চমকে উঠে বনহুর, মনিরাকে মুক্ত করে দিয়ে সোজা হয়ে বসে, মুখোভাব গম্ভীর হয়ে উঠেছে তার।
মনিরা বলে–কিসের শব্দ ওটা?
বনহুর চিন্তিত কণ্ঠে বললো–রহমানের ইংগিতপূর্ণ শিষ দেবার শব্দ ওটা। তবে কি রহমান ফিরে এসেছে? শেষের কথাটা মনেই বলে উঠলো বনহুর।
আবার ঐ রকম শব্দ শোনা গেলো, ঠিক্ বাগনের পিছন থেকে শব্দটা আসছে বলে মনে হলো তাদের।
বনহুর আর বিলম্ব না করে মনিরাকে বললো তুমি একটু অপেক্ষা করো মনিরা, আমি আসছি।
বনহুর চলে গেলো।
মনিরার বুকের মধ্যে ঝড় বইতে শুরু করেছে, একটা আশঙ্কা তার মনকে আচ্ছন্ন করে ফেললো। বনহুর চলে গেলেই মনিরা আড়ালে এসে দাঁড়ালো, জোছনার আলোতে স্পষ্ট দেখলো–বনহুরের প্রধান অনুচর রহমানই বটে–মাথায় পাগড়ি, শরীরে খাকী পোশাক ঠিক দারওয়ানের ড্রেস পরে আজ সে এসেছে।
বনহুরের দেহে রহমান কুর্ণিশ করে দাঁড়ালো, কোন কথা প্রথমে বলতে পারলো না সে।
বনহুর গম্ভীর-কঠিন কণ্ঠে বললো– এবার কোথায় ডুব মেরেছিলে?
সর্দার!
জানো তোমার অপরাধ কত গুরুতর?
জানি সর্দার।
জেনেও তুমি আমার সম্মুখে আসতে পারলে? তোমার সাহস মন্দ নয় দেখছি।
সর্দার, না এসে উপায় নেই। বড় বিপদে পড়ে আপনার নিকট এসেছি। সর্দার আমি পারলামনা,
রহমানের কন্ঠ বাস্প রুদ্ধ হয়ে এলো।
বনহুর গর্জে উঠলো– নেকামি ছেড়ে আসল কথা বলো।
সর্দার নূরীকে দুবৃত্তগণ হরণ করে নিয়ে গেছে।
সঙ্গে সঙ্গে বনহুরের মুখমণ্ডল কালো হয়ে উঠলো, কঠিন কণ্ঠে বললো–আর তুমি কি করলে?
অমাবস্যায় নারীকে ওরা চুরি করে নিয়ে গেছে আমি দু সপ্তাহ কাল ধরে তাকে উদ্ধারের চেষ্টা করেছি। সর্দার, ভেবেছিলাম আমি নূরীকে শয়তান দুরাচারগণের হাত থেকে উদ্ধার করবো কিন্তু সক্ষম হলাম না।
তাই এসেছো আমার কাছে সাহায্য প্রার্থনা করতে?
