মুহূর্তে নূরীর মুখ কালো হয়ে উঠলো চোখ দুটো অশ্রু সিক্ত হলো। নূরী একথা জানে তবু রহমানের মুখে কথাটা তার অন্তরে যেন বিদ্ধ করলো। দু’হাতে মাথাটা চেপে ধরে বললো নূরী রহমান তোমার মুখে এসব কথা শোনার পূর্বে আমার মৃত্যু হওয়া উচিৎ ছিলো। জানতাম না তুমি সুযোগ পেলেই আমাকে গ্রাস করতে চেষ্টা করবে।
না না,নূরী আমী তোমাকে গ্রাস করতে চাই না। তোমার মঙ্গলই আমার একমাত্র কামনা।
তাহলে তুমি আমাকে বার বার ঐসব কথা স্মরণ করাচ্ছো কেনো? একদিন তোমাকে বলেছি–আমি মনে-প্রাণে ওকে স্বামী বলে গ্রহণ করেছি কোন ঝড়-ঝঞ্ঝা বাধা-বিপত্তি আমার মনে থেকে তাকে মুছে ফেলতে পারবে না, কিছুতেই না।
কিন্তু সে কি তোমায় কোনদিন স্ত্রী বলে গ্রহণ করতে পেরেছে? বলো পেরেছে?
জানি না!
এক হাতে যেমন কোনদিন তালি বাজে না, তেমনি স্বামী স্ত্রী সম্বন্ধ কোন দিন এক জনের মনের কথায় হয় না। নূরী সর্দার বিয়ে করেছে আর তার সন্তানও জন্মেছে একটা।
রহমান।
হাঁ নূরী।
বিয়ে যে করেছে জানি কিন্তু–কিন্তু তার সন্তান–না না এ হতে পারে না।
অবাক কণ্ঠে বললো রহমান–দস্যু বনহুর বিয়ে করেছে একথা তুমি জানো?
জানি। বনহুর নিজে আমাকে একথা বলেছিলো একদিন।
এ কথা জেনেও তুমি তাকে স্বামী বলে মনে নিতে পারছো?
এ কথা শোনার অনেক আগেই যে আমি তাকে স্বামী বলে গ্রহণ করেছি রহমান। মেয়েদের বিয়ে একবারই হয়। দ্বিতীয় বার যদি কোন নারী কোন পুরুষকে স্বামী বলে গ্রহণ করে তাহলে সেটা তার বিয়ে নয় লোক দেখানো একটা ভন্ডামি মাত্র। মেয়েদের হৃদয় এমন একটা জিনিস যা একজনকেই দেওয়া যায়, দ্বিতীয় জনকে নয়।
নূরী, তাহলে কি তুমি বনহুরের ধ্যান করেই জীবন কাটিয়ে দেবে?
হাঁ, সেটাই হবে আমার জীবনের চরম সাধনা।
তার স্ত্রী-সন্তান আছে জেনেও?
নূরী নত মস্তকে দাঁড়িয়ে রইলো, ফোঁটা ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়তে লাগলো তার গন্ড বেয়ে। একটু চিন্তা করে বাষ্পরুদ্ধ কণ্ঠে বললো–তার সন্তান আছে এ কথা তোমাকে কে বললো?
আছে এবং সে তোমারই কোলে—
রহমান।
নূরী, সর্দার তোমাকে কিছু দিতে পারেনি, তাই তার সন্তানকে এনে দিয়েছে তোমার বুকে।
নূরীর চোখে মুখে রাশিকৃত বিস্ময় ফুটে উঠে। অবাক কণ্ঠে বলে–তুমি কি বলছো রহমান?
যা বলছি সম্পূর্ণ সত্য কথা বলছি।
আমি ঠিক বুঝতে পারছি না?
