বনহুরের রিভলভার থেকে তখনও অবিরাম গুলী বর্ষণ হচ্ছে; তবে তার পকেটেও আর গুলীর সংখ্যা বেশি নেই। বনহুর এখন অত্যন্ত সাবধানের সঙ্গে গুলী নিক্ষেপ করছে। একটি গুলীও যেন ব্যর্থ না হয়।
হঠাৎ বনহুর এবার লক্ষ্য করলো, ভোলানাথ তার দলবল ত্যাগ করে কোথায় উধাও হয়েছে। সামান্য কয়েকজন লোক তখনও তীর-ধনু আর ছোরা নিয়ে ছুটোছুটি করছে। বনহুরকেই যে তারা অনুসন্ধান করছে তাতে কোন সন্দেহ নেই।
ইচ্ছা করলে এই মুহূর্তে বনহুর সব কটাকে এক এক করে যমালয়ে পাঠাতে পারে কিন্তু ওদের হত্যা করে কোনো লাভ হবে না, আসল শিকার অন্তর্ধান রয়েছে। তবু ওদের না সরানো পর্যন্ত বনহুর নূরীর মৃতদেহের পাশে যেতে পারছে না। বনহুর পরপর আরও দুজনাকে ধরাশায়ী করে ফেললো।
সঙ্গীদের এই পরিণতি দেখে অন্যান্য কয়েকজন আরাকান গুণ্ডা এবার ঝোপ-ঝাড় অতিক্রম করে পালাতে শুরু করলো।
বনহুর আর একদণ্ড বিলম্ব না করে ছুটে চললো যেখানে পড়ে আছে নূরীর তীরবিদ্ধ দেহটা।
কিন্তু কি আশ্চর্য! যেখানে নরীর লাশটা পড়ছিলো সেখানে কিছু নেই, শুধু জমাট বেঁধে আছে। নূরীর বুকের তাজা রক্ত।
বনহুর ধপ করে বসে পড়লো মাটিতে, জমাট বাধা রক্ত মুঠোয় চেপে ধরে ডুকরে কেঁদে উঠলো, ঠিক ছোট্ট বালকের মতো। জীবনে বুঝি সে এমনভাবে কোনোদিন রোদন করে নি।
আজ বনহুর নূরীর অভাব অন্তর দিয়ে অনুভব করলো। বুকের মধ্যে অসহ্য একটা হাহাকার গুমড়ে উঠলো তার। কিছুক্ষণ আগের নূরীর সেই হাসোজ্জ্বল সুন্দর মুখখানা ভেসে উঠতে লাগলো তার মানসপটে। কাজল কালো দুটি চোখে অপূর্ব ভাবময় চাহনী। সরু গোলাপ পাপড়ীর মত দুটি ঠোঁটের ফাঁকে মিষ্টি মধুর হাসি। বনহুর আজ সমস্ত অন্তর দিয়ে নূরীর অপরূপ সৌন্দর্য অনুভব করেছিলো, উপলব্ধি করেছিলো তাকে। নূরীকে আজ বনহুর পেয়েছিলো একান্ত আপন করে। কিন্তু এতো তাড়াতাড়ি যে তাকে হারাতে হবে ভাবতেও পারেনি বনহুর কোনো সময়ের জন্য।
অবুঝ বালকের মতো কাঁদতে লাগলো বনহুর, ফোঁটা ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়তে লাগলো তার গণ্ড বেয়ে। কেউ নেই আজ তাকে সান্তনা দেবার কেউ নেই তার পাশে এসে দাঁড়াবার।
কতক্ষণ বনহুর স্তব্ধ হয়ে বসেছিলো খেয়াল নেই, হঠাৎ একটা হিংস্র গর্জনে ফিরে তাকালো বনহুর, সঙ্গে সঙ্গে রিভলভার উদ্যত করে ধরলো সে।
বনহুরের নিকট হতে কয়েক গজ দূরে একটা বিরাট সিংহ ভয়ঙ্কর মুখ-গহ্বর বিস্ফারিত করে দাঁড়িয়ে আছে, আর এক মুহূর্ত– তাহলেই পশুরাজ তার ঘাড়ে লাফিয়ে পড়বে তাতে কোন সন্দেহ নেই। বনহুর দ্রুত হস্তে রিভলভারখানা বের করে সোজা হয়ে দাঁড়ালো; সঙ্গে সঙ্গে একটি গুলী গিয়ে বিদ্ধ হলো পশুরাজের বুকে।
