বনহুর নীরব।
রহমান বলে চলে– খোদার ইংগিৎ ছাড়া কিছু হয় না। সর্দার নূরীকে আমরা হারিয়েছি সে তো তারই ইচ্ছা। তিনি যদি নূরীকে গ্রহণ করে সুখী হয়ে থাকেন তাতে আমাদের দুঃখ করে কোনো লাভ হবে না। তাকে ফিরে পাবার আর কোনো উপায় নেই।
এতোক্ষণে কথা বলে বনহুর রহমান, কিন্তু আমি যে নূরীর শেষ স্মৃতিগুলো কিছুতেই মন থেকে মুছে ফেলতে পারছি না। রহমান, কিছুতেই আমি ভুলতে পারছি না তাকে….।
সর্দার, তাই বলে আপনি জ্ঞানবান হয়ে এতো অবুঝ হলে চলবে কেমন করে। ধৈর্য ছাড়া কোনো উপায় নেই। সর্দার, এখন আপনি যদি এমনভাবে ভেঙে পড়েন তাহলে যারা হাজার হাজার অনাথ-আঁতুড়- দুঃস্থ পরিবার আপনার মুখের দিকে তাকিয়ে প্রহর গুণছে, তাদের কি অবস্থা হবে, একবার ভেবে দেখুন দেখি! সর্দার, আপনার যে চেহারা দেখতে পাচ্ছি, নিশ্চয়ই আপনি এ ক’দিন কিছু মুখে দেননি।
বনহুর শুকনো ঠোঁট দু’খানা জিভ দিয়ে একবার চেটে নিলো। সত্যি সে ক্ষুধার্ত; আজ কদিন সম্পূর্ণ অনাহারে একমাত্র ঝরণার পানি পান করা ছাড়া কিছু মুখে দেয়নি।
রহমান আর একদণ্ড বিলম্ব না করে ছুটে চললো। জঙ্গলে বহু সুস্বাদু ফলের গাছ ছিলো। রহমান কিছু ফল সংগ্রহ করে ফিরে এলো বনহুরের পাশে।
বনহুরকে জোর করে কয়েকটা ফল খাইয়ে দিলো। তারপর বললো রহমান সর্দার, চলুন আরাকান শহরে, মনি তার বাপি আর মাম্মির জন্য ব্যাকুল আগ্রহ নিয়ে প্রতিক্ষা করছে।
বনহুর বললো– না, পারবোনা রহমান, মনির সম্মুখে আর ফিরে যেতে পারবোনা।
মনি যে আপনার জন্য কেঁদে কেটে আকুল হচ্ছে। সর্দার, মনির মুখের দিকে তাকিয়ে চলুন, চলুন সর্দার।
রহমান, কোন মুখে আমি ফিরে যাবো, মনি যখন তার মাম্মির জন্য আমাকে প্রশ্ন করবে কি জবাব দেবো আমি তার? বলো, বলো রহমান, কি জবাব দেবো আমি তার? বনহুরের কন্ঠ বাষ্পরুদ্ধ হয়ে আসে।
রহমান অস্কুট ধ্বনি করে উঠলো– সর্দার?
