বেশ কিছুক্ষণ দুলকী অবিরাম ছোটার পর হঠাৎ এক স্থানে এসে থেমে পড়লো।
এখন কোনদিকে দৃষ্টি এগুচ্ছেনা রহমানের, কারণ চারিদিক জমাট অন্ধকারে আচ্ছন্ন, এমনকি তার নিজের শরীরের কোন অংশও তার নজরে পড়ছিলোনা।
রহমান কিছু বুঝতে না পেরে দুকীর পিঠে চাবুক দিয়ে মৃদু আঘাত করলো। কিন্তু আশ্চর্য–দুকী আর এক পাও এগুলোনা। অগত্যা রহমান টাঙ্গী থেকে নেমে পড়লো রাস্তার বুকে।
রহমান লক্ষ্য করলো–দুকী সম্মুখের পা দিয়ে মাটিতে আঘাত করছে, কিছু যেন বোঝাতে চেষ্টা করছে সে রহমানকে। চারিদিক নীরব নিস্তব্ধ’ মাঝে মাঝে দূর থেকে ভেসে আসছে শিয়ালের হুক্কা হুয়া, হুক্কা হুয়া, আওয়াজ। এখন পথের আশেপাশে কিছুই তার নজরে পড়ছিলোনা। গাছপালাগুলোকে কেমন ঝাপসা এক একটা দৈত্যের মত মনে হচ্ছিলো। এখন কি করা যায় ভাবে। রহমান।
হঠাৎ তার মাথায় একটা বুদ্ধি খেলে গেলো; রহমান বুঝতে পারলোটাঙ্গী সমেত চলা হয়তো দুকীর পক্ষে অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। রহমান দুলকীর টাঙ্গী থেকে খুলে নিলো, তারপর দুলকীর পিঠে চেপে বসলো সে।
আশ্চর্য হলো এবার রহমান–দুকী যেন এটাই চাচ্ছিলো অন্ধকার হলেও দুলকী আনন্দে চিহি চিহি শব্দ করে উঠলো, তারপর ছুটতে শুরু করলো দ্রুতগতিতে।
রহমান যেন এবার নিশ্বাস ফেলে বাচলো, দুর্কী তখন আপন মনে ছুটতে শুরু করছে।
অল্পক্ষণেই রহমান অবাক হলো, দুলকী সোজা পথে না গিয়ে পথ ছেড়ে নেমে পড়লো পথের দক্ষিণ পাশে। এবার দুলকী যেন বিপুল উদ্যমে ছুটছে। রহমান অন্ধকারে কিছু দেখতে না পেলেও স্পষ্ট বুঝতে পারছে–দুলকী যে পথে ছুটে চলেছে সেটা কোন মেঠোপথ। দুলকীর খুরের শব্দে অনুভব করে নিলো রহমান।
বেশ কিছুক্ষণ ধরে অবিরাম গতিতে ছুটার পর দুলকীর গতি কমে এলো বলে মনে হলো। রহমানের। চারিদিকে ঘন অন্ধকার থাকা সত্বেও সম্মুখে কেমন যেন জমাট অন্ধকার বলে ঠেকলো।
রহমান এবার ঘোড়া থেকে নেমে পড়লো দুলকী তাকে কোথায় নিয়ে এলো সেই জানে। রাতের অন্ধকার না হলে সব দেখতে পেতো, কিন্তু এখন সে কিছুই দেখতে পাচ্ছেনা।
ঠিক সেই মুহূর্তে একটা আর্ত চিৎকারের শব্দ ভেসে এলো তার কানে। শব্দটা অত্যন্ত ক্ষীণ–অস্পষ্ট।
রহমান দুলকীর লাগাম চেপে ধরে কান পেতে শুনলো কিন্তু ঠিক বুঝতে পারলো না শব্দটা কোন্ দিক থেকে এলো।
দুলকীও যেন আনচান করছে, সতর্কভাবে মাথাটা ফেরাচ্ছে এদিকে সেদিকে।
রহমান এখন কি করবে ভেবে পাচ্ছেনা, কোন দিকে যাবে। করুণ আর্তচীৎকার নূরীর কিনা তাও স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে না। চীৎকার একটা মাত্র ভেসে উঠে থেমে গিয়েছিলো, আচমকা একটা প্রতিধ্বনির মত। কোন দিকে দৃষ্টি এগুচ্ছিলোনা রহমানের, তবু সে সতর্কভাবে তাকিয়েছিলো দূরে অন্ধকারে।
