লোকগুলো বোতলের পর বোতল নিঃশেষ করে চললো–হ্যাঁসছে, এ ওর গায়ে ঢলে পড়ছে, ফিস ফিস করে গানের কলি আওড়াচ্ছে।
হঠাৎ চমকে উঠলো রহমান–ভারী বুটের শব্দ শোনা গেলো সঙ্গে সঙ্গে কয়েকটা টর্চের আলোও যেন এগিয়ে আসছে এদিকে।
রহমান নিজকে আরও গোপনে লুকিয়ে ফেললো, দুলকীর জন্য চিন্তা কোনক্রমে যদি ওদের। নজরে পড়ে যায় তাহলে বিভ্রাট ঘটবে, তাতে কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু অল্পক্ষণ পর রহমান। কতকটা আস্বস্ত হলো, টর্চের আলো আর ভারী বুটের শব্দ ওপথে না গিয়ে সোজা মশালের আলো লক্ষ্য করে এগুতে লাগলো।
এবার রহমান বুঝতে পারলো–এখানে মশালটা জ্বালিয়ে রাখার একমাত্র উদ্দেশ্য মশালের আলোটা পথের নির্দেশ বলে দিচ্ছে।
টর্চের আলো আর ভারী বুটের শব্দ মশালের আরো লক্ষ করেই যে এগুচ্ছে তাতে কোন সন্দেহ নেই।
হঠাৎ একটা হুইসেলের শব্দ জেগে উঠলো সেখানে।
রহমান অবাক হয়ে দেখলো–এতোক্ষণ যে লোকগুলি বোতলের পর বোতল মদপান। করছিলো তারা সবাই কেমন যেন তটস্থ হয়ে উঠেছে। বোতলগুলি ফেলে দিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়ালো। এমনিতেই তাদের চেহারা বিদঘুঁটে আর ভয়ঙ্কর, তারপর মদের নেশায় চোখগুলো সব। জবাফুলের মত লালে লাল হয়ে উঠেছে। প্রত্যেকের কোমরের বেল্টে সূতীক্ষ্ণধার ছোরা ও রিভলভার ঝুলছে।
লোকগুলোর মুখোভাব দেখে রহমান বুঝতে পারলো–এমন কেউ আসছে, যার ভয়ে এরা বিভ্রান্ত হয়ে পড়েছে।
রহমানের অনুমান মিথ্যা নয়। অল্পক্ষণের মধ্যেই কয়েকজন অদ্ভুত পোশাক পরা লোক এসে দাঁড়ালো পূর্বের লোকগুলির সামনে।
রহমান তীক্ষ্ম দৃষ্টি নিক্ষেপ করে লক্ষ্য করলো–যে লোকগুলি এখন এলো তারা সংখ্যায় পাঁচজন। আরও আশ্চর্য হলো রহমান তাদের পোশাক দেখে, প্রত্যেকেরই দেহে একই রকম ড্রেস। গাঢ় সবুজ কোট-প্যান্ট-সার্ট এমন কি তাদের গলার টাইটা পর্যন্ত সবুজ। সকলের পায়েই। ভারী বুট। বাম হস্ত কোটের পকেটে, দক্ষিণ হস্তে টর্চ।
সবুজ পোশাক পরিহিত লোকগুলি এসে দাঁড়াতেই পূর্বের লোকগুলি সেলুট করে দাঁড়ালো। অবশ্য অদ্ভুত ভংগিতে সেলুট করলো ওরা। দক্ষিণ পা উঁচু করে আর দক্ষিণ বাজু মাথায় ঠেকিয়ে একটা শব্দ করলো।
পরমুহূর্তেই একটা শব্দ হলো রহমান বিস্ময়ভরা চোখে তাকিয়ে দেখলো–সবুজ পোশাক। পরা একজন লোক হঠাৎ কোটের পকেট থেকে বাম হস্তখানা টেনে বের করলো, হস্তে তার জমকালো রিভলভার, কোন রকমে দ্বিধা না করে পূর্বের লোকগুলির এক জনের বুক লক্ষ্য করে গুলি ছুড়লো।
লোকটি তীব্র আর্তনাদ করে লুটিয়ে পড়লো ভূতলে।
রহমান ভেবে পেলোনা কি অপরাধ হয়েছিলো লোকটার। কিছু বুঝতে না পেরে অবাক হয়ে দেখতে লাগলো, সে নিজেও দস্যু কিন্তু এমন তো সে কোন দিন দেখে নি। রহমানের পাষাণ হৃদয়টাও অজানা আশঙ্কায় দুলে উঠলো।
