চমকে উঠলো ভোলানাথ!
নর্তকীটিকে মুক্ত করে দিয়ে ছোরাখানা তুলে নিলো হাতে; সঙ্গে সঙ্গে ভোলানাথের সহকারীগণ তাদের বাহু-বন্ধনে আবদ্ধা নর্তকীগণকে মুক্ত করে দিল।
ভোলানাথের চোখ দুটো আগুনের ভাটার মত জলে উঠেছে। হাতের ইংগিতে নর্তকীগণকে বেরিয়ে যেতে বললো সে।
নর্তকীগণ বেরিয়ে গেলো কক্ষ থেকে।
ভোলানাথ ছোরাখানা হাতে নিয়ে কর্কশ কন্ঠে বললো- যেখানে মাছি প্রবেশ করতে সক্ষম হয়না সেখানে এ ছোরা প্রবেশ করলো কিভাবে?
অন্যান্য সকলে বলে উঠলো–তাই তো, এ ছোরা এলো কোথা থেকে?
সবাই ছোরাখানা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে নেড়ে চেড়ে দেখতে লাগলো।
ভোলানাথ একটা ঘন্টাধ্বনি করলো, সঙ্গে সঙ্গে অগণিত ডাকু সারিবদ্ধভাবে প্রবেশ করলো সেই কক্ষে।
ভোলানাথ ছোরাখানা উঁচু করে ধরে বললো–আমার গুপ্ত আস্তানায় এই ছোরাখানা কিভাবে এলো শীগগীর তার সন্ধান নাও। যাও…
যেমন সারিবদ্ধভাবে ডাকুর দল কক্ষে প্রবেশ করেছিলো তেমনিভাবে বেরিয়ে গেলো তারা।
ভোলানাথ ছোরাখানার দিকে তাকিয়ে বললো–দেখেছো শ্যাম, ছোরাখানা সাধারণ নয়।
শ্যাম নামীয় লোকটা বললো–হ দেওজী, ও ছোরা কোন সাধারণ লোকের নয়।
আর একজন বলে–ছোরার বাট খাঁটি সোনার তৈরি বলে মনে হচ্ছে।
অন্য জন বললো মনে হচ্ছে নয়, খাঁটি সোনার তৈরি এটা।
ভোলানাথ ছোরাখানা সজোরে টেবিলে নিক্ষেপ করে বললো– বাজে কথা রেখে এখন ছোরা নিক্ষেপকারীকে আবিষ্কার করো। এক মুহূর্ত বিলম্ব হওয়া আর উচিৎ নয়।
ভোলানাথের সহকারীগণ উদ্যত রিভলভার হস্তে দ্রুত কক্ষে ত্যাগ করলো।
ভোলানাথ পায়চারী করতে লাগলো।
*
রহমান মনিকে কোলে করে বনহুরের পাশে এসে দাঁড়ালো।
মনি বনহুরকে দেখবামাত্র আনন্দ-ধ্বনি করে উঠলো–বাপি!
বনহুর মনিকে কোলে নিয়ে ছোট্ট একটা চুমু এঁকে দিলো ওর গালে, তারপর বললো বাপি তুমি কেমন আছো?
আমি খুব ভালো আছি, কিন্তু মাম্মীর জন্য আমার খুব কষ্ট লাগছে। বাপি, মাম্মী কোথায়– বলো না।
মাম্মী আছে।
কোথায়?
বেড়াতে গেছে মনি, আবার আসবে।
বেড়াতে গেছে তবে আসছে না কেন?
আসবে, আসবে মনি… বনহুরের কন্ঠে ধরে আসে।
রহমান বনহুরের কোল থেকে মনিকে নিয়ে বলে যাও বাবা, বাইরে যাও তোমার বাপি বিশ্রাম করবে।
মনি বনহুরের কোল থেকে এসে মুখ ভার করে ফেললো–মাম্মী চলে গেছে, আবার বাপিও চলে যাবে। আমি যাবো না।
বনহুর মনির চিবুক ধরে নাড়া দিয়ে বলে–না না, আর তোমাকে ছেড়ে কোথাও যাবো না মনি।
সত্যি বলছো বাপি?
