রহমান অন্ধকারে ভাল করে তাকালো, কিন্তু কিছুই তার দৃষ্টি গোচর হলোনা। আকাশে অসংখ্য তারা জেগে থাকা সত্বেও গহন বনে এতোটুকু আলো প্রবেশে সক্ষম হচ্ছিলোনা। জমাট অন্ধকারে নিজের হাতখানাই রহমান দেখতে পাচ্ছিলো না। তবু সে মনোযোগ দিয়ে শুনতে চেষ্টা করলো।
বেশ স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে, কে যেন ফুঁপিয়ে কাঁদছে। কোনো পুরুষ হৃদয়ের তাপিত দীর্ঘশ্বাস।
কিছুক্ষণ শব্দটা শোনা গেলো তারপর মনে হলো সমস্ত বনভূমি নীরব হয়ে গেছে। শব্দটা। আর শোনা যাচ্ছে না।
*
কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছে রহমান, খেয়াল নেই বুঝতেও পারেনি সে। তাজের চি হি চি হি শব্দে নিদ্রা ছুটে গেলো তার। দড়বড় উঠে সোজা হয়ে বসতে গেলো, কিন্তু পরক্ষণেই সামলে নিলো নিজকে, আর একটু হলেই হয়ছিলো আর কি। একেবারে গাছের নীচে পড়ে মাথাটা থেতলে চ্যাপটা হয়ে যেতো।
কোনো রকমে নিজকে বাঁচিয়ে নিয়ে তাকালো রহমান গাছটার নীচের দিকে। দিনের আলোয় চারিদিক ঝকমক করছে। রহমান সব দেখতে পেলো এবার। প্রথমেই রহমানের দৃষ্টি আকর্ষণ করলো তাজ। তাজ গাছের দিকে মাথা উঁচু করে উদ্ভূত শব্দ করছে- চি হি চি হি..
রহমান বুঝতে পারলো তাজ কিছু বলতে চায় বা বলছে। আর বিলম্ব না করে নীচে নেমে এলো সে তাজের পাশে এসে দাঁড়াতেই তাজ রহমানের কাপড় কামড়ে ধরলো।
রহমান বললো– কি বলছিস তাজ?
তাজ মাথা নাড়লো এবং তাকে সামনের দিকে টানতে লাগলো।
রহমান লক্ষ্য করলো দুলকী অদূরে দাঁড়িয়ে আছে।
তাজের সঙ্গে রহমান এগিয়ে চললো, ঝোপ-ঝাড় জঙ্গল পেরিয়ে তাজ চলেছে রহমান তাকে অনুসরণ করছে।
বেশ কিছুদূর অগ্রসর হতেই রহমান দেখলো বনটা এখানে অনেক পাতলা হয়ে এসেছে। সূর্যের আলো বনভূমি উজ্জ্বল করে তুলেছে। [ রহমান নিপুণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করে চারিদিকে দেখতে লাগলো। সব দেখতে পাচ্ছে সে, কোথাও অন্ধকার নেই।
হঠাৎ রহমান বিস্ময়ে চমকে উঠলো, অদূরে একটা গাছের গুঁড়িতে ঠেস দিয়ে বসে আছে তার সর্দার। রহমানের দৃষ্টি প্রথম নজরেই চিনতে পারলো, যদিও মাথাটা হাটুর মধ্যে খুঁজে বসেছিলো তবু চিনতে ভুল হলো না তার।
রহমান ক্ষিপ্রগতিতে ছুটে গেলো বনহুরের পাশে। অস্ফুট কণ্ঠে ডেকে উঠলো– সর্দার!