হা সর্দার।
রহমান, তুমি আমার বিশ্বস্ত অনুচর না হলে এতোক্ষণ তোমার প্রাণবায়ু হাওয়ায় মিশে যেতো। একটু থেমে আবার বললো–যাকে নিয়ে আত্মগোপন করতে পারলে, তাকে হেফাযতে রাখবার মত সামর্থ হলো না? যাও আমি তোমাকে সাহায্য করতে অক্ষম।
সর্দার! রহমান দুহাত জুড়ে বিনীতভাবে বললো।
আড়ালে দাঁড়িয়ে মনিরা ক্রুদ্ধ নাগিনীর মত ফোঁস ফোঁস করতে লাগলো, কারণ নূরীকে ভালভাবেই জানে মনিরা। নূরী যে দস্যু বনহুরের বাল্য সহচরী এবং নূরী যে বনহুরকে ভালবাসে, সে কথা মনিরার অজ্ঞাত নয়। রহমান যে মুহূর্তে নূরীর হরণ কথাটা উচ্চারণ করেছিলো তখন মনিরার মনে কে যেন হাতুড়ির আঘাত করলো এর চেয়ে যদি রহমান বনহুরের গ্রেপ্তার সংবাদ বহন করে আনতো তবু এতোখানি চিন্তি হতোনা। মনিরা সব সহ্য করতে পারে কিন্তু নূরীর নাম সে সহ্য করতে পারেনা। তারপর কোন দুৰ্বত্তের সঙ্গে তার স্বামীকে মোকাবেলা করতে হবে, কোথায় কেমনভাবে দিন কাটবে তার, কত বিপদের সম্মুখীন হতে হবে তাই বা কে জানে… মনিরা স্বামীর অমঙ্গল চিন্তায় উদ্বিগ্ন হয়ে উঠলো।
রুদ্ধনিশ্বাসে বনহুর আর রহমানের কথাবার্তা শুনতে লাগলো মনিরা। বুকের মধ্যে তার তোলপাড় শুরু হয়েছে। একটা অসহ্য যন্ত্রণা তাকে দুঞ্জিভূত করে চললো। একটু পূর্বেই মনিরা স্বামীর বাহুবন্ধনে আবদ্ধ হয়ে বেহেস্তের সুখ অনুভব করছিলো। জোছনা ভরা রাতটা তার কাছে স্বপ্নময় মনে হচ্ছিলো আর এখন সব যেন অসহ্য লাগছে। রহমানের কথাগুলো তার কানে যেন গরম সীসা ঢেলে দিচ্ছিলো। কেন, রহমান পারেনা নূরীকে উদ্ধার করতে? তার স্বামীকে কেন সে এ সংবাদ জানাতে এসেছে? মনিরা যখন এসব ভাবছে তখন পুনরায় তার কানে ভেসে এলো। রহমানের করুণ ব্যথাভরা কণ্ঠস্বর, রহমান বলছে– সর্দার, নূরীকে মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করবার জন্যই আমি আপনার বিনা অনুমতিতে তাকে নিয়ে পালিয়েছিলাম, কিন্তু শেষ অবধি তাকে বাঁচাতে পারলামনা… বাষ্পরুদ্ধ হয়ে এলো রহমানের কন্ঠ। একটু থেমে আবার বললো সে– সর্দার নূরী এখন যে অবস্থায় আছে তাতে মৃত্যু তার সুনিশ্চিত। সর্দার দয়া করুন … রহমান। বনহুরের পায়ের কাছে নতজানু হয়ে বসে পড়লো।
বনহুর দাতে অধর দংশন করে বললো –যা সালামতে পারবেনা কোন্ ভরসায় তাকে। আত্মসাৎ করতে চেয়েছিলে?
সর্দার, বিশ্বাস করুন আমি নূরীকে আত্মসাৎ করতে চাইনি কোনদিন। তাকে ভালবাসতাম কিন্তু সে আমাকে কোনদিন ভালবাসতে পারেনি, আমি জোর করে তার ভালবাসা গ্রহণ করতে চাইনা সর্দার, আমি তাকে বোনের আসনে প্রতিষ্ঠা করেছি।
রহমান!
হ সর্দার।
মনি কেমন আছে?
মনি ভাল আছে। তাকে স্কুলে ভর্তি করে দিয়েছি।
বনহুর এবার কি যেন ভাবলো তারপর বললো–তুমি একটু অপেক্ষা করো, আমি মনিরার কাছে বিদায় নিয়ে আসি।
বনহুর কথাটা উচ্চারণ করতেই মনিরা ছুটে গিয়ে ঠিক পূর্বের সেই পাথরাসনে গিয়ে বসে পড়লো। মুখভাব প্রসন্ন রাখার চেষ্টা করেও সে পারলো না। চোখ দুটো কেমন বার বার ঝাপসা হয়ে আসতে লাগলো।
বনহুর মনিরার পাশে এসে দাঁড়ালো, তার মুখাভাবও সচ্ছ নয়। মনিরাকে নতমুখে বসে থাকতে দেখে বললো–মনিরা।
মনিরা কোন জবাব দিলো না।
বনহুর মনিরার চিবুক ধরে উঁচু করে তুললো–একি, তুমি কাঁদছো! আশ্চর্য হলো বনহুর।
মনিরা তবু নীরব।
বনহুর মনিরার পাশে ঘনিষ্ঠ হয়ে বসলো, ওর দক্ষিণ হাতখানা মুঠায় চেপে ধরে বললো মনিরা, কি হলো তোমার?