সবুজ পোশাক পরিহিত পাঁচ ব্যক্তির একজন কি যেন বললো। তারপর সবাই অগ্রসর হলো, পূর্বের লোকগুলিও অনুসরণ করলো ওদের পাঁচ জনকে। শেষ ব্যক্তি গাছের ডালে গোঁজা মশালটা তুলে নিলো হাতে।
পিছনে পড়ে রইলো রক্তমাখা মৃতদেহটা।
সবাই চলে গেলো, একবার ফিরেও তাকালো না কেউ মৃত দেহটার দিকে।
যে স্থানে এতোক্ষণ ওরা দাঁড়িয়ে কথাবার্তা বলছিলো সেই স্থান হতে কয়েক গজ দূরে কালো মত কিছু দেখা গেলো মশালের আলোর ছটায়। ঠিক বোঝা না গেলেও রহমান অনুমান করে নিলো– সেটা পাহাড় বা ঐ ধরণের বিরাট একটা পাথরের স্তূপ ছাড়া কিছু না।
রহমান ঝোপের মধ্য থেকে বেরিয়ে কিছুটা সরে এলো। বনভূমি রাতের জমাট অন্ধকারে আচ্ছন্ন ছিলো তাই তাকে কেউ ওরা দেখতে পেলোনা গাছের গুঁড়ির আড়ালে আত্মগোপন করে দাঁড়িয়ে রহমান এই অদ্ভুত লোকগুলির কার্যকলাপ লক্ষ্য করতে লাগলো।
মশালের আলোতে সব স্পষ্ট দেখা না গেলেও বেশ বোঝা যাচ্ছে সব। সর্বপ্রথম সবুজ পোশাক পরিহিত লোকগুলি পাহাড়টির সম্মুখে গিয়ে দাঁড়ালো, পিছনে অন্যান্য লোকগুলি।
রহমান অবাক হয়ে দেখলো–পাহাড়টা হঠাৎ যেন ধীরে ধীরে দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে যাচ্ছে। পরক্ষণে আরও আশ্চর্য হলো–লোকগুলি সব ঐ পাহাড়ের মধ্যে অদৃশ্য হলো।
রহমানের চোখের সম্মুখে এবার সব অন্ধকার হয়ে এলো। এখন আর কিছুই দেখতে পাচ্ছেনা সে, চারিদিকে ঘোর অন্ধকার রহমান এবার কি করবে, কোথায় যাবে, ভাবতে লাগলো। একটু পূর্বে দুবৃত্ত শয়তান লোকগুলির হৃদয়হীনতার যে চাক্ষুষ প্রমাণ সে পেয়েছে তাতে বুঝতে পেরেছে লোকগুলি শুধু ভয়ঙ্করই নয়, সাংঘাতিক অমানুষ! রহমান ভোরের আশায় অপেক্ষা করবে না দূলকী নিয়ে ফিরে যাবে শহরে, ভাবতে লাগলো। নূরী যে এখানেই আছে তাতে কোন সন্দেহ নেই।
*
স্বামীর বাহুবন্ধনে নিজকে বিলিয়ে দিয়ে মনিরা বেহেস্তের সুখ অনুভব করে, অনাবিল আনন্দে আল্লুত হয় তার হৃদয়। পৃথিবীর সমস্ত সুখ যেন আজ মনিরার অন্তরে দানা বেঁধে উঠেছে। এমন করে স্বামীকে সে কোনদিন পায়নি। মুদিত আঁখিদ্বয়, ঠোঁটের কোণে মৃদু মধুর হাসি, দক্ষিণ হস্তে স্বামীর কণ্ঠ বেষ্টন করে ধরে আছে মনিরা!
আকাশে চাঁদ হাসছে।
জোছনায় পৃথিবী ঝলমল করছে!
ফোয়ারার পানিতে চাঁদের আলো স্বপ্নপুরীর মায়াময় পরিবেশের সৃষ্টি করে চলেছে।
বাগানবাড়ির মধ্যে সান বাঁধানো সোফায় বসে ছিলো ওরা দু’জনায়-দস্যু বনহুর আর মনিরা। তাদের সম্মুখেই ফোয়ারার পানিগুলো ঝিরঝির করে পড়ছে। মৃদুমন্দা বাতাস অজানা ফুলের সুরভী নিয়ে ছুটোছুটি করে বেড়াচ্ছে এদিক থেকে সে দিকে।
