খালার সঙ্গে রহমান আলাপ জমিয়ে নিয়েছিলো অত্যন্ত আপন জনের মতো। খালাও ভালোবেসে ফেলেছিলো ওদের তিন জনকে একান্ত নিজের সন্তান-সন্ততির ন্যায়। মনি ছিলো বৃদ্ধার যেন নয়নের মনি। মনিকে তার বড় ভাল লাগতো, মনির নাওয়া-খাওয়া সব দায়িত্বভার নিজের ঘাড়ে নিয়েছিলো তুলে, বিশেষ করে নূরীর অন্তর্ধানের পর রহমান যখন ক্ষিপ্তের মত এখানে সেখানে ছুটোছুটি করে ফিরেছিলো তখন এই বৃদ্ধা মনিকে বুকে আঁকড়ে ধরেছিলো, সান্ত্বনা দিয়েছিলো আমি তোমার বুড়ি-মা।
তখন থেকে মনি বৃদ্ধাকে বুড়ি-মা বলে ডাকতো। বুড়িমার কথায় মনি উঠতে-বসতো– সব করতো। কাজেই বুড়ি-মা বা খালার কথায় মনি রাজি হয়ে গেলো, বললো– আচ্ছা তুমি যাও কাকু, আমার বাপি আর মাম্মিকে নিয়ে এসো।
এতোদিন সর্দার নূরীকে নিয়ে ফিরে না আসায় মনে মনে বেশ উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছিলো রহমান। তবে সন্দেহ হচ্ছিলো তার সর্দার হয়তো নূরীকে নিয়ে ফিরে গেছে কান্দাই জঙ্গলে নিজের আস্তানায়। অবশ্য এই চিন্তার উপরেই বেশি জোর দিয়েছিলো বলেই রহমান আজও নিশ্চুপ ছিলো তার টাঙ্গী চালানায়।
নূরীকে হারানো বেদনা রহমান মন থেকে মুছে ফেলবার জন্যই সব সময় কাজে লিপ্ত। থাকতো। নিজকে ব্যতিব্যস্ত রাখতো টাঙ্গী আর দুলকীর মধ্যে। মনিকে বুকে জাপটে ধরেও মাঝে মাঝে সান্ত্বনা খুঁজতো, কিন্তু কিসের যেন একটা অব্যক্ত যন্ত্রণা তাকে অহঃরহ দগ্ধীভূত করে চলতো। রহমান তখন সব ত্যাগ করে নির্জনে গিয়ে বসতো, যাকে সে কোনো দিন পাবেনা, যাকে সে জনমের মত হারিয়েছে, তাকেই স্মরণ হতো বার বার করে।
রহমান শুধু নূরীকে ভালই বাসতোনা, নূরীর মঙ্গল কামনাই ছিলো তার জীবনের মূল উদ্দেশ্য এবং সেই কারণেই নূরীকে সে এতো সহজে ত্যাগ করতে পেরেছিলো, নূরী যাকে চায় তাকেই সে সমর্পণ করেছিলো তার হৃদয়ের রাণীকে।
সেদিন সর্দারের হাতে নূরীকে সঁপে দিয়ে হাসিমুখে ফিরে এসেছিলো রহমান তার নিজের কুটিরে। অন্তর তার চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে গেলেও সান্ত্বনা ছিলো– নূরী তার কামনার জনকে আজ একান্ত আপন করে পেয়েছে। নূরীর নারী জীবন আজ ধন্য হয়েছে, সার্থক হয়েছে তার বাসনা।
রহমান ঈর্ষা করেনা সে চায় সর্দার এবং নূরীর মঙ্গল।
কিন্তু হৃদয়ের কোথায় যেন একটা কাটার খোঁচা অবিরত খচ খচ করে বিঁধছিলো, কোন কিছুতেই সে বেদনার উপশম হতো না।
রহমান যখন তার ক্লান্ত দেহটা শয্যায় মেলে দিতো, হাজার চেষ্টা করেও নরীর প্রতিচ্ছবিটিকে মন থেকে সরাতে পারতোনা। কিন্তু কেনো তার বার বার মনে পড়েছে ওর কথা, রহমান তো জানে– নূরী তাকে কোনো দিন ধরা দেয়নি দেবেও না। তবু–তবু ওর স্মৃতি কেনো তার জীবনের প্রতি ধাপে ধাপে আঁকা হয়ে রয়েছে। নূরী তাকে সব সময় উপেক্ষাই করে এসেছে, কোনোদিন এতোটুকু সহানুভূতি সে পায়নি ওর কাছে। তবু নূরীকে কেননা ভুলতে পারেনা–