বেশ, আমি তোমাকে বুঝিয়ে দেবো কিন্তু মনে রেখো নূরী তার ধ্যান করেই শুধু তোমাকে কাটাতে হবে কোনদিন তার নাগাল পাবেনা–কথাটা বলে দ্রুত বেরিয়ে গেলো ঘর থেকে।
নূরী স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো ভেবে পেলোনা রহমান তাকে কি বুঝিয়ে বলতে চাইলো।
*
অন্য একদিন।
মনি ঘুমিয়ে আছে, পাশে বসে জামা সেলাই করছিলো নূরী। সম্মুখে একটি পায়ার উপরে লণ্ঠনটা দপ দপ করে জ্বলছে।
রহমান হাতের উপর মাথা রেখে শুয়েছিলো কি যেন ভাবছিলো সে গভীরভাবে।
নূরীর মনটাও সেদিনের পর থেকে বেশ গম্ভীর ভাবাপন্ন হয়ে পড়েছে।
রহমানের সঙ্গে মন খুলে সে যেন কথা বলতে পারে না। সব সময় কি যেন চিন্তা করে। রান্না করে খাওয়ায় নিজে একটু মুখে দেয়–সব আগের মতই আছে শুধু তার মনে এসেছে মস্ত একটা পরিবর্তন। বনহুরের স্ত্রী আছে, সন্তান আছে–বনহুর তার নিজ সন্তানকে তুলে দিয়েছে। তার বুকে–তবে কি–তবে কি তার ধারণা সত্য। বহুদিন আগে মনিকে যেদিন প্রথম সে দেখেছিলো চমকে উঠেছিলো সে–তার হুরের চেহারার সঙ্গে মনির যে অদ্ভুত মিল দেখেছিলো। কিন্তু তা কি করে সম্ভব হবে মনিকে সে তার সম্মুর জঙ্গলে কাঁপালিকের কবল থেকে উদ্ধার করে এনেছিলো। বনহুরই তো সেদিন উদ্ধার করেছিলো এই শিশু মনিকে। সেদিন তো নিজেই সে সঙ্গে ছিলো তার। মনি কার ছেলে তা তারা কেউই জানেনা, কিন্তু রহমান বলেছে–বনহুর তারই সন্তানকে তুলে দিয়েছে নাকি তার বুকে–সব কেমন এলোমেলো লাগে নূরীর কাছে। উঠে দাঁড়ায় সে এগিয়ে আসে রহমানের পাশে–রহমান।
কিছু বলবে নূরী?
সেদিন যে তুমি বলেছিলে হুর তার নিজের সন্তানকে আমার বুকে তুলে দিয়েছে। তুমি কি বলতে চাও–মনি হুরের সন্তান?
বলতে চাইনা নূরী বলছি সর্দারের সন্তান মনি।
অসম্ভব?
কেনো অসম্ভব?
মনিকে আমরা সম্মুর জঙ্গলে পেয়েছি।
যেখানেই পাও তাকে মনি তারই সন্তান।
কিছুতেই হতে পারে না।
নূরী, ভাল করে তাকিয়ে দেখো দেখি–ঐ ঘুমন্ত শিশুর মুখে কার মুখের ছাপ ফুটে উঠেছে।
রহমান!
হাঁ নূরী, তুমি বিশ্বাস করো মনি দস্যু বনহুরের সন্তান এবং মনির মা চৌধুরী কন্যা মনিরা।
না না, মনি আমার সন্তান। আমি–আমি ওর মা।
সর্দার মনিকে তুলে দিয়েছে তোমার হাতে, তুমিইতো ওর মা।
কিন্তু কি করে তা হবে। ওর মা যে মনিরা চৌধুরী কন্যা মনিরা ও গর্ভধারিনী জননী–
রহমান উঠে সোজা হয়ে দাঁড়ালো, নূরীর মুখোভাব লক্ষ্য করে বললো– মনি জানেনা সে কথা জানলেও সে কচি শিশু ভুলে গেছে অনেক দিন। সর্দার ওকে তোমার সন্তান বলেই তোমাকে সপে দিয়েছে–কাজেই মনি এখন তোমারই সন্তান।
যখন বড় হবে জ্ঞান হবে, তখন তখন সে নিজের মায়ের অন্বেষণ করবে। আমার তখন কি হবে রহমান? আমি বাঁচবো কাকে নিয়ে–নূরী আকুলভাবে কেঁদে উঠলো।
রহমান রইলো নিশ্চুপ হয়ে কোন জবাব সে খুঁজে পেলোনা।
নূরী অনেকক্ষণ কেঁদে কেঁদে আঁচলে চোখ মুছলো, তারপর সরে এলো রহমানের পাশে রহমান, বনহুর আমাকে সব দিকে ধোকা দিয়েছে। আমাকে সে ধোকা দিয়েছে। ছোট বেলা হতে আমার মন নিয়ে সে ছিনিমিনি খেলেছে। আমার ভালবাসা নিয়েছে সে নিঃশেষ করে কিন্তু আমাকে সে এতোটুকু দেয়নি। আজীবন সে আমাকে কাঁদিয়েছে, হাসতে দেয়নি কোন দিন। রহমান, আমি ভুলে যাবো, সত্যি ওকে ভুলে যাবো।