হাঁ! বনহুর কথাটা বলে আনমনা হয়ে গেলো এতোটুকু ছোট্ট শিশুকে এতো বড় মিথ্যা বলাটা তার মুখে এলো কি করে! সত্যি কি সে চিরদিনের জন্য মনির পাশে থাকতে পারবে? না, কিছুতেই এ সম্ভব নয়। সে দস্যু-ডাকু, আর মনি একটা নিষ্পাপ ফুলের মত শিশু; তার সান্নিধ্য মনিকে কোনদিন মানুষ করে গড়ে তুলবেনা। মনি মানুষ হবে–এই তার কামনা… না না, আর মনিকে মায়ার জালে জড়াবে না সে। মনির সান্নিধ্য ছেড়ে দূরে সরে থাকবে। যদি ওকে কোনদিন দেখবার ইচ্ছা হয়, দূর থেকে দেখে যাবে তবু আর মনির সম্মুখে আসবে না।
মনি বনহুরের দক্ষিণ হাত চেপে ধরে বলে–বাপি, আমি খেলতে গেলে আবার পালিয়ে যাবে না-তো?
বনহুর কোন কথা বললো না বা বলতে পারলো না।
রহমান বললো–মনি, তুমি খেলতে যাও, আমি বলছি তোমার বাপি তোমাকে ছেড়ে আর পালাবে না।
মনি একবার রহমান আর একবার বনহুরের মুখে তাকিয়ে ছুটে বেরিয়ে গেলো।
বনহুর বললো এবার–রহমান, অতোটুকু শিশুর কাছে এতো বড় মিথ্যা বলাটা কি ঠিক হলো?
সর্দার, তাছাড়া যে আর কোন উপায় ছিলো না। সত্যি বলতে কি সর্দার, আপনার সন্তান আপনার চেয়ে বুদ্ধি-জ্ঞানে কিছু কম নয়। অতোটুকু শিশু হলেও সে মস্তবড় জ্ঞানী,
রহমান, আমি চাই না সে আমার মত দুষ্কৃতি জন হয়। আমি চাই মনি মানুষের মত মানুষ হবে। রহমান–তুমি ওকে মানুষ করে গড়ে তুলবে, সেটাই আমার ইচ্ছা।
সর্দার আপনার ইচ্ছা যেন পূর্ণ করতে পারি।
কিছুক্ষণ বনহুর আর রহমান উভয়েই নীরব রইলো। বনহুর আসনে উপবেশন করে একটা সিগারেটে অগ্নি সংযোগ করলো।
রহমান বললো এবার–সর্দার, আপনি কি নূরীর সন্ধান পেয়েছেন?
শুধু নূরীর সন্ধান নয়, শয়তান ভোলানাথ ডাকুর গুপ্ত আস্তানার সন্ধানও আমি পেয়েছি।
সর্দার।
হাঁ রহমান, তাছাড়াও আমি ভোলানাথকে আমার উপস্থিতি জানিয়ে দিয়ে এসেছি।
সর্দার, এটা কি ভালো হয়েছে? ওরা সতর্ক হয়ে নেবে এবং নিজেদের সব সময় প্রস্তুত রাখবে।
রহমান অজ্ঞাতসারে কাউকে আক্রমণ করা আমার স্বভাব নয়। আমি চাই তাদের সজাগ রেখে কাজ করতে।
নূরী কেমন আছে সর্দার?
বড় মর্মস্পর্শী অবস্থায় আছে।
আপনি তাকে দেখেছেন সর্দার?
হাঁ, তার অতি নিকটেই ছিলাম।
সর্দার।
তবু তাকে উদ্ধার করিনি কেনো এই তো?
জানি অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা করাই সমীচীন। সর্দার, আমি এতোদিন চেষ্টা করেও কিছুমাত্র অগ্রসর হতে পারিনি আর আপনি মাত্র এই কয়েক দিনের মধ্যেই শয়তানদের গুপ্ত আস্তানায় প্রবেশে সক্ষম হয়েছেন!
কিন্তু তোমার সাহায্যেই আমাকে এতোদূর অগ্রসর হতে সক্ষম করেছে। রহমান, আরাকানে পৌঁছে আর একটা জিনিস আমি লক্ষ করেছি যা আমার হৃদয়ে অত্যন্ত আঘাত করেছে।
আমি বুঝতে পেরেছি সর্দার। আরাকানের এ অবস্থার জন্য দায়ী এক জাতের মানুষ, যারা, জানোয়ারের চেয়েও ভয়ঙ্কর।
