রহমান নিশ্চুপ দাঁড়িয়েছিলো, বললো এবার নূরী, তুমি ভুল বুঝছো। সর্দার তোমাকে যত ভালবাসে তত তার স্ত্রীকেও বুঝি বাসে না। আমি জানি তুমি তার জীবনের আলো–আর মনিরা রশ্মি।
এ কথা আমি বিশ্বাস করি না।
না করলে আমি নাচার।
রহমান আমি এবার বাঁচতে চাই। তুমি না একদিন বলেছিলে, নূরী, তোমার জীবনটা ব্যর্থ করোনা।
একদিন নয়–বহুদিন আমি তোমাকে এ কথা বলেছি। জীবন-ভর তোমাকে তার ধ্যানই করে যেতে হবে, কোন দিন তাকে পাবে না।
রহমান!
বলো?
আমি ভুলে যাবো, ভুলে যাবো ওকে। কি হবে ওর কথা ভেবে। জীবনে যে এতোটুকু দিতে পারেনি… কি হবে তার ধ্যান করে…।
রহমান নূরীর কণ্ঠস্বরে বিস্মিত হয়, আজ প্রথম সে নূরীর মধ্যে দেখতে পেলো এক ভিন্ন রূপ। বাষ্পরূদ্ধ কণ্ঠে বললো নূরী আবার আমি তোমাকে ভালবাসবো, তোমাকে আমি বিলিয়ে দেবো আমার জীবন।
নূরী!
বহুদিন তোমাকে আমি উপেক্ষা করে বিমুখ করেছি, আজ আমি তোমার কাছে ক্ষমা চাচ্ছি রহমান। তুমি আমাকে গ্রহণ করো…
নূরী! রহমান যেন অস্কুটধ্বনি করে উঠলো।
নূরী রহমানের পায়ের কাছে নত হয়ে বসে পড়লো–রহমান, আমি তোমাকে স্বামী বলে। গ্রহণ করবো।
রহমান সরে দাঁড়ালো, দু’হাত বাড়িয়ে নূরীকে তুলে দাঁড় করিয়ে দিয়ে বললো-নূরী তা হয় না।
কেনো, তুমিই আমাকে বার বার বলেছে, আমাকে তুমি চাও।
চেয়েছিলাম, কিন্তু আজ বুঝতে পারছি তোমাকে নিয়ে আমি শান্তি পাবো না। যে হৃদয় তুমি একজনকে দান করেছো সে হৃদয় আর একজনকে দেওয়া যায় না নূরী।
আমি মুছে ফেলবো তার স্মৃতি।
নূরী, তা হয় না। একদিন আমি তোমাকে পাওয়ার জন্য উম্মাদ হয়ে উঠেছিলাম, আজ সে আকাঙ্খা আমার নেই। নূরী, তোমাকে আমি ভালবাসি সত্য তুমি আমার শ্রদ্ধার পাত্রী।
রহমান!
হাঁ নূরী, আমি মনের সঙ্গে অনেক দ্বন্দ্ব করেছি, কিন্তু জয়ী হতে পারিনি–পরাজিত হয়েছি। নূরী, তুমি আমার বোন…।
রহমান!
বলো নূরী?
