ঝরণার পানিতে ফুটন্ত পদ্মফুলের মত ভাসছে নূরী। অপূর্ব লাগছে আজ যেন নূরীকে। মনের আনন্দ সাঁতার কেটে বেড়াচ্ছে সে। নূরীর জন্ম বনে মানুষ হয়েছে সে বনে কাজেই বনে নূরী। যতখানি আনন্দ পায় ততখানি পায়না সে আর কোথাও।
নূরী আর বনহুর উভয়ে উভয়কে নিয়ে মেতে আছে, হাসিতে উচ্ছল হয়ে উঠেছে ওরা।
ওদিকে, ভোলানাথের দল ওৎ পেতে পেতে গাছের আড়ালে আড়ালে প্রায় ওদের কাছাকাছি এসে পড়ে।
ভোলানাথ সবাইকে, সাবধান করে দেয়– কেউ যেন নূরীর দেহে তীর না ছোড়ে।
ভোলানাথ স্বয়ং তীর-ধনু উঁচু করে ধরে বনহুরকে লক্ষ্য করে। চোখ দুটো দিয়ে যেন আগুন ঝরে পড়ছে।
ঝরণার পানিতে সাঁতার কাটলেও নূরীর দৃষ্টি ছিলো চারিদিকে। হঠাৎ নূরীর নজর চলে গেলো দূরে গাছটার পিছনে, ভোলানাথের হস্তে উদ্যত তীর-ধনুর উপর নজর পড়তেই নূরী ছুটে এসে বনহুরকে আড়াল করে দাঁড়ালো।
সঙ্গে সঙ্গে ভোলানাথের হস্তস্থিত তীর ধনু থেকে তীরখানা ছুটে এসে বিদ্ধ হলো নূরীর বুকে!
তীব্র একটা আর্তনাদ করে নূরী লুটিয়ে পড়লো ভূতলে। নূরীর সিক্ত বসন রক্তে রাঙা হয়ে। উঠলো।
বনহুর একবার নূরীর ভুলুষ্ঠিত দেহটার দিকে তাকিয়ে দৃষ্টি ফেললো সম্মুখে।
ভোলানাথ তখন তার দলবল নিয়ে হিংস্র জানোয়ারের মত গর্জন করে এগিয়ে আসছে।
২.০৫ মৃত্যুর কবলে নূরী
বনহুর নূরীর রক্তমাখা দেহটার দিকে একবার তাকিয়ে ক্রুদ্ধ সিংহের ন্যায় সোজা হয়ে দাঁড়ালো, দক্ষিণ হস্তে তার উদ্যত রিভলভার। পকেটে এখনও যথেষ্ট গুলী মজুত রয়েছে।
ভোলানাথ দলবল সহ এগিয়ে আসতেই বনহুরের হস্তস্থিত রিভলভার গর্জন করে উঠলো। অব্যর্থ গুলী বনহুরের সঙ্গে সঙ্গে ভোলানাথের একজন প্রিয় অনুচর আর্তনাদ করে মুখ থুবড়ে পড়ে গেলো ভূতলে।
ভোলানাথ বা তার দলবলের তখন কোনো দিকে ফিরে তাকাবার সময় নেই। শিকারের লালসায় রক্তলোভী জানোয়ার যেমন উগ্র হয়ে উঠে, তেমনি দ্রুত ছুটে চললো ওরা বনহুরের দিকে।
বনহুর মুহর্তে বিলম্ব না করে পরপর গুলী ছুঁড়তে লাগলো। প্রত্যেকটা গুলীর আঘাতে ভোলানাথের সঙ্গীগণ ধরাশায়ী হতে লাগলো। সুচতুর ভোলানাথ কৌশলে তার দলবলের মধ্যে আত্মগোপন করে নিজকে বাঁচিয়ে নিতে লাগলো।
নিজেও ভোলানাথ ও তার সঙ্গীগণ বনহুরকে লক্ষ্য করে তীর এবং ছোরা নিক্ষেপ করতে লাগলো।
বনহুর গাছের গুঁড়ির আড়ালে কখনও বা টিলার পাশে নিজকে আড়াল করে শত্রুপক্ষের অস্ত্র থেকে নিজকে রক্ষা করছিলো। মুহূর্তে মুহূর্তে বনহুরের রিভলভার গর্জন করে উঠছিলো।
ওদিকে ভোলানাথের দলের অস্ত্র-নিক্ষেপের বিরাম ছিলোনা।
বনহুর একা আর ভোলানাথের দলে প্রায় বিশ জনেরও বেশি হবে। তবু ভোলানাথের দল বনহুরের রিভলভারের কাছে টিকে উঠতে পারছিলোনা। বনহুর আজ ভয়ঙ্করের চেয়েও ভয়ঙ্কর হয়ে উঠেছে, সিংহের চেয়েও হিংস্র।
নূরীর মৃত্যু তাকে উম্মাদ করে তুলেছে!
