড়িতে।
সেদিনের পর থেকেই পরিচয় রহমানের সঙ্গে মিস এলিনার। শুধু তাই নয় মিঃ যৌথও রহমানকে স্নেহের চোখে দেখেন। রহমান প্রায়ই এ বাড়িতে টাঙ্গী নিয়ে বেড়াতে আসতো, বিশেষ করে মিস এলিনার অনুরোধেই আসতো সে। রহমানের টাঙ্গীতে বৈকালিক ভ্রমণটা সেরে নিতো মিস এলিনা।
রহমান এই বিদেশ-বিভুয়ে এমন একটা সহৃদয় সঙ্গী পেয়ে আনন্দ বোধ করতো। মিস এলিনার চাল-চলন ওকে মুগ্ধ করতো, ভাল লাগতো ওর কাছে। শুধু তাই নয় মিঃ যৌথের আচার ব্যবহারও রহমানের মনকে আকৃষ্ট করেছিলো। রহমান টাঙ্গী চালক হলেও তাকে মিঃ যৌথ পরম আত্নীয়ের মতোই মনে করতেন। কারণ তার একমাত্র কন্যা মিস এলিনাকে দুর্যোগপূর্ণ রাতে গাড়িতে করে নির্বিঘ্নে বাড়িতে পৌঁছে দেওয়া কম কথা নয়।
রহমানকে সেদিন মিঃ যৌথ বহু অর্থ দিতে গিয়েছিলেন-কন্যার জীবন রক্ষার বিনিময়ে। কিন্তু রহমান একটি পয়সাও নেয় নি।
এক টাঙ্গীচালকের মহৎ হৃদয়ের পরিচয় পেয়ে মিঃ লারলং যৌথ চমৎকৃত হয়েছিলেন। তাকে আবার আসার জন্য অনুরোধ করেছিলেন তিনি।
সেই পরিচয়ে রহমান আজ এতো সুন্দর বাড়িখানা তার সর্দারের জন্য ভাড়ায় পেয়েছে। বাড়িখানা সত্যি সুন্দর এবং মনোরম। যদিও শহরের একপ্রান্তে এ বাড়িটা তবু অত্যন্ত মডার্ণ ধরনের তৈরী।
রহমান সর্দারের সুখ-সুবিধার জন্য যা কিছু প্রয়োজন সব ব্যবস্থাই করে দিয়েছিলো এখানে। যাতে করে সর্দারের মনে আবার শান্তি ফিরে আসে, আবার সে স্বাভাবিক হতে পারে।
কিন্তু রহমানের এতো প্রচেষ্টা ব্যর্থ হলো।
বনহুর কিছুতেই এ বাড়িতে এসেও স্বস্তি পাচ্ছিলো না। একটা বিষণ্ণতা ভাব তাকে যেন আচ্ছন্ন করে ফেলেছিলো। সব সময় কক্ষমধ্যে নীরবে বসে বসে ভাবতো। রহমানের অনুরোধে অবশ্য নিজের বেশ-ভূষা পাল্টে পরিচ্ছন্ন হতে বাধ্য হয়েছিলো সে।
রহমান মিঃ লারলং যৌথের কাছে বনহুরের পরিচয় দিয়েছিলো কান্দাই এর রাজকুমার বলে। কাজেই বনহুরকে রাজকুমারের মতো করেই সাজিয়ে নিয়েছিলো রহমান।
রাজকুমারের বেশে বনহুরকে অদ্ভুত সুন্দর লাগছিলো। যদিও ক’দিনের অনিয়মে তার শরীর আগের চেয়ে অনেক খারাপ হয়ে গিয়েছিলো তবুও মূল্যবান বেশ-ভূষায় অপূর্ব মানিয়েছিলো তাকে।
মিঃ যৌথ এবং তার কন্যা মিস এলিনা বনহুরের সৌন্দর্যে প্রথমেই মুগ্ধ হয়ে গেলো। যদিও বনহুর তাদের সঙ্গে তেমন কোনো কথা-বার্তা বা আলাপ-আলোচনা করলোনা তবুও মিস এলিনার বড় ভাল লাগলো তাকে।
মিঃ যৌথ এবং মিস এলিনা রাজকুমার বেশি দস্যু বনহুরকে অত্যন্ত ভালভাবে আদর আপ্যায়ন করলো।
কিন্তু এতো করেও রহমান নিশ্চিন্ত হলো না। কিছুতেই সর্দারকে সচ্ছমনা করতে পারলো না সে। যখনই রহমান এ বাড়িতে আসতো তখনই দেখতো, বনহুর তার হলঘরে বসে আপন মনে গভীরভাবে কি যেন চিন্তা করছে। কোনো সময় এসে দেখতো, বিছানায় বালিশটা আঁকড়ে ধরে উবু হয়ে পড়ে আছে, চোখের পানিতে সিক্ত হয়ে উঠেছে বালিশটা।
সর্দারের এ অবস্থা রহমানের হৃদয়ে আঘাত করতো। কেমন করে তার মনে আনন্দ আনবে, কেমন করে আবার তার সর্দার পূর্বের মত স্বাভাবিক হবে–এই চিন্তায় অস্থির হয়ে পড়েছিলো রহমান।
নিজের কুঠিরে ফিরে গেলে মনির করুণ মুখ আর এখানে এলে সর্দারের ব্যথা কাতর চাহনী, রহমান যেন অতিষ্ঠ হয়ে উঠলো। নূরীর শোকে সে নিজেই কাতর কিন্তু শোক করবার মতো অবসর কই তার। মনের সব ব্যথা পাথর চাপা দিয়ে রহমান দু’দিক রক্ষা করার চেষ্টা করে। বাড়ি ফিরে আসতেই ছুটে আসে মনি, জাপটে ধরে রহমানকে আমার মাম্মি এলোনা কাকু? আমার বাপি কখন আসবে?
রহমান অতিকষ্টে নিজকে সংযত রেখে বলে–বাবা তুমি কিচ্ছু ভেবোনা। তোমার বাপি আর মাম্মি খুব ভালো জায়গায় আছে। সময় হলেই চলে আসবে তারা।
