রহমান টাঙ্গী থেকে এক রকম প্রায় লাফিয়ে নেমে পড়লো। দ্রুত গিয়ে জিনিসটা তুলে নিলো হাতে, সঙ্গে সঙ্গে রহমানের চোখ দুটো চক চক করে উঠলো, কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে কি যেন ভাবলো। তারপর ছুটে গিয়ে উঠে বসলো টাঙ্গীতে।
অশ্বের লাগাম টেনে ধরতেই টাঙ্গীখানা উল্কা গতিতে ছুটতে শুরু করলো।
যে পথের মুখে চকচকে জিনিসটা রহমান কুড়িয়ে পেলো সেই পথে গাড়ি নিয়ে ছুটলো সে।
চকচকে জিনিসটা রহমানকে পথের নির্দেশ বলে দিয়েছে। জিনিসটা অন্য কিছু নয়–নূরীর হাতের স্বর্ণবলয়। দুবৃত্তগণ নূরীকে যখন পাকড়াও করে নিয়ে যাচ্ছিলো তখন তার সে তার হাতের বলয়টা খুলে ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছিলো গাড়ির বাইরে।
সেই বলয়টাই হঠাৎ রহমানের নজরে পড়ে গিয়েছিলো, বলয়টা পকেটে রেখে টাঙ্গী নিয়ে ছুটলো সে।
যদিও এ পথে রহমান কোন দিন আসেনি বা এ পথ তার পরিচিত নয় তবুও টাঙ্গী নিয়ে দ্রুত অগ্রসর হলো।
অজানা অচেনা পথ।
পথের দুই পাশে শাল আর পাইন গাছ এক একটা প্রহরীর মত মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। মাঝে শাঝে ঝোপ-ঝাড় আর বন্য গাছপালাও দেখা যায়। আশেপাশে কোন বাড়িঘর বা দালানকোঠার চিহ্ন নেই। এসব পথ বড় নির্জন, ক্কচিৎ কোন পথচারী বিশেষ প্রয়োজনেই এই পথে এসে থাকে।
রহমানের টাঙ্গী তীরবেগে ছুটছে।
রহমান লক্ষ্য করলো–পথের ধূলায় কোন মোটরের চাকার দাগ স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। আবার একটা ক্ষীণরেখা তার মনের কোণে উঁকি দিয়ে গেলো।
নির্জন নিস্তব্ধ পথ বেয়ে রহমানের টাঙ্গী ছুটে চলেছে। রহমানের শরীর বেয়ে দরদর করে ঘাম ঝরছে। ভিজে চুপসে উঠেছে তার জামাটা। পকেটে গুলী ভরা পিস্তল। একটা তীর ধনুও নিয়েছে সে সঙ্গে, আর নিয়েছে একটা লাঠি।
রহমান বাম হস্তে অশ্বের লাগাম টেনে ধরে দক্ষিণ হস্তে পকেটে পিস্তলের অস্তিত্বটি অনুভব করে নিলো।
পথের যেন শেষ নেই!
রহমানের টাঙ্গী অত্যন্ত দ্রুত ছুটেও যেন পথ শেষ করতে পারছে না।
প্রায় প্রহর দুই চলার পরও রহমান এ পথে কোন জন-প্রাণীর সাক্ষাৎ পেলোনা। পথের ধারে শাল আর পাইন বৃক্ষগুলির ছায়া পথ আচ্ছন্ন করে রেখেছে।
পথটা দূর হতে দূরান্তে মিশে গেছে যেন কোন অজানার বুকে। রহমান সেই পথ ধরে এগুতে লাগলো।
বেলা খুব ছিলোনা, কাজেই অন্ধকার হয়ে এলো অল্পক্ষণের মধ্যেই।
রহমান এতোক্ষণ একটানা গাড়ি চালিয়ে চলেছিলো, এবার টাঙ্গী থামিয়ে পথে নেমে দাঁড়ালো। সতর্ক দৃষ্টি নিক্ষেপ করে তাকালো চারিদিকে। কোথাও জনপ্রাণীর চিহ্ন পর্যন্ত নেই। রহমানের দৃষ্টি যতদূর গেলো ততদূর শুধু ঝোপ-ঝাড় আর আগাছা। কোন কোন জায়গায় পাথরের স্তূপ জমে রয়েছে ছোট ছোট পাহাড়ের আকারে।
রহমান চারিদিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে দেখছিলো। এবার সে তাকালো পথের দিকে। এখানে। পথটা শুধু পাথর কেটে তৈরি–তাই পথে কোন দাগ পরিলক্ষিত হচ্ছিল না। তাছাড়াও সন্ধ্যার। অন্ধকার তখন বেশ জমাট বেঁধে উঠছিলো, এই মুহূর্তে রহমান একটু বেশি চিন্তায় পড়লো, কোনদিকে অগ্রসর হবে? সম্মুখে না পাশের কোন জঙ্গলে?