বনহুর শত্রুর সঙ্গে লড়াই এর জন্য প্রস্তুত হয়েই কান্দাই থেকে রওয়ানা দিয়েছিলো, কাজেই রিভলভার এবং অফুরন্ত গুলী সে সঙ্গে নিয়েই এসেছিলো। এই মুহূর্তে বনহুরের সম্বল তার রিভলভারখানা।
ভোলানাথের দল যতই দুর্দান্ত হোক বনহুরের রিভলভারের কাছে নাজেহাল হয়ে পড়লো, এক এক করে অনেকগুলি ধরাশায়ী হলো ভূতলে। রক্তে রাঙা হয়ে উঠলো আরাকান জঙ্গলের মাটি!
সেকি ভীষণ যুদ্ধ।
বনহুর টিলার পাশে আত্মগোপন করে অবিরাম গুলী চালাচ্ছে। কখনও বা গাছের গুঁড়ির আড়ালে, কখনও বা ঝোপ-ঝাড় আর আগাছার অন্তরালে।
মুহূর্তে মুহূর্তে প্রকম্পিত হয় উঠছে বনভূমি বনহুরের রিভলভারের গুলীতে।
আর বেশিক্ষণ টিকে উঠতে পারলো না ভোলানাথের দল, তারা জীবনে বহুজনকে যুদ্ধে পরাজিত করে আরাকানের মাটি লালে লাল করে দিয়েছে, আজ হলো তাদের পরাজয়।
প্রায় তিন ভাগ দুশমন নিপাত করে বনহুর হাঁপাতে লাগলো। রিভলভারের গুলীর সংখ্যাও কমে এসেছে অনেক। বনহুর এখন অনেক সাবধানে গুলী চালাচ্ছে। একটি গুলী যেন তার নষ্ট না হয়।
ইতিমধ্যে ভোলানাথের এক অনুচরের গুলীতে বনহুরের বাম স্কন্ধের খানিকটা মাংস কেটে রক্ত ঝরছিলো।
বনহুর ললাটের ঘাম বাম হস্তের পিঠে মুছে নিয়ে প্রাণপণে যুদ্ধ করতে লাগলো। কাঁধের মাংস কেটে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে সেদিকে তার খেয়াল নেই। গুলীর পর গুলী নিক্ষেপ করে চলেছে সে। বনহুরের সুন্দর মুখমণ্ডল কঠিন হয়ে উঠেছে, দাঁতে অধর চেপে গুলী ছুড়ছে।
ভোলানাথের দলের অস্ত্র নিক্ষেপেরও বিরাম নেই। তারা সংখ্যায় যত কমে আসছে ততই যেন আরও বেশি হিংস্র হয়ে উঠছে। ক্রুদ্ধ জানোয়ারের মতো বনহুরকে হত্যা করবার জন্য ক্ষেপে উঠেছে।
ভোলানাথ স্বয়ং তীর নিক্ষেপ করছে, চোখ দিয়ে যেন অগ্নি শিখা নির্গত হচ্ছে তার। বিরাট দেহটা দুলে দুলে উঠছে ভয়ঙ্কর রাক্ষসের মত। মাথায় একরাশ চুল সজারুর কাটার মত হয়ে উঠেছে, সেকি ভীষণ চেহারা তার!
বনহুর মরিয়া হয়ে গুলী ছুড়ছে, কিন্তু আশ্চর্য–এতো লক্ষ্য করে গুলী ছুঁড়েও ভোলানাথের শরীরে একটি গুলীও বিদ্ধ করতে পারছে না সে।
ভোলানাথের সঙ্গীরা প্রায় শেষ হয়ে এসেছে, মাত্র কয়েকজন এখনও বিপুল উদ্যমে লড়াই করছে। কিন্তু আর বেশিক্ষণ তারা বনহুরের রিভলভারের মুখে টিকতে পারবে বলে মনে হয় না। ভোলানাথের দলের অস্ত্র নিঃশেষ হয়ে এসেছে। এবার ভোলানাথ তার দলবলের মনোভাব বুঝতে পারলো, অস্ত্রশূন্য হয়ে মৃত্যুবরণ করার চেয়ে আত্মগোপন করাই শ্রেয় মনে করলো বুঝি ভোলানাথ।