রহমান সমস্ত চিন্তাকে মুছে ফেলে উঠে দাঁড়ালো। যাবে সে আবার সেই আরাকান জঙ্গলে, যেখানে তার কল্পনার রাণী আর রাজা বিচরণ করে ফিরছে।
মনিকে বুড়ি-মার নিকটে পৌঁছে দিয়ে দুলকীর পাশে এসে দাঁড়ালো, ঠিক সেই মুহূর্তে তাজের উপর নজর পড়তেই চমকে উঠলো তাজ এলো কখন! আশ্চর্য হয়ে তাকালো রহমান তাজের দিকে। কিন্তু একি! তাজের চেহারা সম্পূর্ণ পরিবর্তন হয়েছে, কেমন যেন বিষণ্ণ মনে মাথা নত করে দাঁড়িয়ে আছে। দেহটা কেমন যেন ক্ষীণ-দুর্বল হয়ে গেছে ওর। তাজের দেহের দিকে তাকিয়ে রহমানের মন আশঙ্কায় দুলে উঠলো।
রহমান ক্ষিপ্র পদক্ষেপে তাজের পাশে এগিয়ে গেলো। তাজের পিঠে মাথায় গলায় হাত বুলিয়ে বললো- তাজ, সর্দার কোথায়? কেমন আছে সে?
তাজ যেন রহমানের কথা বুঝতে পেরেছে, কিছু বলবার জন্য মাথাটা নীচু করে দোলালো। বাকশক্তিহীন জীব সে, রহমান তাজের কথা বুঝতে পারলোনা। কি করে বুঝবে তাজ কি বলতে চায় বা বলছে।
রহমান তাজের অবস্থা দেখে ভীষণ চিন্তিত হলো, তার সর্দার আর নূরী কোনো বিপদে পড়েনি তো! নিশ্চয়ই কিছু একটা হয়েছে, না হলে তাজ এভাবে তার কাছে এসে দাঁড়াতো না। রহমান আর এক মুহূর্ত বিলম্ব না করে দুলকীর পিঠে উঠে বসলো।
তাজ বুঝতে পারলো, দুলকী ছুটতে শুরু করবার পূর্বে সে ছোটা আরম্ভ করলো।
তাজ উল্কা বেগে ছুটছে।
দুলকী অনুসরণ করছে তাকে।
তাজ সোজা আরাকান জঙ্গলে প্রবেশ করলো।
দুলকীর পিঠে রহমানও প্রবেশ করলো জঙ্গলে। তাজ গহন বন ভেদ করে অগ্রসর হচ্ছে। তাজ যেন দুলকীকে পথ দেখিয়ে নিয়ে চলেছে।
কত ঝোপ-ঝাড় আর বন পেরিয়ে তাজ এসে দাঁড়ালো জঙ্গলের মধ্যে এক স্থানে।
একে গহন বন তার পর সন্ধ্যা চলে গেছে তখন, কাজেই বনভূমি অন্ধকারে আচ্ছন্ন হয়ে উঠেছে। স্পষ্ট কিছু দেখা যাচ্ছেনা। রহমান দুলকীর পিঠে বসে তাকালো চারিদিকে। ঝাপসা অন্ধকারে দৃষ্টি তার বেশি দূর এগুলোনা। কিন্তু একটা উৎকট গন্ধে তার নাড়িভূড়ি বেরিয়ে আসতে চাইলো। মাংস পঁচা ভ্যাপসা গন্ধ।
তাজ আর দুলকীর পদশব্দে আশ-পাশ থেকে কতগুলি শিয়াল হুক্কা হুয়া হুক্কা হুয়া করে ছুটে পালালো।
রহমান দুলকীর পিঠ থেকে নেমে দাঁড়ালো এবার। অজানিত একটা আশঙ্কা তার বুকের মধ্যে আলোড়ন সৃষ্টি করলো। গন্ধটা যেনো কোনো জীবের পঁচা দেহের তাতে কোনো সন্দেহ নেই। তাজ কেমন যেন ছটফট করছে এই স্থানে এসে। রহমান নেমে আলগোছে অগ্রসর হলো, সন্ধ্যার অন্ধকার তখন বেশ গাঢ় হয়ে উঠেছে। স্পষ্ট কিছুই দেখা যাচ্ছেনা।