রহমান ভাবছে, ঠিক সেই সময় দূরে পথের বাঁকে দুটো আলোর বল দেখা গেলো। অজগরের চোখের মত জ্বলছে যেন আলোর বল দুটো। রহমান আরও লক্ষ্য করলো, আলোর বল দুটো দ্রুত গতিতে এদিকেই এগিয়ে আসছে। অল্পক্ষণের মধ্যেই যে এখানে এসে পড়বে তাতে কোন সন্দেহ নেই। এখন উপায়? আলোর বল দুটো কোন গাড়ির সার্চলাইট বুঝতে বাকি নেই তার।
এবার রহমান বেশ চঞ্চল হয়ে পড়লো। গাড়িখানা কোন সৎ ব্যক্তির না হয়ে যদি অসৎ ব্যক্তির হয় এবং তাকে দেখে কোন রকম দুষ্ট মতলবের সৃষ্টি করে। রহমান তাড়াতাড়ি তার গাড়ি থেকে, অশ্বটা খুলে নিয়ে একটা ঝোপের আড়ালে বেধে রাখলো এবার টাঙ্গীখানাকেও লুকোতে হবে।
রহমান টাঙ্গীখানা টেনে নিয়ে চললো। অতি কষ্টে তার টাঙ্গীখানা অল্প সময়ের মধ্যে পথের উপর থেকে সরিয়ে নিলো।
এমন সময় একখানা ট্যাক্সি গাড়ি অত্যন্ত দ্রুতগতিতে সম্মুখের পথ দিয়ে তীরবেগে চলে গেলো।
রহমান অবাক হয়ে দেখলো, যদিও সন্ধ্যার অন্ধকারে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিলোনা কিছু, তবু বেশ বুঝতে পারলো বৈকালে যে গাড়িখানা তার টাঙ্গীর পাশ কেটে তীব্র গতিতে ঝড়ের বেগে ছুটে গিয়েছিলো–এটা সেই গাড়ি। তবে কি নূরীকে কোথাও বন্দী করে রেখে গাড়িখানা ফিরে গেলো। নিশ্চয়ই তাই হবে–এটা যে ঐ গাড়ি, তাতে কোন সন্দেহ নেই।
গাড়িখানা দৃষ্টির অন্তরালে চলে যেতেই রহমান তার টাঙ্গী নিয়ে পথে এসে দাঁড়ালো, ক্ষিপ্র হস্তে তার অশ্ব দুলকিকে জুড়ে দিলো টাঙ্গীর সঙ্গে।
রহমান টাঙ্গীতে উঠে বসতেই দুল্কী ছুটতে শুরু করলো। টাঙ্গীতে কোন আলো না থাকায় পথ স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিলো না। রহমান পথ স্পষ্ট দেখতে না পেলেও, দুলকী পশু সে অন্ধকারেও বেশ দেখতে পায় কাজেই রহমান শুধু লাগাম টেনে ধরে বসে রইলো।
দুলকী আপন মনে ছুটে চলেছে।
আজ ভাগ্যিস রহমান তার এক ঘোড়ার টাঙ্গীখানা নিয়ে বেরিয়েছিলো নইলে সে মাঝে মাঝে তার দুইটি অশ্বওয়ালা টাঙ্গী ব্যবহার করতো।
দুলকী প্রভুর মনোভাব বুঝতে পেরেছিলো কাজেই সে আপন মনে সম্মুখপথে দ্রুত অগ্রসর হলো।
রহমান আর দুলকী দুটি মাত্র প্রাণী–যদিও উভয়ে উভয়ে মনের কথা অনুভব করছে। সম্পূর্ণভাবে কিন্তু কেউ কাউকে স্পষ্টভাবে জানাতে পারছেনা তাদের অন্তরের কথা।
