নূরী বাষ্পরুদ্ধ কণ্ঠে বললো আবার–তুমি সব পার এটুকু পারো না? একটা জীবন রক্ষার জন্য তুমি গ্রহণ করতে পারো না আমাকে?
নূরী, যা সম্ভব নয় কি করে তা হয় বলো!
দুনিয়ায় এমন কোন কাজই নেই যা সম্ভব নয়! সর্দার, নূরীকে আপনি বাঁচান। কথাটা বলতে বলতে রহমান এসে দাঁড়ায় সেখানে।
বনহুর আর নূরী সরে বসে দুজনার কাছ থেকে।
রহমান বলে– সর্দার, একবার তাকিয়ে দেখুন নূরীর মুখের দিকে। শুধু আপনার জন্যই আজ তার জীবন বিনষ্ট হতে চলেছে। নূরী ফুলের মতই পবিত্র নিষ্পাপ। শত চেষ্টার পরও কেউ তাকে পায়নি। সর্দার আপনি অবুঝ নন। এতোটুকু চিন্তা করে দেখুন কি আপনার কর্তব্য।
রহমান।
সর্দার, আমি আপনার গোলাম। জানি আপনি কি বলতে চাইছেন? আমি নিজে আপনাকে অনুরোধ করছি। আপনি নূরীর জীবন রক্ষার জন্য তাকে গ্রহণ করুন।
বনহুর এবার নিজের অলক্ষ্যে নূরীর মুখের দিকে তাকালো।
নূরী অসহায় দৃষ্টি মেলে তাকিয়ে আছে বনহুরের মুখের দিকে।
রহমান এগিয়ে আসে, নূরীর হাতখানা তুলে নিয়ে বনহুরের হাতখানা তুলে ধরে, তারপর বনহুরের হাতের উপর তুলে দেয় নূরীর হাত–আমি আল্লাকে স্বাক্ষী রেখে নূরীকে সমর্পণ করছে।
করলাম। আপনি কোন দিন ওকে দূরে সরিয়ে দেবেন না… রহমানের গলা চাপা কান্নায় আটকে এলো।
রহমান মথা নত করে সরে গেলো–আমি চললাম, মনি হয়তো আমার জন্য অপেক্ষা
বনহুর আর নূরী তাকিয়ে রইলো রহমানের চলে যাওয়া পথের দিকে। ভোরের সূর্য তখন পূর্ব আকাশে রাঙ্গা হয়ে উঠেছে।
দূর থেকে ভেসে আসছে জঙ্গলী মোরগের ডাক।
নূরী ছিন্নমলিন বেশ; রক্তমাখা শরীর, বনহুরের হাতে তার হাত। নিৰ্ণিমেষ নয়নে তাকিয়ে আছে সে বনহুরের মুখের দিকে।
এতোক্ষণে বনহুরের সম্বিৎ যেন ফিরে এলো, তাকালো সে নূরীর মুখে।
এমন করে কোন দিন বুঝি ওদের দৃষ্টি বিনিময় হয়নি। আজ উভয়ের কাছে উভয়ে নিবিড় এত সম্বন্ধে আবদ্ধ।
বনহুর নূরীকে টেনে নিলো কাছে।
নূরীর আজ নেই কোন দ্বিধা, নিজকে সে বিলিয়ে দিলো বনহুরের বাহু বন্ধনে।
*
বনহুরের কোলে নূরীর মাথাটা, বনহুর নূরীর চুলে ধীরে ধীরে হাত বুলিয়ে দিচ্ছিলো।
নূরী চোখ দুটো বন্ধ করে শুয়েছিলো নিশ্চপ।
বনহুর বললো–তুমি আমার অপূর্ব জীবনের পরম এক সম্পদ। নূরী, তোমাকে সুখী করাই আমার কামনা।
নূরী চোখ মেলে তাকালো–এখন আমার মরলেও দুঃখ নেই। হুর, আর তুমি আমাকে দূরে সরিয়ে দিতে পারবে না।
নূরী বনহুরের কন্ঠ দুই হাতে জড়িয়ে ধরলো, চোখে তার আনন্দ অশ্রু ঝরে পড়তে লাগলো। এতো আনন্দ আর বুঝি তার কোন দিন হয়নি, হৃদয়ে তার খুশির উৎস।
