কিছু হয়নি। কথাটা বলে স্বামীর হাতখানা সজোরে সরিয়ে দিলো মনিরা।
কিছু হয়নি তবে চোখে অশ্রু কেনো? আর হঠাৎ তোমার মুখভাব এতো গম্ভীর কেনো?
জানি না।
মনিরা বলো?
না না আমাকে তুমি ছেড়ে দাও, যাও তোমার নূরীকে উদ্ধার করে আনোগে।
মনিরা তুমি…
হাঁ, আমি সব শুনেছি। তোমার আর রহমানের সব কথা শুনেছি! ছিঃ তুমি না বলেছে– নূরী তোমার কেউ নয়।
আজও বলছি–তার সঙ্গে আমার কোন সম্বন্ধ নেই… তাহলে মনি কে?
মনি!
হাঁ, যাকে রহমান স্কুলে ভর্তি করে দিয়েছে, যার সংবাদ জানার জন্য তুমি ব্যাকুল হয়েছিলে–বলো কে মনি?
মনি! মনি… মনির কথা বলছো? মনি…
কেনো, বলতে বাঁধছে বুঝি?
না, বাঁধছে নয় মনি নূরীর সন্তান।
কি বললে, নূরীর সন্তান মনি
হা,
কিন্তু সে নাকি আজও অবিবাহিতা, তবে কি করে তার সন্তান হলো?
বনহুর হঠাৎ কোন জবাব দিতে পারলোনা, মাথা নত করে কি যেন ভাবতে লাগলো।
মনিরা দুই হাতে চেপে ধরলো বনহুরের বুকের কাছে জামার খানিকটা অংশ–বলতে হবে মনির সঙ্গে তোমার কিসের সম্পর্ক?
মনিরা।
বুঝতে পেরেছি তুমি কত বড় জঘন্য… মনিরা বনহুরের জামার আস্তিন ছেড়ে দিয়ে দু’হাতে মুখ ঢেকে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠে।
বনহুরের সময় অল্প এদিকে মনিরার মনে সন্দেহের দোলা ওদিকে রহমান দারুণ উৎকণ্ঠা নিয়ে তার জন্য অপেক্ষা করছে। বেশিক্ষণ বিলম্ব করতে পারছেনা আর বনহুর। মনিরার ভুল ভাঙ্গানো চট করে সম্ভব নয়। বনহুর তবু বোঝাতে চেষ্টা করলো, মনিরার হাত খানা চেপে ধরলো–মনিরা আমাকে তুমি অবিশ্বাস করোনা। একদিন সব তোমাকে বলবো। আজকে তুমি আমায় খুশি মনে বিদায় দাও।
মনিরা নিশ্চুপ–পাথরের মূর্তির মত শুদ্ধ হয়ে গেছে সে।
বনহুর মনিরার চিবুক ধরে উঁচু করে নিজের হাতে তার চোখের পানি মুছিয়ে দিয়ে বললো– তুমি বিদায় না দিলে আমার অশুভ যাত্রা হবে মনিরা! তুমি কি তোমার স্বামীর অমঙ্গল চাও?
মনিরা একবার বনহুরের মুখে তাকিয়ে আবার দৃষ্টি নত করে নিলো।
বনহুর বললো–মনি শুধু নূরীরই সন্তান নয়, তোমারও সন্তান সে।
চাইনা আমি পরের সন্তানকে নিজের করে নিতে। বলো মনি তোমার সন্তান কিনা?
