খানিকটা অগ্রসর হতেই রহমান হঠাৎ হোঁচট খেয়ে পড়তে পড়তে বেঁচে গেলো। নরম কোনো বস্তুর সঙ্গে তার পা দু’খানা লেগে গিয়েছে।
রহমান এবার নাকে রুমাল চাপা না দিয়ে পারলো না। সে কি ভীষণ দুর্গন্ধ। উবু হয়ে রহমান বসে হাত দিয়ে অনুভব করতেই চমকে উঠলো, শিউরে উঠলো সে, একটা গলিত মৃতদেহ তার। পায়ের কাছে পড়ে আছে।
এতোক্ষণে রহমান বুঝতে পারলো যে উকট বিশ্রী গন্ধটাকে তাকে অতিষ্ঠ করে তুলেছে। সে গন্ধ অন্য কিছুর নয়, এই মৃতদেহের। রহমানের বুকের মধ্যে হাতুড়ির ঘা পড়লো, শিউরে উঠলো তার পা থেকে মাথা অবধি, তবে কি তার সর্দারের লাশ এটা?
রহমান দ্রুত হস্তে পকেট থেকে ম্যাচ বাক্স বের করে আলো জ্বালালো। ম্যাচের কাঠিটা তুলে ধরলো মৃতদেহের মুখে। যদিও মৃত দেহটা পচে ফুলে উঠেছে, তবুও রহমান আস্বস্ত হলো কারণ সর্দারের মৃতদেহ এটা নয়। সর্দারের সুন্দর চেহারা পঁচে গলে গেলেও এতো কুৎসিৎ হতে পারেনা।
রহমান ম্যাচের কাঠি পর পর জ্বালিয়ে লাশটা পরীক্ষা করে দেখতে লাগলো, যখন তার মন থেকে সব সন্দেহ দূর হলো তখন উঠে দাঁড়ালো সে। অন্ধকারে ভালো করে লক্ষ্য করতেই রহমান। দেখলো আশে-পাশে আরও কয়েকটা লাশ ছড়িয়ে পড়ে আছে।
আবার রহমানের বুকের মধ্যে একটা আশঙ্কায় দোলা নাড়া দিয়ে গেলো তবে কি এখানেই তার সর্দারের– না, সে কথা ভাবতে পারেনা রহমান। একটা অব্যক্ত যন্ত্রণা করতে লাগলো তার সমস্ত অন্তর জুড়ে।
রহমান সাহসী যুবক ভয় কাকে বলে জানেনা, তবু আজ তার মনে একটা দুর্বলতা কম্পন জাগালো। হায় আজ তাকে সর্দারের শেষ পরিণতি স্বচক্ষে দেখতে হবে। কিন্তু দেখেও উপায় নেই, দেখতেই হবে কোথায় তার সর্দার।
ম্যাচের কাঠি জ্বেলে প্রত্যেকটা লাশ পরীক্ষা করে দেখতে লাগলো রহমান। সে বেশ বুঝতে পারলো, সম্ভবতঃ তার সর্দারের সঙ্গে এই নরপিশাচদের তুমুল যুদ্ধ হয়ে গেছে। প্রত্যেক লাশের দেহগুলির ক্ষত যদিও স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছেনা, তবু লাশগুলি দেখে ঐ রকমই মনে হচ্ছে। কোনো কোনো লাশের দেহ শিয়াল ভক্ষণ করে বিকৃত করে ফেলেছে। কোনোটার মুখ নেই, কারোটার বুকের মাংস, কোনো লাশের নাড়িভুড়ি ছড়িয়ে পড়ে আছে চারিদিকে।
এতো উৎকট বিশ্রী গন্ধে বেশিক্ষণ রহমান টিকতে পারলোনা। লাশগুলি বেশ দূরে এখানে সেখানে বিক্ষিপ্ত ছড়িয়ে পড়ে আছে। রহমানের ম্যাচের কাঠিও প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। রাতের মত তাকে কোথাও অপেক্ষা করতেই হবে, তারপর সন্ধান করতে হবে সর্দার আর নূরীর। কিন্তু এখানে এক মুহূর্ত অপেক্ষা করা তার পক্ষে দুষ্কর হয়ে উঠেছে। পঁচা ভ্যাপসা গন্ধে নিশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে তার। রহমান তাজ আর দুলকীকে ডাকলো, তারপর বেশ কিছু দূরে একটা গাছের। নিকটে এসে দাঁড়ালো। এখানে গন্ধ লাগছেনা, বেশ সচ্ছ বাতাস অনুভব করলো রহমান। ভালভাবে লক্ষ্য করতেই দেখলো গাছটার অদূরে বয়ে চলেছে একটা ছোট্ট নদী বা ঝরনা হবে। ঝরনার ধারেই ছোট-বড় পাথরের টিলা। রহমান এতোক্ষণে প্রাণভরে নিশ্বাস নিলো। কারণ পঁচা উৎকট গন্ধে তার নাড়িভুড়ি যেন বেরিয়ে আসছিলো।
