রহমান, আমি সেই জানোয়ারদের টুটি ছিঁড়ে রক্ত শুষে নেবো।
সর্দার আপনার মর্জি। আমি জানতাম, এ শহরটা বৈচিত্রময় কিন্তু পর পরই জানতে পেরেছি শুধু শহরটাই বৈচিত্রময় নয়, এখানের মানুষগুলো আরও অদ্ভুত। এখানে গরিবদের জীবনের কোন দাম নেই পথের কুকুরের মতই নিকৃষ্ট ওরা। সারাদিন পরিশ্রম করেও কেউ তদের উচিৎ মূল্য। পায়না। পায় তারা তিরস্কার আর লাঞ্ছনা-মুজুরির পরিবর্তে পায় বেত্রাঘাত। আমি আজ কয়েক মাস এ শহরে আছি মর্মে মর্মে উপভোগ করেছি এ দেশের মানুষের হৃদয়হীন অত্যাচার।
বনহুর সিগারেট থেকে একমুখ ধুয়া নির্গত করে বললো—হু।
এবার রহমান বললো–সর্দার, কিছু মুখে দিন।
হাঁ, চলো এই বেলা কিছু খেয়ে নেওয়া যাক। যাও রহমান, মনিকে ডেকে নিয়ে এসো, একসঙ্গে খাবো।
রহমান বেরিয়ে গেলো, অল্পক্ষণ পরে মনি সহ ফিরে এলো।
বনহুর মনিকে টেনে নিলো কোলের মধ্যে, আদর করে বললো-বাপি চলো, খাবার খাবে চলো।
মনি খুশি হয়ে বললো–চলো বাপি।
খাবার টেবিলে বসে খেতে বললো মনি–বাপি, মাম্মী তো আজও এলোনা। কোথায় গেছে আমার মাম্মী বলো না বাপি?
বনহুর সবেমাত্র খাবার মুখে তুলতে যাচ্ছিলো মনির কথায় হাত-খানা মাঝপথে থেমে যায়, একটা ব্যথা-বেদনাভরা ভাব ফুটে উঠে বনহুরের মুখে।
রহমান বলে উঠে ছিঃ মনি, খাবার খেতে বসে কথা বলতে নেই। খাও।
আগে বলো কাক্কু মাম্মী কোথায়? মাম্মীর জন্য মনটা বড় কেমন করছে।
বনহুর মনিকে টেনে নিলো বুকের মধ্যে, মাথায় পিঠে হাত বুলিয়ে বললো তোমার মাম্মীকে আনতে যাচ্ছি মনি।
সত্যি? খুশিতে উচ্ছল হয়ে উঠে মনি।
বনহুর মনির মুখে খাবার তুলে দেয়–তাহলে তুমি খেয়ে নাও কেমন।
মনি খেতে শুরু করলো।
রহমান বললো সর্দার আপনি একটু মুখে দিন।
বনহুর নিজেও খেতে আরম্ভ করলো।
মজবুত দড়ির বাঁধন নূরীর হাত-পায়ে কেটে বসে গেছে। শঙ্কর মাছের চাবুকের আঘাতে পিঠের চামড়া কেটে ঘা হয়ে গেছে। চুলগুলো জটার মত শক্ত হয়ে উঠেছে। তবু নূরীকে ভোলানাথ বাগে আনতে পারেনি। নূরী কঠিন পাথরের মূর্তির মতই ধীর-স্থির নিশ্চুপ। জীবন দেবে সে তবু ইজ্জৎ হারাবে না।
নূরীকে প্রতিদিন ভোলানাথ স্বয়ং তার প্রিয় সহচরগণ সহ নির্মমভাবে কঠিন শাস্তি দিয়ে থাকে। শঙ্কর মাছের চাবুকের আঘাতে জর্জরিত করে থাকে।
তারপর অর্ধমৃত অবস্থায় বন্দী করে রাখে অন্ধকার কারাকক্ষে। সারাদিন পর সামান্য পানি। আর শুকনো রুটী খেতে দেয় নূরীকে।
দিন দিন নূরীর দেহ ক্ষীণ হয়ে গেছে। শঙ্কর মাছের লেজের চাবুকের আঘাতে শরীর ক্ষত বিক্ষত হয়েছে। তবুও নূরী ভোলানাথের কথায় সম্মতি দেয়না।
পরদিন আবার নূরীকে ভোলানাথের অনুচরগণ তার গুপ্ত কক্ষে নিয়ে এলো। আবার চললো তার উপর নির্মম আঘাতের পর আঘাত।
ভোলানাথ আজ হিংস্র মূর্তি ধারণ করেছে, চোখ দুটো তার আগুনের গোলার-মত জ্বলছে। নিশ্বাস দ্রুত বইছে। দাঁতগুলি যেন জানোয়ারের মত বেরিয়ে এসেছে ঠোঁটের উপর। কঠিন কণ্ঠে বললো–বল, আমার কথায় রাজি হয়েছিস কিনা?
