নূরীকে এমনভাবে গাড়ির মেঝে শুইয়ে দেওয়া হয়েছে যাতে করে বাইরে থেকে কিছু বুঝতে না পারে কেউ।
জনমুখর রাজপথ ছেড়ে উল্টো পথে, গাড়ি ছুটতে লাগলো। গাড়িতে উঠিয়ে নেওয়ার পর পরই নূরীর নাকে ঔষধ ধরে অজ্ঞান করে ফেলা হয়েছে, কাজেই নূরী গাড়ির মধ্যে মৃত্যুর ন্যায় পড়ে আছে।
যে পথ দিয়ে নূরী সহ ভোলানাথের অনুচরগণ এগিয়ে যাচ্ছিলো সেই পথেই টাঙ্গী চালিয়ে মনি সহ আসছিলো রহমান।
গাড়িখানা রহমানের টাঙ্গীর পাশ কেটে চলে গেলো। এক হলকা ধুলো ছড়িয়ে পড়লো রহমান আর মনির চোখে মুখে।
গাড়িখানার দিকে রাগতভাবে একবার তাকালো রহমান কারণ গাড়িখানার দ্রুত গতি তার কাছে বেশ অসন্তুষ্টজনক বলে মনে হলো।
মনি বললো–রহমান কাকু, তুমি ওদের গাড়ি রুখতে পারলে না? আর একটু হলে আমাদের গাড়ি উল্টে দিয়ে চলে যেতো। হাঁ মনি ঠিক বলেছো, বড্ড বেয়ারাভাবে গাড়ি চালাচ্ছে। ওরা। আমাদের গাড়িখানা ধার করে না নিলে ঠিক উল্টে যেতো।
আমি হলে কি করতাম জানো?
কি করতে মনি?
টাঙ্গী থেকে লাফিয়ে পড়তাম ওদের গাড়িতে তারপর ড্রাইভার ছোকরাকে দেখিয়ে দিতাম কেমন করে গাড়ী চালাতে হয়।
মনির কথায় রহমানের বুক ভরে উঠে সর্দারের ছেলে ঠিক কথাও বলেছে সর্দারের মত। পিঠ। চাপড়ে দেয় রহমান–সাবাস মনি, বড় হয়ে তুমি ওদের গাড়ি চালানো শিখিয়ে দিও।
রহমান আর মনি টাঙ্গী নিয়ে বাড়ি এসে পৌঁছলো। প্রতি দিনের মত আজ নূরীকে দরজায় না দেখে রহমান একটু আশ্চর্য হলো।
মনিকে টাঙ্গী থেকে নামিয়ে দিয়ে বইগুলি হাতে দিলো রহমান–যাও মনি; তোমার মাম্মীর কাছে যাও। তোমার মাম্মী বোধ হয় ভিতরে আছে।
মনি বই-পুস্তক হাতে ছুটলো বাড়ির ভিতরে।
প্রথমে ঘরে প্রবেশ করে মনি থমকে দাঁড়ালো কই–কোথায় তার মাম্মী। এবার সে ডাকতে লাগলো উচ্চকণ্ঠে–মাম্মী! মাম্মী!
কোথাও থেকে কোন সাড়া এলো না।
মনি এখানে-ওখানে সবখানে ছুটোছুটি করে খুঁজলো। কোথাও নূরীকে না পেয়ে মনি ফিরে। এলো রহমানের পাশে।
রহমান তখন টাঙ্গী থেকে অশ্ব দুটো খুলে বেঁধে রাখছিলো। মনি রহমানের সম্মুখে এসে কাঁদো কাঁদো সুরে বললো-কাক্ক, মাম্মী নেই।
অবাক হয়ে বলে উঠলো রহমান–মাম্মী নেই?
না, কোথাও তাকে খুঁজে পেলাম না। মাম্মী নেই..