মনে দুর্ভাবনা নিয়ে রহমান রাত কাটানোর জন্য স্থান অন্বেষণ করতে লাগলো। গহন বন, চারিদিকে হিংস্র জন্তুর গর্জন, রক্তপিপাসু জানোয়ারের লোলুপ থাবা থেকে জীবনে বেঁচে থাকতে হলে তাকে গাছে উঠতে হবে।
অগ্যতা রহমান সামনে বৃক্ষে আরোহণ করাই সাব্যস্ত করে নিলো। তাজ আর দুলকী রইলো। নীচে। গাছের একটা চওড়া ডালে রহমান বসে পড়লো রাতের মত।
গাছটা খুব উঁচু হলেও বেশ ঝাকড়া ধরনের কাজেই কোন অসুবিধা হলোনা রহমানের। ডালের এমন এক স্থানে এসে বসলো রহমান যেখানে তার হেলান দিয়ে বসবার মতো জায়গা ছিলো।
গাছের ডালে বসে রহমান আশ্বস্ত হলেও চিন্তাশূন্য হলোনা, কারণ এখনও জানেনা সে তার সর্দার আর নূরী সুস্থ আছে কিনা। একটা উদ্ভব চিন্তাধারা তাকে অস্থির করে তুললো।
রাত যতই বেড়ে আসছে ততই গহন জঙ্গল বন্য জীবজন্তুর কোলাহলে মুখর হয়ে উঠেছে। পঁচা লাশগুলো নিয়ে শিয়াল কুকুরের দল তীব্র মারামারি আর কাড়াকাড়ি শুরু করে দিয়েছে। সে কি ভয়ঙ্কর হুলস্থুল কাণ্ড!
দুঃসাহসী রহমানের বুকটাও কেঁপে কেঁপে উঠছে। আর একটা দুর্বলতা তার মনকে বিচলিত করে তুলছিলো সেটা সর্দারের শেষ পরিণতি চিন্তা করে। না জানি এই সব মৃতদেহের মধ্যে দস্যু বনহুরের লাশও আছে কিনা।
রহমান দু’হাতে মাথার রগ টিপে ধরে, সর্দারের অমঙ্গল চিন্তা সে কিছুতেই সহ্য করতে পারছিলোনা। শুধু সর্দারের মৃত্যু চিন্তাই নয়, তার সঙ্গে ছিলো নূরী। না জানি নুরীর পরিণতি কি হয়েছে, সর্দারকে নিহত করে নূরীকে নিয়ে শয়তানের দল পালিয়ে যায়নি তো?
কে জানে, কে জবাব দেবে তার প্রশ্নের।
রহমান চিন্তা সাগরে হাবুডুবু খেতে লাগলো। তারপর কখন যে একটু তন্দ্রা এসেছে চোখে খেয়াল নেই তার। হঠাৎ তন্দ্রা ছুটে গেলো রহমানের, কান পেতে শুনলো একটা কেমন যেন শব্দ ভেসে আসছে। কেউ যেন ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে বলে মনে হলো।
এখন বনটা বেশ নীরব বলে মনে হচ্ছে। পচা লাশগুলি নিয়ে এতোক্ষণ শিয়াল কুকুরের যে তীব্র কাড়াকাড়ি মারামারি চলছিলো এখন তারা সরে গেছে। মনে হয় ওদের ক্ষুধা নিবৃত্ত হওয়ায় অলস দেহটা নিয়ে বিশ্রামের চেষ্টা করছে। কিন্তু এ কিসের শব্দ! রহমান কান পেতে শুনতে লাগলো, এযে কোন পুরুষ মানুষ ফুঁপিয়ে কাঁদার শব্দ। তবে কি তার মনের ভ্রম? হয়তো তাই হবে এই নির্জন গহন বনে মানুষ এলো কোথা হতে।