হাঁ, মনি আমার সন্তান।
উঃ! এও শুনতে হলো। না না, আমি চাইনা তোমাকে, তুমি চলে যাও, আমি আর তোমাকে চাইনা। যাও, যাও তুমি তোমার অপেক্ষায় তোমার নূরী আর মনি প্রহর গুণছে… কথা শেষ। করে দ্রুত চলে যায় মনিরা অন্তপুরে।
বনহুর কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে, তারপর সে ফিরে যায় রহমানের পাশে।
রহমান দুলকী আর তাজকে নিয়ে অপেক্ষা করছিলো।
বনহুর তাজের পিঠে উঠে বসতেই উলকা বেগে ছুটতে শুরু করলো।
রহমান অনুসরণ করলো সর্দারকে।
বনহুর আরাকান রওয়ানা দেবার পূর্বে একবার আস্তানায় যাওয়াই সমীচীন মনে করলো। কারণ আরাকানে শত্রুর সঙ্গে মোকাবেলা করতে হলে তাকে সেইভাবে প্রস্তুত হয়ে যেতে হবে।
*
হাত-পা মজবুত দড়ি দিয়ে বাঁধা, চুলগুলো এলোমেলো, পরিধেয় বসন ছিন্ন-ভিন্ন ললাটের এক পাশে কেটে রক্ত জমাট বেঁধে আছে। ভূতলে অর্ধশায়িত অবস্থায় পড়ে আছে নূরী।
সম্মুখে শঙ্কর মাছের চাবুক হস্তে দণ্ডায়মান ডাকু ভোলানাথ। দুই পাশে তার পাঁচজন বিশ্বস্ত অনুচর বা সহকারী; সকলেরই দেহে গাঢ় সবুজ রং-এর পোশাক। এই পাঁচ ব্যক্তি ভোলানাথের দক্ষিণ হস্ত- যেমন এদের চেহারা তেমনি নিষ্ঠুর কঠিন ওরা।
ভোলানাথ কটমট করে তাকাচ্ছে নূরীর ভুলুণ্ঠিত দেহটার দিকে, চোখ দিয়ে যেন আগুন ঠিকরে বের হচ্ছে।
সবুজ পোশাক পরিহিত ব্যক্তিদের একজন রিভলভার উদ্যত করে বললো– দেওজী, হুকুম করুন, এক গুলীতে শেষ করে দি?
আর একজন বললো-বাগে যখন আসছেনা তখন আর রেখে কি হবে?
অন্য একজন বললো– দেওজী, ওকে চাবুক মেরে শেষ করে ফেলুন।
ভোলানাথ মেঘের মত গর্জন করে উঠলো–এতো সহজে শেষ করবার বান্দা ভোলানাথ নয়। ভাল কথায় রাজি হয়নি, এবার শক্ত কথায় বাগে আনতে হবে। তারপর তাতেও না হয়, শঙ্কর মাছের চাবুকের আঘাত চামড়া ছিঁড়ে লবণ মাখিয়ে তবু রাজি করাবো। যেমন করে হোক ওকে আমার চাই… সঙ্গে সঙ্গে সপাং করে চাবুকটা এসে পড়ে নূরীর পিঠে।
নূরী আর্তনাদ করে উঠলো–উঃ উঃ আঃ আঃ…
শঙ্কর মাছের চাবুকের আঘাতে নূরীর পিঠের চামড়া কেটে রক্ত গড়িয়ে পড়ে, জামার খানিকটা অংশ চাবুকের সঙ্গে ছিঁড়ে চলে আসে। নূরী লুটিয়ে পড়ে মেঝেতে।
আবার আঘাত করে ভোলানাথ।
নূরী আর্তনাদ করে উঠে–উঃ আঃ আঃ উঃ…
ভোলানাথ এবার ইংগিত করে তার সহকারী সবুজ পোশাক পরিহিত লোকগুলিকে।
লোকগুলি নূরীকে টানতে টানতে বের করে নিয়ে যায়।
ভোলানাথ আসন গ্রহণ করে।
অল্পক্ষণ পর ফিরে আসে সবুজ পোশাক পরিহিত লোক পাঁচজন। ভোলানাথের আসনের দুই। পাশে বসে পড়লো ওরা।
সঙ্গে সঙ্গে একদল নর্তকী এসে নাচতে শুরু করলো। সবাই প্রায় সমবয়সী যুবতি। তাদের শরীরে পোশাক বলতে সামান্য। অর্ধ উলঙ্গ যুবতীগুলি নানা ভঙ্গীমায় নাচতে শুরু করলো।
একজন যুবতী একটা থালার সারাব পাত্র নিয়ে হাজির হলো ভোলানাথের সম্মুখে।
নাচের তালে তালে সারাব পান করে কুৎসিত হাসি হাসতে লাগলো ভোলানাথ ও তার সহকারীগণ।
নাচ শেষ হলো।
ভোলানাথ একটা নর্তকীকে ধরে ফেললো খপ করে। ভোলানাথের সহকারীগণ একজন নর্তকীকে বাহু-বন্ধনে আবদ্ধ করে ফেললো।
ঠিক সেই মুহূর্তে একখানা ছোরা এসে গেঁথে গেলো ভোলানাথের সম্মুখস্থ আসনের গায়ে।