দুলকীও কেমন যেন আনচান করছে, মাঝে মাঝে একটা শব্দ বের হচ্ছিলো তার মুখ দিয়ে।
ঠিক সেই সময় হঠাৎ একটা আলো দেখা গেলো দূরে–অনেক দূরে। আলোটা মিট মিট করে জ্বলছে যেন মনে হলো কিন্তু আসলে আলোটা মিটমিটে নয়, কোন মশালের আলো–বেশ বুঝতে পারলো রহমান।
এবার রহমান কালবিলম্ব না করে দুলকীর পিঠে লাফ দিয়ে উঠে বসলো, তারপর আলোর ক্ষীণ ছটা লক্ষ্য করে ছুটতে শুরু করলো।
সোজা পথ নয়–ঝোপ-ঝাড়-জঙ্গলের মধ্য দিয়ে দুলকী ছুটছে। রহমানের প্রিয় অশ্ব দুলকী বনহুরের তাজের চেয়ে তার বুদ্ধি খুব কম নয়। তাজ যেমন প্রভুর মনের কথা বুঝতো বা বোঝে তেমনি দুলকিও বুঝতে তার মালিক রহমানের মনের কথা।
পশু হলেও তাজ এবং দুলকীর বুদ্ধি বা জ্ঞান ছিলো মানুষেরই মত প্রভুর ইংগিত বুঝতে পারতো এই অশ্ব দুটি।
রহমান যে ঐ আলোর নিকটে পৌঁছতে চায়, এ কথা যেন বুঝতে পেরেছিলো দুলকী, তাই সে আলো লক্ষ্য করে তীরবেগে ছুটছে।
ক্রমে আলোর বিন্দুটা বেশ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। রহমানের চোখ দুটোও উজ্জ্বল হয়ে উঠছে, এবার নিশ্চয়ই নূরীর কোন সন্ধান পাবে সে।
এতক্ষণ যে আরো লক্ষ্য করে রহমান দুলকীকে চালনা করছিলো, এতোক্ষণে বেশ স্পষ্ট বোঝা গেলো সে আলো অন্য কিছু নয়, একটা জ্বলন্ত মশাল।
রহমান এবার দুলকী সহ থেমে পড়লো, তার নিকট হতে প্রায় কয়েক গজ দূরে মশালটা দপ দপ করে জ্বলছে, দেখলো সে।
মশালটা গোঁজা রয়েছে একটা ডালের সঙ্গে, পাশে নজর পড়তেই চমকে উঠলো রহমান, কতকগুলো ভয়ঙ্কর ধরনের লোক এক জায়গায় গোলাকার হয়ে দাঁড়িয়ে মদপান করছে আর জড়িতভাবে আবোল তাবোল কি সব কথাবার্তা বলছে।
রহমান তার অশ্ব থেকে নেমে দাঁড়ালো, তারপর অশ্বটিকে একটা গাছের গুঁড়ির সঙ্গে বেঁধে রেখে ঝোপ-ঝাড়ের মধ্য দিয়ে অগ্রসর হলো।
এবার স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছে রহমান ওদের সব কথাবার্তা।
জড়িত কণ্ঠে একটা লোক বললো–আমার ভাইগণ, যত পারো খেয়ে নাও, একটু পরে মালিক এসে পড়বে আর হবেনা।
আর একজন বললো–মলিকের আসতে এখনও ঢের বাকি। ইচ্ছা মত পান করে নাও দোস্ত।
মশালের আলোতে সব দেখতে পাচ্ছিল আর তাদের কথাবার্তাগুলো সব স্পষ্ট শুনতে চাচ্ছিলো রহমান। বুঝতে পারলো–এটা কোন শয়তান লোকদের আস্তানা হবে। দুষ্কৃতিকারীগণ তাদের শয়তানীর জন্য এই নির্জন বনভূমিটাই বেছে নিয়েছে। রহমান স্তব্ধ নিশ্বাসে লোকগুলির কার্যকলাপ লক্ষ্য করতে লাগলো।
মশালটা তখনও দপ দপ করে জ্বলছে।
ঝোপ-জঙ্গলে আত্মগোপন করে প্রতিক্ষা করছে রহমান। মশা আর পিঁপড়ের কামড়ে গা। জ্বালা করছে তবু একটুও শব্দ করছেনা সে। কারণ তাকে জানতে হবে-নূরী এখানে আছে কি না।