রহমান মুহূর্ত বিলম্ব না করে মনিকে নিয়ে উঠানে প্রবেশ করে ব্যাকুল কণ্ঠে ডাকলো– নূরীরীনূরী…।
প্রতিধ্বনি ফিরে এলো নূরীর কোন শব্দ এলো না।
রহমান আবার উঠানের প্রতিটি জায়গা খুঁটি খুঁটি করে খুঁজলো। রান্নাঘরের ভিতরে এদিক সেদিক দেখলো, আবার বেরিয়ে এলো বাইরে। হঠাৎ রহমানের নজর পড়লো–বাইরে দরজার পাশে পড়ে আছে একটি থালা, আর কিছুটা ভাত-তরকারীও পড়ে রয়েছে থালাটার পাশে।
রহমান কিছুক্ষণ স্থির নয়নে তাকিয়ে রইলো থালাটার দিকে, বুঝতে পারলো–নূরী কোন ভিখারীকে খাবার দিতে এসেছিলো সেইক্ষণে তাকে কোন শয়তান লোক পাকড়াও করে নিয়ে গেছে।
রহমান মনিকে কিছু না বলে কোলে তুলে নিয়ে বললো– চলো মনি, তুমি খাবে চলো।
মনি মুখ ভার করে বললো–মাম্মী কোথায় আগে বলো, তবে খাবো।
মাম্মী! মাম্মী আছে।
কোথায় আমার মাম্মী?
বললাম তো। রহমান ব্যাপারটা অনুমান করে নিলেও চট করে মনিকে বলতে পারলো না, কারণ মনি কচি শিশু–হঠাৎ এমন কোন কথা তাকে বলা উচিৎ হবে না যা তার সরল মনে আঘাত করে, তাই রহমান বললো–হয়তো কোথাও বেড়াতে গেছে–আসবে এক্ষুণি।
মাম্মীর কাছে যাবো আমি। মাম্মীর কাছে যাবো… কান্না জুড়ে দিলো মনি।
রহমান অতিকষ্টে নিজকে সংযত রেখে মনিকে প্রবোধ দিতে লাগলো। কিন্তু মনির কান্না যেন থামতে চায় না।
রহমান ফাপড়ে পড়লো যেন। এদিকে নূরীর চিন্তা, কোথায় গেলো সে? নিশ্চয়ই তাকে জোরপূর্বক কেউ পাকড়াও করে নিয়ে গেছে। মাথাটা যেন রহমানের বন বন করে ঘুরছে এখন। উপায়? কি করবে কিছুই যেন ভেবে পাচ্ছে না সে।
মনি না থাকলে এক মুহূর্ত বিলম্ব করতো না, এক্ষুণি বেরুয়ে পড়তো নূরীর সন্ধানে। কিন্তু এখন সে মনিকে নিয়ে মহা বিপদে পড়ে গেছে। ছোট কচি শিশু তাকে একা ফেলে কোথাও যাওয়া যায়না। তাই বলে নূরীর সন্ধান না করে উপায় নেই। রহমান অধর দংশন করে–কে সে নরাধম যে নূরীকে হরণ করে নিয়ে গেছে।
মনির কোন রকমে চারটি খাইয়ে পাশের বাড়ির চাচীর কাছে তাকে রেখে রহমান টাঙ্গী নিয়ে বেরিয়ে পড়লো। হঠাৎ রহমানের মনে পড়লো, ফেরার পথে একখানা টাক্সি অতি দ্রুত তাদের টাঙ্গীর পাশ কেটে চলে গিয়েছিল, ঘটনাটা অত্যন্ত রহস্যময় বলে মনে হলো তার।
রহমান সেই পথে টাঙ্গী নিয়ে অগ্রসর হলো। কিন্তু কিছুদূর অগ্রসর হয়ে তার মাথাটা কেমন গুলিয়ে গেল, কারণ পথটা বেশ কিছুদূর এগিয়ে যাবার পর কয়েকটা পথের সঙ্গে মিশে এক হয়ে গেছে। কোন পথে গিয়েছে গাড়িখানা কে জানে।
রহমান টাঙ্গী থামিয়ে কিছুক্ষণ ভাবলো, অকুল সমুদ্রে যেন কোন কুল খুঁজে পাচ্ছে না। টাঙ্গীর উপর বসে সে তাকাচ্ছে প্রত্যেকটা পথের দিকে, তার মন যেন ডেকে বলছে–যে গাড়িখানা তখন উল্কা গতিতে চলে গিয়েছে ঐ গাড়িখানার মধ্যেই ছিলো নূরী। রহমান নিপুণ দৃষ্টি মেলে পথের। দিকে তাকাচ্ছিলো, হঠাৎ নজরে পড়ে গেলো অদূরে পথের মুখে পড়ে আছে একটা ঝকঝকে মত জিনিস।
