বনহুর সমস্ত আরাকান জঙ্গলে তন্ন তন্ন করে খুঁজেছে। ঝোপ-ঝাড় বন সব নিপুণ দৃষ্টি মেলে দেখেছে কিন্তু কোথাও নূরীর সন্ধান পায় নি।
একটা গাছের তলায় এসে বসলো বনহুর। আজ ক’দিন সম্পূর্ণ উপবাসী সে। ক্ষুধা- পিপাসা তার হয়েছে কিন্তু উপলব্ধি করতে পারে নি। সম্মুখে বৃক্ষ ভরা কত সুস্বাদু ফল, ঝরণা ভরা স্বচ্ছ জল, বনহুর ইচ্ছা করলে এ সবে ক্ষুধা নিবারণ করতে সক্ষম হতো, কিন্তু তার মনে কোন সময় এ সব চিন্তা আশ্রয় পায়নি।
বনহুর উঠে দাঁড়ালো আবার ফিরে এলো সে যে স্থানে নূরী শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেছে, যেখানে নূরীর মৃতদেহটা পড়েছিলো বনহুর সেই স্থানে এসে দাঁড়ালো, নির্বাক দৃষ্টি মেলে তাকিয়ে রইলো নিস্পলক নয়নে… হঠাৎ বনহুরের চোখের সম্মুখে ভেসে উঠলো একখানা মুখ, সে মুখখানা আর কারো নয়– নূরীর।… ঐ তো নূরী বসে আছে। সেও তাকিয়ে আছে তার দিকে। সুন্দর মুখমণ্ডলে বিষণ্ণতার ছাপ, চোখে করুণ চাহনী। ঠোঁট দু’খানা শুকিয়ে গেছে কেমন যেন রক্তশূন্যতার মতো। চুলগুলো এলোমেলো বিক্ষিপ্ত-কপালে-ঘাটে পিঠে ছড়িয়ে আছে। বনহুর ওর দিকে তাকিয়ে অস্ফুট ধ্বনি করে উঠলো– নূরী–নূরী– দু’হাত প্রসারিত করে ছুটে গেলো ওকে জাপটে ধরতে, কিন্তু কোথায় নূরী– সব শূন্য, সব ফাঁকা।
বনহুর ধপ্ করে বসে পড়লো ভূতলে, দু’হাতে মাথার চুল টেনে ছিঁড়তে লাগলো, ডুকরে কেঁদে উঠলো– নূরী–নূরী তুমি কোথায়… কোথায়…
এমনি শুধু আজ নয়, আরও কতদিন বনহুর ছুটে এসেছে এইখানে, দেখতে পেয়েছে সে। নূরীকে ধরতে গেছে সে, কিন্তু ধরতে পারেনি, কোথায় হারিয়ে গেছে আলেয়ার আলোর মত বাতাসের বুকে।
বনহুর মাথার চুল টেনে ছিঁড়ছিলো, অধর দংশন করছিলো। নূরীর অন্তর্ধান তাকে যেন পাগল করে দিয়েছে।
*
মনি রহমানের গলা জড়িয়ে ধরে বলে– কাক্কু, আমার বাপ্পি তো আর এলোনা?