নূরী আজ বনহুরের বুকে মাথা রেখে ভুলে গেলো সমস্ত দুনিয়াটাকে। হুরকে আজ সে অতি আপন করে পেয়েছে, যেমন করে সে কোন দিন পায়নি। বনহুরের বুকে নিজকে সমর্পণ করে নূরী আজ তার নারী জীবন সার্থক করে।
শিশুকালের সপ্নসাধ আজ তার পূর্ণ হয়েছে। বনহুরকে একান্ত নিজের করে পাবে–এটাই ছিলো তার জন্ম জন্মান্তরের কামনা। সে সাধ নূরীর পূর্ণ হয়েছে।
এদিকে নূরী যখন বনহুরকে পাওয়ার আনন্দে আত্মহারা তখন ভোলানাথের দল চাঙ্গা হয়ে উঠেছে। ভোলানাথের দলে লোকসংখ্যা ছিলো প্রচুর। তার সঙ্গি সবুজ পোশাক পরিহিতা পঞ্চদলের এক এক জনের দলে ছিলো হাজারেরও বেশি লোক।
ভোলানাথের আদেশে পঞ্চদল তাদের সাঙ্গ-পাঙ্গ নিয়ে বেরিয়ে পড়লো–জীবিত বা মৃত ঐ যুবতীটিকে তাদের চাই। ভোলানাথ দশ হাজার টাকা তাকে বখশীস দেবে, যে তার মৃতদেহটা পৌঁছাতে পারবে তাদের আড্ডায়।
সমস্ত শহরে গ্রামে-বন্দরে, বন জঙ্গলে, পাহাড়-পর্বতে কোথাও বাকি রইলো না, এমন কি প্রত্যেকটা বাড়িঘর; দালান-কোঠায় গুপ্ত অনুচর নূরীর সন্ধান করে ফিরতে লাগলো বনে বনে শিকারীর বেশে তীর-ধনু হাতে ঘুরতে লাগলো ভোলানাথের দল। নৌকার মাঝি হয়ে কেউ নৌকা বাইতে লাগলো, কেউ বা জেলে সেজে নদীতে মাছ ধরছে, কেউ চৌকিদার সেজে রাতে অন্ধকারে গ্রামের পথে পথে হেঁকে বেড়াচ্ছে। সবাই ওরা নূরীকে দেখেছে, কাজেই চিনতে কারো ভুল হবেনা।
ডাকু ভোলানাথ যত ভয়ঙ্কর তার চেয়ে বেশি সাংঘাতিক তার অনুচর আর দলবল।
ধরতে গেলে সারা আরাকান শহরে ছড়িয়ে আছে এইসব শ্বাপদের দল। সমস্ত আরাকানটা যেন এই সব লোকদের পায়ের তলায় দলিত-মথিত হয়ে বেঁচে আছে কোনরকম। গোটা শহরে তাই নেই কোন শৃঙ্খলা বা কোন আইন কানুন।
বিচার বলে কিছু নেই এ শহরে, আছে শুধু অন্যায় আচরণ আর অনিয়ম।
পুলিশ আছে তারাই ভোলানাথের দলকে দেখে ভয় পায়। কারণ পুলিশের অস্ত্রের শক্তির চেয়ে এ সব শয়তানদের মস্তিষ্কের শক্তি অনেক বেশি। কোন পুলিশ যদি ভোলানাথের কোন অনুচরকে গ্রেপ্তার করে বা কোন রকম কঠিন শাস্তি দেয় তাহলে পরদিন দেখা গেছে সেই পুলিশের ছিন্ন মস্তক পথের ধুলায় গড়াগড়ি যাচ্ছে, বা তার দেহটা জুছে কোন গাছের ডালে।
তাই কেউ সাহস পায় না ভোলানাথের অনুচরদের কুকর্মে বাধা দেয়।
ইচ্ছামত ওরা শহরময় লুটতরাজ, চুরি-ডাকাতি, খুন-খারাবি করে বেড়ায়। এই সব শয়তানদের ভয়ে দেশে কোন সাধু ব্যক্তি বাস করতে পারে না। যারা ধনবান দ্র, তারা অন্য দেশে পালিয়ে গিয়ে ব্যবসা করেন, ঘর বাঁধেন, বা চাকরী করেন।
অদ্ভূত এই আরাকান শহর।
বাংলাদেশ ছেড়ে লক্ষ লক্ষ মাইল দূরে পাথার আর পর্বতে ঘেরা মস্ত বড় এ শহর।