রহমান ভাই, তুমি আমাকে বাঁচালে। আমাকে তুমি বাঁচালে।
তোমার পায়ে মাথা রেখে এখন আমি নিশ্চিন্তে মরতে পারবো। কোন পাপ থাকবে না তোমার আর আমার মধ্যে।
আজ রহমান আর নূরী পরম নিশ্চিন্ত মনে ঘুমালো। উভয়ে যেন উভয়ের কাছে আজ আপন, অতি সরল-সহজ হয়ে এসেছে। সম্বন্ধ ছিলো বন্ধু–আজ হলো ভাই।
কতদিন বুঝি এমন আরামে ওরা ঘুমাতে পারেনি। রহমানের মনে সদা জেগেছে এক না পাওয়ার উন্মত্ত বাসনা আর নূরীর মনে দানা বেঁধেছে একটি অজানিত আশঙ্কা। আজ আর কারো মনে নেই কোন দ্বিধা-দ্বন্দ্ব বা কোন অহেতুক স্পন্দন।
*
মনিকে নিয়ে বেশ কাটছিলো নূরী আর রহমানের। আজকাল নূরী রহমানকে রহমান ভাই ডাকে।
মনিকে স্কুলে পৌঁছে দিয়ে রহমান সারাদিন টাঙ্গী চালায় আর নূরী বাড়িতে সংসারের কাজ করে। ফিরবার পথে রহমান মনিকে নিয়ে বাড়ি ফিরে।
নূরী রান্নাবান্না শেষ করে নিয়ে দরজায় দাঁড়িয়ে প্রতিক্ষা করে রহমান ভাই আর মনির।
প্রতি দিনের মত আজও নূরী সংসারের কাজ সেরে দরজায় দাঁড়িয়ে তাকিয়েছিলো পথের দিকে। অন্যান্য দিনের চেয়ে আজ যেন কিছুটা বিলম্ব হচ্ছে ওদের ফিরতে। উদ্বিগ্ন অন্তর নিয়ে প্রতিক্ষা করছে সে।
এমন সময় একটি অন্ধ ভিখারী এগিয়ে এলো নূরীর সম্মুখে। এক মুঠুঠি ভাত দিজিয়ে মাই। থোরা পানি…
নূরীর মনটা কেঁদে উঠলো বৃদ্ধ ভিখারীর করুণ কণ্ঠস্বরে। বললো–একটু দাঁড়াও বাবা, তোমার জন্য খাবার আনছি।
বৃদ্ধ ভিখারীর মুখটা খুশিতে ভরে উঠলো, বললো আবার মাই অপেক্ষা বহু দয়া।
নূরী চলে যেতেই ভিখারী মুখের মধ্যে দুটো আংগুল দিয়ে এক রকম শব্দ করলো, সঙ্গে সঙ্গে কয়েকজন গুণ্ডা ধরণের লোক আশেপাশে গা ঢাকা দিয়ে এসে দাঁড়ালো।
বৃদ্ধ ভিখারী তার দলবলকে কি যেন ইংগিৎ করে আবার লাঠিতে ভর করে উবু হয়ে দাঁড়ালো।
আসলে ভিখারী বৃদ্ধ নয়, সে আরাকান শহরের সেরা ডাকাত ভোলানাথজীর সহকারী শ্যামনাথ।
শ্যামনাথ একদিন এ পথে যাবার সময় নূরীকে দরজায় দেখেছিলো, তারপর সে নূরীর সৌন্দর্যের কথা গিয়ে বলেছিলো তাদের দলপতি ভোলানাথজীকে।
ভোলানাথ যেমন ছিলো দুর্দান্ত শয়তান তেমনি ছিলো তার নারী পিপাসা। শহরের যে কোন মেয়েকে চুরি করে নিয়ে গিয়ে তার সতীত্ব নষ্ট করাই ছিলো, তার কাজ।
ডাকাত ভোলানাথের ভয়ে শহরের মেয়েরা শান্তিতে বাস করতে পারতো না।
সহকারী শ্যামনাথ নূরীর নিকটে এসেছে এক মুটি অন্নের জন্য।
নূরী নিঃসঙ্কোচে খাবার নিয়ে বেরিয়ে এলো উঠান থেকে।
বৃদ্ধ ভিখারীর বেশে শ্যামনাথ বললো মাই আপ আয়া?
হাঁ বাবাজী’ খাবার এনেছি, নাও। নূরী খাবারের থালাটা এগিয়ে ধরলো ভিখারীর সম্মুখে। বৃদ্ধ ভিখারীর মাটিতে থালা রেখে বললো–আপ দিজিয়ে মাই। খোদা আপকো বহুৎ ভালা করে…
নূরী যেমন ভিখারীর থালায় ভাত-তরকারী ঢেলে দিতে গেলো অমনি ভিখারী মুখের মধ্যে দুটো আংগুল পুরে শিষ দিয়ে উঠলো।
সঙ্গে সঙ্গে আড়াল থেকে কয়েকজন বলিষ্ঠ লোক বেরিয়ে নূরীকে ধরে ফেললো। কেউবা নূরীর মুখে কাপড় খুঁটো দিলো।
অদূরে একটু আড়ালে একখানা গাড়ি দাঁড়িয়েছিলো, বলিষ্ঠ লোকগুলি নূরীকে এটে ধরে গাড়িখানার মধ্যে তুলে ফেললো। শয়তান লোকগুলিও উঠে পড়লো গাড়িতে।
ড্রাইভার এজন্য প্রস্তুত ছিলো, নূরীকে গাড়ীতে তুলে নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই স্টার্ট দিলো সে। উল্কা বেগে গাড়িখানা ছুটতে শুরু করলো।