না না… নূরী তীব্র কণ্ঠে বললো।
সঙ্গে সঙ্গে ভোলানাথের হাতের চাবুক সপাং করে পড়লে নূরীর পিঠে। নূরী যন্ত্রণায় মুখ বিকৃত করে ফেললো, তার গলা দিয়ে একটা শব্দ বেরিয়ে এলো–উঃ। তারপর বললো সে আমাকে মেরে ফেলো তবু আমি রাজি নই।
কি বললি! দেওজীর মুখের উপর একথা বলতে পারলি শয়তানী কথাটা উচ্চারণ করলো ভোলানাথের সবুজ পোশাক পরিহিত অনুচরগণের একজন।
আর একজন বললো–দেওজী, হুকুম করুন খতম করে দি?
ভোলানাথ রক্তচক্ষু গোলাকার করে বললো–আমি ওকে এই শঙ্কর মাছের চাবুক দিয়ে খতম করবো কথাটা বলে চাবুক দিয়ে পুনরায় আঘাত করতে গেলে সে নূরীকে।
চাবুক দিয়ে নূরীর শরীরে আঘাত করবার পূর্বেই কে যেন তার হস্তস্থিত চাবুকটা এটে ধরে ফেললো। ফিরে তাকাবার আগেই চাবুক ভোলানাথ দেওজীর হস্তচ্যুত হলো। আশ্চর্য হয়ে দেখলো ভোলানাথ–তার পিছনে দাঁড়িয়ে একটি জমকালো পোশাক পরিহিত লোক।
সঙ্গে সঙ্গে ভোলানাথের সবুজ পোশাক পরিহিত অনুচরগণ রিভলভার উদ্যত করলো। কিন্তু গুলী ছুড়বার অবসর তারা পেলো না। জমকালো-পোশাক পরিহিত ব্যক্তির চাবুকের আঘাতে তাদের হাতের রিভলভার ছিটকে পড়লো দূরে।
ভোলানাথ ভীম গর্জনে গর্জে উঠলো–তুমি কে?
আমি দস্যু বনহুর! কথা শেষ করার সঙ্গেসঙ্গেই তার হাতের চাবুকখানা ভোলানাথের শরীরে এসে পড়লো।
ভোলানাথ আর্তচিৎকার করে উঠলো– গ্রেপ্তার করো।
বনহুরের চাবুক তখন পর পর সবুজ পোশাকওয়ালা লোকগুলির দেহে সপাং করে পড়ছে।
কেউ যে মেঝে থেকে রিভলভার কুড়িয়ে হাতে তুলে নেবে, তার অবসর পাচ্ছেনা।
বনহুরের হাতে শংকর মাছের চাবুক যেন বিদ্যুতের মত চমকাচ্ছে।
এবার সবুজ পোশাক পরিহিত লোকগুলি পালাবার জন্য দরজার দিকে দৌড় দিলো কিন্তু পথের মুখে গুলী ভরা রিভলভার হাতে দাঁড়িয়ে রহমান। তার শরীরেও কালো পোশাক।
বনহুর এবং রহমানের শরীর কালো পোশাকে আচ্ছাদিত থাকলেও কারো মুখে আবরণ ছিলো না।
এতো যন্ত্রণার মধ্যেও নূরীর মুখ খুশিতে উজ্জ্বল হয়ে উঠলো, চোখ দুটোতে আনন্দ যেন ঝরে পড়তে লাগলো। সে বারবার তাকাচ্ছে বনহুরের দিকে, ভাবছে সে তো স্বপ্ন দেখছে না।
বনহুরের তখন কোন দিকে খেয়াল নেই চাবুকের আঘাতে ভোলানাথ ডাকুকে কাবু করা এবং তার শয়তান পঞ্চ অনুচরদের ধরাশায়ী করাই তার কাজ।