ভীম গর্জন করে সিংহটা লাফিয়ে পড়লো বনহুরের পাশে। বনহুর অতি কৌশলে নিজেকে সরিয়ে নিলো দূরে।
সিংহরাজ আর দাঁড়াতে পারলো না, মুখ থুবড়ে হুমড়ি খেয়ে পড়ে গেলো।
বনহুর এগিয়ে এলো পশুরাজের মৃতদেহের পাশে। একটি মাত্র গুলীই বনহুরের রিভলভারে শেষ সম্বল হিসাবে ছিলো; তাই আজ এই মুহূর্তে বনহুরকে বাঁচিয়ে নিলো। কিন্তু এ বাঁচায় তার আনন্দ হলোনা, বিপদ কেটে যাওয়ায় আবার নতুন করে নুরীর শোক তার হৃদয়ে দগ্ধীভূত করে চললো। বনহুরের দৃষ্টি নূরীর মৃতদেহের সন্ধানে চারদিকে ঘুরে ফিরতে লাগলো। কিন্তু কোথায় নূরী! হঠাৎ বনহুর লক্ষ্য করলো– সিংহরাজের মুখ-গহ্বর তাজা রক্তে রাঙা হয়ে রয়েছে। তবে কি নূরীর মৃতদেহটা পশুরাজের উদরে স্থান লাভ করেছে? হয়তো তাই হবে, নূরীর মৃতদেহটা তো আর পচে যায়নি– সম্পূর্ণ টাকা লাশ ছিলো ওটা, কাজেই পশুরাজের ভক্ষণে কোন অসুবিধাই হয়নি। নূরীর শেষ পরিণতি চিন্তা করে বনহুরের হৃদয় বিদীর্ণ হলো।
সেদিনের পর থেকে বনহুরের হৃদয় মধ্যে এলে একটা পরিবর্তন। যে নূরীকে সে কয়েকমাস আগে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করেছিলো আজ সেই নূরীর জন্য সর্বহারা রিক্তের মত বনে বনে ঘুরে বেড়াতে লাগলো। আজ বনহুর যেন তার সর্বস্ব হারিয়ে ফেলেছে, সব যেন লুট হয়ে গেছে তার। উষ্ক-শুষ্ক চুল, মলিন মুখমণ্ডল, অবশ শিথিল দেহ, মন্থর পদক্ষেপে চলছিলো– কোথায় যাচ্ছে, কেনো যাচ্ছে, সে নিজেই জানে না। দৃষ্টি উদাস-করুণ বেদনা ভরা।
বনহুর আজ সমস্ত অন্তর দিয়ে অনুভব করছে নূরী তার হৃদয়ের কতখানি অধিকার করে নিয়েছিলো। নূরীর প্রেম-ভালবাসাকে সে চিরদিন উপেক্ষাই করে এসেছে, কোনোদিন তার প্রতি এতোটুকু সহানুভূতি পর্যন্ত দেখায় নি বনহুর। কেন, নূরী কি তাকে কিছু দিয়েছিলো না? নূরীই তো তার জীবনের প্রথম কল্পনার রাণী। নূরীর ভালবাসাই তার জীবনে এনেছিলো প্রথম প্রেম। তাকেই তো প্রথম হৃদয় সিংহাসনে প্রতিষ্ঠা করেছিলো সে। নূরীর মৃত্যুর পর থেকে সেই হয়েছে। তার ধ্যান-জ্ঞান-স্বপ্ন-সাধনা। সেদিনের পর থেকে বনহুর সব সময়ের জন্য এই বনে ঘুরে বেড়াচ্ছে। একটি বারের জন্য ত্যাগ করতে পারে নি সে এই আরাকান জঙ্গল। সারাটা দিন বনে বনে ঘুরে বেড়ায় উদভ্রান্তের মতো, চারিদিকে কি যেন খুঁজে ফেরে, কাকে যেন অন্বেষণ করে সে।
ক্ষুধা-পিপাসা সব যেন উবে গেছে ভুলে গেছে বনহুর সমস্ত দুনিয়াটাকে। যেখানে বসে সেখানে বসেই থাকে প্রাণহীন অসাড়ের মতো।
নূরীকে সে এতোখানি ভালবেসেছিলো নিজেই বুঝতে পারেনি কোনোদিন। নূরীকে হারিয়ে ভুলে গেছে বনহুর তার নিজের অস্তিত্ব।
