কত রকম ফুল ফুটে আছে বাগানে। কত অজানা ফুলের সমারোহ।
বনহুর মনিরার মুদিত আঁখি দুটির দিকে তাকিয়ে বলে উঠে–অপূর্ব!
মনিরা শান্ত মধুর কন্ঠে বলে–চাঁদের আলো না ফুলের সুবাস?
বনহুর মনিরার চিবুকে মৃদু চাপ দিয়ে বলে–তোমার মুখ। সত্যিই মনিরা, তোমার মুখের দিকে তাকালে আমি ভুলে যাই আমার অস্তিত্ব।
তবুও আমি তোমাকে ধরে রাখতে পারিনা, সেই আমার দুঃখ।
মনিরা, তুমি অবুঝের মত কথা বললো, আমি তো সব সময় তোমার পাশেই আছি। যখনই তুমি আমাকে স্মরণ করো তখনই তো আমি ছুটে আসি তোমার কাছে।
তবুও আমার তৃপ্তি হয়না, আমার মনে চায় সব সময় তোমাকে ঘরে রাখি আমার অন্তরের অন্তস্থলে…
মনিরা।
হাঁ, আমি তোমাকে সব সময় কাছে পেলে আর কিছু চাইনা। সমস্ত দুনিয়ার পরিবর্তে আমি তোমাকে কামনা করি। জানোনা–নারীর স্বামীই যে সর্বস্ব।
মনিরা, আমারও কি ইচ্ছা হয়না সব সময় তোমাকে এমনি করে বেঁধে রাখি বাহুবন্ধনে? কিন্তু কি করবো বলো–আমি যে পারিনা আমার অসহায় ভাই-বোনদের ছেড়ে নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখতে।
তাহলে তুমি তাদের নিয়েই থাকো। অভিমান ভরে স্বামীর বাহুবন্ধন থেকে নিজকে মুক্ত করে নিয়ে সরে বসে মনিরা।
বনহুর ব্যথাকরুণ কণ্ঠে বলে উঠেছিঃ তুমি তো অবুঝ নও মনিরা। তোমার জ্ঞান-গরিমা অন্যান্য যে কোন নারীর চেয়ে অনেক–অনেক বেশি। মনিরা, তুমি শুধু নারী নও তুমি দস্যু বনহুরের সহধর্মিণী। তোমার হৃদয় হবে যেমন কোমল তেমনি পাষাণের চেয়েও শক্ত। ব্যথিতের বেদনায় তোমার অন্তর গলে যাবে কিন্তু জালিমের জুলুমের বিরুদ্ধে তুমি হবে রণরঙ্গিনী।
তুমি যা চাও তাই হবো, তাই হবো… মনিরা স্বামীর বুকে মুখ গোজে।
সত্যি মনিরা?
হাঁ তুমি যা চাও আমি তাই করবো।
মনিরা।
বলো?
আজকের এই মধূময় সন্ধ্যায় তোমার বীণার সুর শুনবার জন্য মনটা আমার আকুল বিকুল করছে। শোনাবে মনিরা?
তোমার ইচ্ছা পূর্ণ করাই যে আমার জীবনের ব্রত।
মনিরা।
তুমি একটুখানি বসো, আমি বীণা নিয়ে আসি।
উঁহু, ছেড়ে দেবোনা তোমাকে।
তাহলে?