বনহুরের আগমন প্রতিক্ষায় রহমান প্রহর গুণছিলো মনির মনেই শুধু চিন্তা জাগেনি, বনহুরের জন্য রহমানের মনটাও কেমন যেন চঞ্চল হয়ে উঠেছিলো। সেইদিনের পর রহমান আর আরাকান জঙ্গলে যায়নি। বনহুর আর নূরীর মিলন তার মনে যেমন আনন্দ বয়ে এনেছিলো, তেমনি তার হৃদয় ভরে উঠেছিলো শূন্যতার হাহাকারে।
নূরীকে রহমান অন্তর দিয়ে ভালবেসেছিলো, সমস্ত প্রাণ ভরে সে কামনা করতো ওকে। কিন্তু নূরীর দিক থেকে কোনোদিন সে পায়নি এতোটুকু আশ্বাস। রহমান নূরীকে ভালোবেসে শুধু। দীর্ঘনিশ্বাসই বহন করেছে, কোনোদিন তাকে একান্ত আপন করে পায়নি। ওকে না পাবার বেদনা রহমানের মনে দাহ সৃষ্টি করেছে কিন্তু সান্ত্বনার প্রলেপ সে পায়নি। তাই রহমান সেদিন নূরীকে তার অন্তর থেকে বিদায় দিয়েছিলো, যদিও হৃদয়টা চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যাচ্ছিলো তবু সে নূরীকে তুলে দিয়েছিলো তার প্রিয় সর্দারের হাতে।
রহমানের চোখ দুটি তখন শুষ্ক ছিলোনা, বনহুর বা নূরী কেউ লক্ষ্য করলে দেখতো সে আঁখি দুটিতে কি অসহ্য বেদনা ফুটে উঠেছিলো। সেদিন নূরীকে শেষ বারের মতো বিদায় দিয়েছিলো রহমান তার মনের গহন থেকে।
আজ মনি না বললেও রহমানের মনে সব সময় সর্দার আর নূরীর কথা জেগেছিলো– মুখে ব্যক্ত না করলেও অন্তরে সদা-সর্বদা একটা তুষের আগুনের মতো কুণ্ডলি গুমড়ে জুলছিলো।
সেদিন রহমান আরাকান জঙ্গল থেকে শহরে ফিরে এসে কিছুতেই মনস্থির করতে পারছিলোনা। প্রাণ-প্রতিমাকে বিসর্জন দিয়ে পূজারী যেমন শূন্য কুটিরে ফিরে আসে তেমনি অবস্থা হয়েছিলো রহমানের। নূরীকে চিরদিনের জন্য হারিয়ে রহমান কাতর হলেও ভেঙে পড়েনি। আজ যদি নূরীকে সর্দারের হাতে সমর্পণ না করে অন্য কেউ গ্রহণ করতো, তাহলে রহমান তাকে কিছুতেই ক্ষমা করতো না।
রহমানকে গভীরভাবে চিন্তা করতে দেখে বলে মনি– কি ভাবছো কাকু? আমার বাপি আর আসবেনা?
রহমানের সম্বিৎ ফিরে আসে, বলে সে আসবে। আসবে মনি। কিন্তু…
কিন্তু কি কাক্কু?
এতোদিন এলোনা কেন তাই ভাবছি।
হয়তো কোনো কাজে আটকা পড়ে গেছে। কাক্কু তুমি যাও, আমার বাপিকে নিয়ে এসো।
কিন্তু,
আবার কিন্তু কেনো?
যদি না আসে? আসবে। নিশ্চয়ই আসবে। কাক্কু, তুমি না বলেছিলে মাম্মিও আছে বাপির সঙ্গে?
হাঁ? মনি, সেও আছে তার সঙ্গে।
যাওনা, কাকু, আমার বাপি আর মাম্মিকে নিয়ে এসোগে।
যেতে হবেনা, তাদের সময় হলে এমনিই চলে আসবে।
তুমিতো আরও কতো দিন বলেছে, তারা চলে আসবে কিন্তু আজও তো এলোনা? আজ আমি কিছুতেই শুনবোনা, কাকু তোমাকে যেতেই হবে।
বেশ, আমি তাদের আনতে যাবো, তুমি স্কুলে যাও।
যাবো, এসে যেন বাপি আর মাম্মিকে দেখতে পাই।
পাগল ছেলে, যেখানে তোমার বাপি আর মাম্মি আছে সে স্থান যে অনেক দূরে, তুমি স্কুল থেকে ফিরেও বাড়ির বুড়িমার কাছে থাকবে। বুড়ি-মা ওরফে খালার কথাই বললো রহমান মনির কাছে।
খালা পাশের বাড়ির একটি বিধবা প্রৌঢ়া মহিলা। শুধু রহমানই নয়, এ পাড়ার অনেকেই তাকে ‘খালা’ বলে ডাকে। মহিলাটি অতি মহৎ এবং পরোপকারী। সংসারে তার আপনজন বলতে কেউ নেই, কিন্তু বিষয়-আসয় আছে অনেক, নিজে খেয়ে-পরে প্রচুর বেঁচে যায়। তাই খালা যতটুকু তার সামর্থ পরের কাজে নিজের ঐশ্বর্য বিলিয়ে দেয়, এতোটুকু কার্পণ্যতা নেই তার মধ্যে।
খালার ঐশ্বর্যের মধ্যে তার বেশ কয়টা বাড়ি ছিলো আরাকান শহরে। এ বাড়িগুলি তার কোনটা অতিথি শালা, কোনটা দাঁতব্য চিকিৎসালয়, আর কোনটা ছিলো ভিখারীদের আস্তানা। এই বাড়ীগুলির একটাতেই ভাড়াটে হিসাবে বাস করতো রহমান আর নূরীমনিও তাদের সঙ্গে ছিলো।
