পথ আগলে দাঁড়িয়ে আছে রহমান,হাতে গুলী ভরা উদ্যত রিভলভার।
বনহুরের চাবুকের আঘাতে ভোলানাথ আর তার পঞ্চ সহচর মাটিতে গড়াগড়ি দিতে লাগলো। এক এক জনের জামা কাপড় ছিঁড়ে পিঠের চামড়া কেটে রক্ত ঝরে পড়তে লাগলো। বনহুরের চাবুক তবু থামতে চায়না।
দক্ষিণ হস্তে চাবুক চালাচ্ছে। আর পা দিয়ে রিভলভারগুলো সরিয়ে দিচ্ছে বনহুর রহমানের দিকে।
বনহুরের হস্তে শংকর মাছের লেজের চাবুক কিছুক্ষণের মধ্যেই কাবু করে ফেললো ভোলানাথ ও তার পঞ্চ সহচরগণকে। সবাই মাটিতে গড়াগড়ি দিয়ে বিলাপ করছে রক্তে রাঙা হয়ে উঠেছে। ওদের দেহ। কিছুক্ষণের মধ্যেই মৃতের ন্যায় নির্জীব হয়ে পড়লো ভোলানাথ ও তার সহচরগণ।
বনহুর এবার শংকর মাছের চাবুকখানা ছুঁড়ে ফেলে দিলো, তারপর দ্রুত হস্তে তুলে নিলো নূরীকে হাতের উপর।
বনহুর নূরীকে নিয়ে বেরিয়ে গেলো। রহমান রিভলভার উদ্যত করে ধরে রইলো ভোলানাথ ও তার সঙ্গীদের লক্ষ্য করে।
তাজের পিঠে বনহুর নূরীকে তুলে নিলো।
তাজ উল্কাবেগে ছুটতে শুরু করলো।
নূরীর হাত পা বন্ধন অবস্থায় থাকায় বনহুর নূরীকে বাম হস্তে আঁকড়ে ধরে ছিলো শক্ত করে। দক্ষিণ হস্তে তাজের লাগাম এটে ধরে চালনা করছিলো।
এই বিপদ মুহূর্তেও এতো কষ্টের মধ্যে নূরীর হৃদয়ে আনন্দের বান বয়ে যাচ্ছিলো, মুক্তির আনন্দে আনন্দিত নয় সে, আনন্দ তার হুরের বুকে আশ্রয় পেয়েছে। এ যে সে কল্পনাও করতে পারেনি, তার হুরকে আবার ফিরে পাবে।
ভুলে গেছে নূরী তার সব যন্ত্রণা। কিছু পূর্বে শংকর মাছের চাবুকের আঘাতে পিঠের চামড়া কেটে রক্ত ঝরে পড়ছিলো, ক্ষুধা পিপাসায় কণ্ঠ শুষ্ক, তবু এতোটুকু যেন বেদনা নেই তার মধ্যে। বনহুরের বুকে মুখ লুকিয়ে একবার ডাকলো নূরী–হুঁর।
বনহুর নূরীর কথায় বললো–খুব কষ্ট হচ্ছে নূরী?
না।
বনহুর পুনরায় বলে–সামনের জঙ্গলে নেমে তোমার হাত পার বন্ধন মুক্ত করে দেবো।
আমার কোন কষ্ট হচ্ছে না হুর। আমার সব কষ্ট দূর হয়ে গেছে।
তাজের পিঠে বনহুর আর নূরীর মধ্যে এর বেশি আর কোন কথা হলো না।
নূরী অবশ্য আর একবার প্রশ্ন করেছিলো–রহমান কোথায়? সেও কি তোমার সঙ্গে এসেছে?
বনহুর ছোট্ট করে জবাব দিয়েছিলো সংক্ষেপে রহমানও আসছে।
সম্মুখের জঙ্গলে যখন বনহুর নূরীকে নিয়ে পৌঁছলো তখন রাত প্রায় ভোর হয়ে এসেছে।
তাজের পিঠে থেকে নূরীকে নামিয়ে নিলো বনহুর। তারপর নিজের কোমরের বেল্ট থেকে ধারালো ছুরি বের করে ওর হাত-পায়ের বাধন কেটে দিলো।
নূরী ভুলে গেলো সমস্ত দুনিয়া! বনহুর তার জন্য মৃত্যুদণ্ডের ব্যবস্থা করেছিলো এবং সেই কারণেই সে আজ রহমানের সঙ্গে পালিয়ে এসেছে সুদূর আরাকান শহরে। নূরী বিস্মৃত হলো সব কথা! তার হাত-পার বাঁধন মুক্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ঝাঁপিয়ে পড়লো সে বনহুরের বুকে। কত দিন পর যেন খুঁজে পেয়েছে তার আপন জনকে।
বনহুরের বাহুবন্ধনে আত্নসমর্পণ করলো নূরী।
বনহুরের প্রশস্ত বক্ষে মাথা রেখে ডাকলো নূরী–হুঁর, কোথায় হারিয়ে গিয়েছিলে তুমি?