আমি পারবোনা আর মনির সামনে যেতে। তুমি আমাকে অনুরোধ করোনা বন্ধু।
সর্দার। সর্দার….।
জানি তুমি আমার অন্তরের ব্যথা নিজের অন্তর দিয়ে অনুভব করছো। রহমান, তুমি শুধু আমার সহকারী নও তুমি আমার বন্ধু। তোমার কাছে বলতে আমার কোন আপত্তি নেই। আমি ছোট বেলায় নূরীকে পেয়েছিলাম, যখন আমি জানতাম না জীবন কি জিনিস। প্রথম নূরীকে আমি দেখেছিলাম খেলার সাথী হিসেবে, তারপর ওর মধ্যে আমি খুঁজে পেয়েছিলাম আমার পুরুষ জীবনের প্রথম আশ্বাস-ভালবাসা। আমি ওকে ভালবেসেছিলাম শুধু সাথী হিসেবে নয়–সঙ্গিনী হিসেবে। নূরীই আমার জীবনে বপন করেছিলো প্রথম ভালবাসার বীজ। আমি অন্তর দিয়ে গ্রহণ করেছিলাম তার সেই পবিত্র ভালবাসা। কিন্তু কি বলবো তোমাকে রহমান, আমি শুধু তার কাছে গ্রহণই করে গেছি প্রতিদানে তাকে কিছুই দেইনি। তবু সে কোনোদিন আমার উপর রাগ অভিমান করেনি…. আবার কণ্ঠ ধরে আসে বনহুরের, চোখ দুটো অশ্রু ছল ছল হয়। কিছুক্ষণ নিশ্চুপ থেকে নিজকে প্রকৃতিস্থ করে নেয়, তারপর আবার বলে সে–রহমান, তুমি সবই জানো, তোমাকে নতুন করে আমার বলতে হবেনা। নূরীকে আমি কোনোদিন সুখী করতে পারিনি, আমি। বড় পিশাচ, বড় নরাধম।
রহমান বলে উঠে এবার–সর্দার, নূরী যা চেয়েছিলো–পেয়েছে। মৃত্যুর পূর্বে তার বাসনা পূর্ণ হয়েছে। নূরী জীবনে চেয়েছিলো তার বনহুরকে স্বামীরূপে পাবে, সে আশা তার বিফল হয়নি। নূরী অসুখী হয়ে মৃত্যুবরণ করেনি সর্দার।
রহমান!
হাঁ সর্দার!
কিছুক্ষণ আবার নীরবে কাটে তাদের।
রহমান বলে– সর্দার, ভেবে আর কি হবে, মনির কাছে না যেতে চান আমি আরাকানে ভিন্ন একটি বাড়ি আপনার জন্য ব্যবস্থা করবো।
তা হয় না।
তাহলে কি করবেন সর্দার?
দূরে অনেক দূরে কোনো দেশে চলে যাবো।
আর আমাদের আস্তানা আর দলবল?
তুমি ফিরে গিয়ে সব দায়িত্বভার গ্রহণ করো রহমান।
সর্দার, আমাকে মাফ করবেন।
তাহলে তুমিও যেওনা, যেখানে নূরী নেই সেখানে গিয়ে আর কি হবে।
সর্দার, আপনি পাগল হয়ে যাবেন।
হাঁ, নূরী আমাকে পাগল করে দিয়ে গেছে। আমি ভাবতে পারছি না নূরীর মৃত্যু হয়েছে। রহমান, সত্যিই কি নূরীকে আমি জন্মের মত হারিয়েছি?
রহমান কোনো জবাব দেয় না, দিতে পারেনা।
রহমান তখন জবাব দিতে না পারলেও বনহুরকে আর বনে ছেড়ে আসতে পারলোনা, তাকে নিয়ে এলো সঙ্গে আরাকান শহরে।
রহমান বোঝালো বনহুরকে আপনার আরাকানে বহু কাজ আছে, আপনি যদি এ ভাবে উদভ্রান্তের মতো হয়ে পড়েন তাহলে নূরীর হত্যার প্রতিশোধ নেওয়া হবে না। সর্দার, যেমন করে হোক নূরীর হত্যাকারীকে খুঁজে বের করতেই হবে।
বনহুর নূরীর শোকে এতো মুহ্যমান হয়ে পড়েছিলো যে নূরীর হত্যাকারীকে সায়েস্তা করার কথা কোনো সময় তার মনে উদয়ই হয়নি। রহমানের কথায় বনহুরের চোখ দু’টো ধক ধক্ করে জ্বলে উঠে। একটা প্রতিহিংসার বহ্নিজ্বালা ফুটে উঠে তার মুখে।
রহমান একটা বড় বাড়ি ভাড়া নিয়ে বনহুরকে সেই বাড়িতে এনে রাখলো। তার খাওয়া দাওয়া বা অন্যান্য কোনো অসুবিধা যাতে না হয় সে জন্য রহমান সব কিছুর ব্যবস্থা করে দিলো।
বাড়িখানা শহরের নির্জন প্রান্তে, মস্ত বড় বাড়ি অথচ বাড়ী খানায় কোন লোকজন নেই। উপরের তলাটাই রহমান তার সর্দারের জন্য ভাড়া নিয়েছে, আর নীচে থাকে বাড়ির মালিক আর তার কন্যা।