রহমানের কণ্ঠস্বর বনহুরের কানে পৌঁছলো কিনা কে জানে, যেমন বসেছিলো সে তেমনি হাঁটুর মধ্যে মাথা গুঁজে বসে রইলো নিশ্চুপ পাথরের মূর্তির মত।
রহমান ব্যাকুল কণ্ঠে আবার ডাকলো- সর্দার–সর্দার– সর্দার…
ধীরে ধীরে চোখ তুলে তাকালো বনহুর।
রহমানের দৃষ্টি বনহুরের মুখে পড়তেই তার বুকের মধ্যে ঝড়ের তান্ডব শুরু হলো, একি চেহারা হয়ে গেছে তার সর্দারের মুখে খোঁচা খোঁচা দাঁড়ি, চোখে উদাস চাহনি, চুলগুলো রুক্ষ। তৈলবিহীন। গায়ের জামা-কাপড়ের চেহারা সম্পূর্ণ পালটে গেছে, মলিন ধূলোবালি মাখা। রহমানের দিকে তাকিয়ে বনহুর কোনো কথা বললোনা, ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে রইলো কেমন। যেন উদভ্রান্তের মতো।
রহমান আর নিজকে প্রকৃতিস্থ রাখতে সক্ষম হলোনা, আকুল কণ্ঠে বলে উঠলো–সর্দার, আপনার এ অবস্থা কেনো? নূরী কোথায় তাকে তো দেখছিনা?
বনহুর রহমানের মুখ থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে নিলো, উদাস ব্যথা করুণ নয়নে তাকালো সম্মুখের দিকে। কিছু বলবার জন্য ঠোঁট দু’খানা যেন নড়ে উঠলো কিন্তু একটা শব্দও তার গলা দিয়ে বের হলোনা।
সর্দারের এ অবস্থা রহমানের হৃদয়কে চূর্ণবিচূর্ণ করে দিচ্ছিলো। প্রায় কাঁদো কাঁদো গলায় বলে আবার রহমান সর্দার, কি হয়েছে বলুন? বলুন সর্দার? আর নূরীই বা কোথায়?
বনহুর আবার নিজের চোখ দুটো রহমানের মুখে তুলে ধরলো। তারপর বললো সে — রহমান, যাকে তুমি আমার কাছে গচ্ছিত রেখে গিয়েছিলে তাকে আমি হারিয়েছি।
সর্দার নূরী…
হা! নূরী আর জীবিত নেই।
নূরী জীবিত নেই!
না।
সর্দার নূরীর কি হয়েছিলো? কি করে তার মৃত্যু হলো?
তাকে নর-পিশাচের দল তীর নিক্ষেপ করে হত্যা করেছে।
রহমান দুই হাতে বুকটা চেপে ধরে আর্তনাদ করে উঠলো
–উঃ
কিছুক্ষণ উভয়েই নীরব।
রহমানের গণ্ড বেয়ে গড়িয়ে পড়তে লাগলো তপ্ত অশ্রু।
নূরীকে সর্দারের হাতে সঁপে দিয়ে আশ্বস্ত হয়েছিলো সে। যাক, নূরী যে সুখী হয়েছে তাতেই তার সান্ত্বনা। নূরীকে হারানোর ব্যথা তার হৃদয়ে আঘাত করলেও এমন নিদারুণভাবে দগ্ধীভূত হয়নি!
রহমান ডুকরে কেঁদে উঠলো- সর্দার নূরী নেই! তার মৃত্যু হয়েছে!
হাঁ, রহমান, তোমার গচ্ছিত ধন আমি হেফাযতে রাখতে পারিনি–বনহুর দুই হাতে মাথার চুল টেনে ছিঁড়তে লাগলো। একটা অব্যক্ত যন্ত্রণা ফুটে উঠলো তার চোখে-মুখে।
রহমান এ দৃশ্য সহ্য করতে পারলো না, মুখ ফিরিয়ে দাঁড়ালো সে। মর্মে মর্মে অনুভব করলো– সর্দারের এ অবস্থা কেননা, কেননা আজ সে উদ্ভ্রান্তের মতো উদাস হয়েছে। নূরীকে কতখানি ভালোবাসতো সর্দার আজ তা সমস্ত অন্তর দিয়ে অনুভব করলো।
বেশ কিছু সময় নীরবতার মধ্যে কেটে গেলো বনহুর আর রহমানের।
রহমান ভেবে দেখলো এখন যদি সে নূরীর শোকে মুহ্যমান হয়ে পড়ে তাহলে নূরী তো গেছেই, সর্দারকেও হারাবে। রহমান এবার ধৈর্যের বুক বেঁধে নিলো, নিজেকে শক্ত এবং সংযত করে নিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়ালো।
এগিয়ে এলো সে বনহুরের পাশে অতি মিনতি ভরা করুণ কণ্ঠে বললো– সর্দার, সর্দার আপনার একি চেহারা হয়ে গেছে সর্দার?