গভীর আবেগে নূরীকে বাহুবন্ধনে আবদ্ধ করে বললো বনহুর–নূরী, তুমি আজও আমাকে ভুলতে পারলে না?
কি করে ভুলবো? তোমার স্মৃতি আমাকে অহরহ স্মরণ করিয়ে দেয় তোমার কথা। জীবন। থাকতে তোমাকে আমি কোন দিন ভুলবো না।
নূরী! বনহুর নূরীর পিঠে মাথায় হাত বুলিয়ে চলে, আবেগভরা কণ্ঠে ডাকে।
নূরী বলে–হুর, তুমি আমাকে হত্যা করতে চেয়েছিলে, তাই করো, তবু তোমার কাছ থেকে আমাকে বিচ্ছিন্ন করো না।
নূরী আর বনহুর একটা গাছের তলায় এসে বসে। বনহুরের হাতের মুঠায় নূরীর হাতখানা। বনহুর নূরীর কপাল থেকে বাম হস্তে চুলগুলো সরিয়ে দিয়ে বললো-নূরী, তুমি জানো আমি কোনদিন তোমাকে সুখী করতে পারবো না তবু কোনো তুমি আমার কথা ভেবে নিজের জীবনটা বিনষ্ট করে দিলে!
নারীর স্বামীই যে সব–এ কথা তুমি জানো না? তোমার প্রতি আমার ধ্যান-জ্ঞান স্বপ্ন সাধনা।
নূরী!
তুমি বিশ্বাস করো, আজও আমাকে কোন পুরুষ স্পর্শ করতে পারেনি। তুমিই যে আমার সব। হুর, কলেমা পাঠ করে বা লৌকিকতার আড়ম্বর করে বিয়ে না হলেও তুমিই আমার স্বামী।
নূরী, তুমি তো জানেনা–বিয়ে আমি করেছি। তবুও তুমি…
শত বিয়ে করলেও তুমি আমাকে অস্বীকার করতে পারবে না, আমি তোমার কেউ নই।
নূরী, তুমি জেনেশুনেও এ ভুল করবে?
ভুল আমি করিনি, করবো না আমি জানি তুমিই আমার স্বামী। আকাশ সাক্ষী আছে– বাতাস সাক্ষী আছে। বনের পাখিরা জানে তোমার-আমার সম্বন্ধ। হুর, তুমি যতই আমাকে দূরে সরিয়ে দাও কিন্তু পারবে না আমাকে অস্বীকার করতে।
নূরী…
না না, আমি শুনবো না কোন কথা। তুমি মনিরাকে বিয়ে করছে; তাতে আমার দুঃখ নেই। সেও আমার মতই একজন নারী। তাকে আমি বঞ্চিত করতে চাই না–তুমি যেমন আমার, তেমনি মনিরার। হুর, তুমি আমাকে দূরে সরিয়ে দিও না। আর যদি তোমাকে সত্যি আমার হারাতে হয় তবে বলল এই মুহূর্তে আমি সংসার থেকে বিদায় নেই…
নূরী দ্রুত হস্তে বনহুরের কোমরের বেল্ড থেকে ছোরাখানা খুলে নিয়ে নিজের বুকে বসিয়ে দিতে গেলো–বলো, তোমার জন্য আমি সব পারবো।
বনহুর খপ করে নূরীর হাত ধরে ফেললো–নূরী ক্ষান্ত হও।
না, তুমি আমাকে কথা দাও।
নূরীর শুকনো মলিন মুখের দিকে তাকিয়ে বনহুরের হৃদয় কেঁপে উঠলো! রুক্ষ চুল ললাটের এক পাশে শুকনো রক্ত জমে আছে। পিঠের চামড়া কেটে রক্ত রাঙ্গা হয়ে উঠেছে ছিন্ন বসন। বনহুর এবার নিজকে সংযত রাখতে পারলো না, তার মুখোভাব গম্ভীর হয়ে উঠলো।
