বনহুর আর নূরী এই আরাকান শহরের দক্ষিণ পশ্চিম দিকের এক জঙ্গলে তখন হাসি আর গানে মেতে উঠেছে।
নূরী ছেড়ে জামাটায় বনহুর গিট দিয়ে দেয়। চুলগুলি আংগুলে ঠিক করে দিয়ে বলে–নূরী, একটা গান শোনাবে? সেই গান, যে গান তুমি আগে গাইতে?
নূরী গান গায়।
বনহুর নিষ্পলক নয়নে তাকিয়ে থাকে তার মুখের দিকে। ছিন্ন বসনে, এলোমেলো চুলে, ক্ষত-বিক্ষত দেহে অপূর্ব সুন্দর লাগছিলো নূরীকে।
নূরী আজ পূর্বের ন্যায় উচ্ছল হয়ে উঠেছে। নাচে, গায়, ছুটোছুটি করে বেড়ায়। বন্যফুলে বিনি সূতায় মালাগাঁথে, পরিয়ে দেয় সে বনহুরের গলায়।
বনহুর বনের গাছ থেকে ফল পেড়ে নূরীর মুখে তুলে দেয়।
নূরী নিজে খায়, বনহুরকে খেতে দেয়।
বনহুরের হাত ধরে টেনে নিয়ে যায় ঝরণার পাশে। পাহাড়িয়া নদী কুল কুল করে বয়ে চলেছে, নূরী হাটু পানিতে নেমে পানি ছড়িয়ে দেয় বনহুরের গায়ে, চোখে-মুখে।
হাসে বনহুর–ধরতে যায় ওকে।
নূরী ঝাঁপিয়ে পড়ে পানিতে।
বনহুর ওকে আর ধরতে পারে না।
নূরী হাসে।
বনহুর আর নূরী যেন ফিরে পায় তাদের সেই ছোট বেলায় হারানো জীবন।
বনহুরের গাম্ভীর্য দূর হয়ে যায় নূরীর কাছে।
আরাকান জঙ্গলে পাহাড়ে পাহাড়ে নূরীর গানের সুর প্রতিধ্বনি জাগায়। আকাশে-বাতাসে জাগায় শিহরণ। পাখিরা সুর হারিয়ে ফেলে নূরীর সুরের মাধ্যমে।
নূরী ঝরণার পানিতে সাঁতার কাটে–হাসে, গান গায়।
বনহুর পাড়ে দাঁড়িয়ে হাতছানি দিয়ে ডাকে–এসো ফিরে যাই।
নূরী পানিতে গলা অবধি ডুবিয়ে বলে–উঁহুঁ যাবোনা।
আমি তাহলে যাই। বলে বনহুর।
নূরী বলে–যাও দেখি কেমন করে যেতে পারো।
বনহুর অগত্যা ঝরণার তীরে একটা উঁচু জায়গায় বসে পড়ে।
নূরী হাতছানি দিয়ে ডাকে–এসো সাঁতার কাটি।
বনহুর হেসে বলে–পারিনা!
নূরী উঠে আসে–বনহুরের হাত ধরে টেনে নামিয়ে নেয়; খিল খিল করে হাসে।
*
ভোলানাথ স্বয়ং তার কয়েকজন অনুচরসহ এই জঙ্গলে এসে পড়ে। তাদের প্রত্যেকের হস্তে সূতীক্ষ্মধার ছোরা আর তীর-ধনু।
সকলের দেহেই সবুজ রং এর পোশাক।
মাথায় অদ্ভুত ধরণের টুপি আর গালপাট্টা বাধা। এক এক জনের চোখ যেন আগুনের গোলার মতো জ্বলছে।
মুখ কঠিন, লোহার ইস্পাতের মত শরীর। দেখলে সাক্ষাৎ যম বলে মনে হয়।
ভোলানাথ প্রত্যেকটা জঙ্গলে নূরীর অনুসন্ধান করে ফিরছে।
সে জানে–তাদের আরাকান থেকে যুবতী এখনও বাইরে যেতে পারেনি। ভোলানাথের জ্যোতিষী বলেছে–তোমার আকাঙ্খিত নারী কোন জঙ্গলে অবস্থান করছে। সে এখনও আরাকানের মাটি ত্যাগ করেনি। ভোলানাথ তাই জ্যোতিষীর বাক্য শিরোধার্য করে বেরিয়ে পড়েছে। জঙ্গলে জঙ্গলে তার অনুসন্ধান করতে।