তাহলে গান শোনাও।
উঁহু।
গাও মনিরা।
মনিরা বনহুরের বাহুবন্ধন থেকে নিজকে মুক্ত করে নিয়ে ছুটে পালায়।
মনিরার হাসির শব্দ শোনা যায় ওদিকে গোলাপ ঝাড়ের পাশে।
বনহুর উঠে দাঁড়িয়ে তাকিয়ে থাকে মনিরার চলে যাওয়ার পথের দিকে।
মনিরা চলে গেলো।
বনহুর পায়চারী করছে ধীর মন্থর গতিতে।
ফুরফুরে হাওয়ার বনহুরের চুলগুলি উড়ছে। আজ তার শরীরে ধপধপে সাদা পাজামা আর পাঞ্জাবী। মনিরা বনহুরকে নিজের হাতে আজ সাজিয়ে পরিয়ে দিয়েছে। এখন বনহুরকে দেখলে কে বলবে সে দস্যু বা ডাকু। অপূর্ব অদ্ভুত সুন্দর একটি যুবক সে।
মনিরার প্রতিক্ষার অপেক্ষা না করে বনহুর তামাসা করার জন্য লুকিয়ে পড়লো পাশের হাস্নাহেনার ঝাড়ের আড়ালে। হাটু গেড়ে অপেক্ষা করতে লাগলো মনিরা।
অল্পক্ষণ পরে ফিরে এলো মনিরা, হাতে তার বীণা। স্বামীকে না দেখে চঞ্চল হয়ে উঠলো সে। উদ্বিগ্ন দৃষ্টি নিয়ে তাকাতে লাগলো এদিকে ওদিকে। কোথাও ওকে খুঁজে না পেয়ে বিষণ্ণ মনে বসে পড়লো পাথরাসনে। ভাবতে লাগলো–তবে কি সে চলে গেছে। এমনি আরও কতদিন এসেছে–আবার ধুমকেতুর মত চলে গেছে–যাবার সময় তাকে একটি কথাও বলে যায় নি। মনিরার হৃদয় গুমড়ে কেঁদে উঠে, আজও মনিরা স্বামীকে চিনতে পারে নি। সময় সময় ওর মনে। হয়, তার মত সুখী এ দুনিয়ায় আর বুঝি কেউ নয়, আবার কখনও অন্তরটা ওর গুঁমড়ে কেঁদে উঠে তার মত অসহায় নারী আর কোথাও নেই। যাকে সে চায়, জীবন দিয়ে যাকে সে কামনা করে, সে যে তার বাধ্য নয়…
মনিরা যখন স্বামীর চিন্তায় ব্যস্ত তখন বনহুর হাসনাহেনার ঝোপের আড়াল থেকে বেরিয়ে পা টিপে টিপে তার পিছনে এসে দাঁড়ালো, আলগোছে চেপে ধরলো মনিরার চোখ দুটো।
স্বামীর হাতের পরশ মনিরার শিরায় শিরায় আলোড়ন জাগায়! মুহূর্তে ওর অন্তর থেকে দূর। হয়ে যায় বিষণ্ণতার ছাপ। মুখমণ্ডল উজ্জল দীপ্ত হয়ে উঠে, স্বামীর হাতের উপর হাত রেখে বলে– দুষ্ট!
বনহুর মনিরার চোখ দুটো মুক্ত করে দিয়ে বসে পড়লো পাশে। শান্ত-সুমিষ্ট হাসির রেখা ফুটে উঠেছে তার ঠোঁটের ফাঁকে।
মনিরা গম্ভীর গলায় বললো–আমাকে ভাবিয়ে তুমি আনন্দ পাও, তাইনা?
মিছামিছি কেনো তুমি ভাবো বলো তো? আমি কি কচি শিশু, তাই হারিয়ে যাবো?
শিশু তুমি নও কিন্তু তোমাকে যে আমি প্রতি মুহূর্তে হারাই। কিছুতেই পারি না আমি তোমাকে ধরে রাখতে। ওগো, চিরদিন শুধু দূরে দূরেই থাকবে, কোন দিন কি তোমায় নিশ্চিন্ত মনে পাবো না?
আমি তো তোমারই মনিরা।
তবু তোমাকে যেন প্রাণভরে পাই না, সব সময় ভয় কখন আবার হারিয়ে যাবে…
ও তোমার মনের দুর্বলতা মনিরা। যাক, এবার শুরু করো তোমার বীণার ঝঙ্কারে মুখর হয়ে উঠুক এই জোছনা ভরা রাত।
মনিরা বীণাখানা কোলের উপর তুলে নিলো।
অপূর্ব ঝঙ্কার উঠলো মনিরার বীণাতে।
বনহুর নিষ্পলক নয়নে তাকিয়ে আছে ওর মুখের দিকে।
দখিনা বাতাস ফুলের সুরভী নিয়ে জানায় তাদের সাদর সম্ভাষণ।
বীণার ঝঙ্কারে মুখরিত হয়ে উঠে বাগানবাড়ির আকাশ বাতাস।
বীণার সুর এক সময় থেমে যায়।
বনহুর ওকে বাহুবন্ধনে আবদ্ধ করে ফেলে।
এক খণ্ড মেঘ তখন চাঁদকে আড়াল করে দাঁড়ায়।
ঠিক সেই মুহূর্তে একটা শিষ দেবার শব্দ শোনা যায়।