ভোলানাথ তার দলবলসহ প্রতিটি ঝোপ-ঝাড় আর গাছপালা শাখা-প্রশাখা অনুসন্ধান করে চলেছে। এতোটুকু জায়গা তারা বাদ দিয়ে যাচ্ছে না, যদি সেখানে আত্মগোপন করে থাকে যুবতী আর তার সঙ্গী।
আসলে ভোলানাথের প্রতিহিংসা, যাকে সে পাবেনা তাকে সে কিছুতেই অন্যের ভোগের সামগ্রী হতে দেবে না।
নূরীর অপরূপ সৌন্দর্য ভোলানাথের লালসা দশগুণ বেড়ে গিয়েছিলো, যেমন করে হোক ওকে সে আত্মসাৎ করবে ভেবেছিলো। হিংস্র জন্তুর মুখের শিকার কেড়ে নিলে যে অবস্থা হয় ঠিক তেমনি অবস্থা হয়েছে স্বয়ং ভোলানাথের।
গোটা বন তোলপাড় করে বন্য হস্তীর মত গাছপালা তচনচু করে ভোলানাথের দল এগিয়ে আসছে।
ভোলানাথ সর্বাগ্রে আর তার দল পিছনে। সূর্যের আলোতে তাদের হস্তস্থিত অস্ত্রগুলি ঝমক্ করে উঠছে।
কি ভয়ঙ্কর আর নৃশংস তাদের চেহারা।
বন্যপশুগণ যে যেদিকে পারছে ছুটে পালাচ্ছে। কত নিরীহ পশু জীবন দিচ্ছে ওদের হাতে।
ভোলানাথের হস্তের সূতীক্ষ্ম তীর-ধনু।
মাথার ঝাকড়া চুলগুলো যেন সজারুর কাটার মত খাড়া হয়ে উঠছে। গোঁফ জোড়া দেখলে যে কোন সাহসী লোকেরও প্রাণ কেঁপে উঠে।
যেমন ভোলানাথের চেহারা ভয়ঙ্কর তেমনি তার কঠিন প্রাণ, এতোটুকু মায়া-মমতার লেশ নাই সেখানে। মানুষের জীবনের কোন দাম নেই ভোলানাথ বা তার দলবলের কাছে। পিপীলিকার মতই মানুষকে ওরা হত্যা করে নির্মমভাবে।
সেই ভোলানাথের শিকার হলো নূরী।
আরাকানে ভোলানাথ দেওজীর প্রতাপ এমন ছিলো প্রত্যেকটা মানুষ তাকে ভয় করতো যমের মত। অনেকেই ভোলানাথের মূর্তি তৈরি করে পূজা করতো–শুধু কামনার জন্য নয়, প্রাণ রক্ষার জন্য।
এহেন ভোলানাথ ক্রুদ্ধ জানোয়ারের মত গর্জন করিতে করিতে এগিয়ে চলেছে। চারিদিকে তার দেহরক্ষী সহচর চক্রাকারে এগুচ্ছে।
হঠাৎ ভোলানাথের দৃষ্টি চলে গেলো দূরে ঝরণার পাশে। সঙ্গে সঙ্গে চোখ দুটো চৰ্চ করে। উঠে তার। সবাইকে ইংগিতে ক্ষান্ত হবার আদেশ দেয়।
ভোলানাথ চোখে দূরবীণ লাগিয়ে দেখে–দূরে, অনেক দূরে ঝরণার জলে একটি যুবতি সাঁতার কাটছে। তীরে একটা উঁচু স্থানে বসে আছে সেই লোকটি, যে তাদের শংকর মাছের চাবুকের জর্জরিত করে যুবতীটিকে নিয়ে পালিয়েছিলো।
দূরবীণে যুবতীটিকে ঠিক চেনা না গেলেও যুবকটিকে চিনতে ভোলানাথের কিছুমাত্র ভুল হয়না।
হিংস্র জন্তুর মত গর্জন করে উঠে ভোলানাথ পেয়েছি।
ভোলানাথের সহচরগণ সবাই তাকালো দূরে–অনেক দূরে ঝরণার দিকে।
ভোলানাথের দল বনহুর আর নূরীকে দেখলেও তারা দেখতে পেলোনা ওদের।
বনহুর নূরীর দিকে তাকিয়ে হাসছে।
নূরী সাঁতার কাটছে রাজহংসীর মত ডানা মেলে।
