কতদিন নির্জন কক্ষে একা একা বসে ভাবতো সে কত কথা অতীতে হারিয়ে যাওয়া স্মৃতিগুলি তার মনের পর্দায় ভেসে উঠতো একটি পর একটি করে। নূরীর জীবনপাতা হাতড়ে একজনকে বার বার তার মনে পড়তো সে তার বনহুর। অনেক চেষ্টা করেও সে একটি মুহূর্তের জন্যও ভুলতে পারতো না তাকে। বনহুর যে তার ধ্যান জ্ঞান সাধনা স্বপ্ন। বনহুরের স্মৃতি আকড়ে ধরে বাঁচতে চায় সে।
কিন্তু আজকাল আর একটি মুখ তার মনে পড়ে বনহুরের মুখের পাশে, সে ঐ রহমান।
একটা করুণ মুখচ্ছবি তাকে অস্থির করে তোলে। মায়া হয় বেচারী রহমানের জন্য। ছোট বেলা হতেই রহমানকে সে দেখে এসেছে। রহমান তার সান্নিধ্য লাভের আশায় সব সময় লালায়িত থাকতো শিশু মনে ছিলোনা তখন কোন লালসার আভাস অতি পবিত্র অতি সচ্ছ ভাবেই রহমান ভালবাসতো নূরীকে। কিন্তু নূরী ওকে কোন দিন করুণার চোখে দেখেনি, একটু খানি ভালবাসাতে সে পারেনি কোন দিন ওকে।
তার জন্য রহমানের কোন অভিমান ছিলোনা ছিলো শুধু বুক ভরা ব্যথা।
রহমান বনহুরকে সব সময় সম্মানের চোখে দেখতো। ছোট বেলা হতেই তাকে সে সমীহ করে চলতো। অবশ্য কারণও ছিলো অনেক। রহমান বনহুরের চেয়ে বয়সে বেশি কম না হলেও কিন্তু কম ছিলো। বুদ্ধি আর শক্তিতেও বনহুর ছিলো অসীম। রহমানকে বনহুর অনেক বার সাক্ষাৎ মৃত্যুর কবল থেকে রক্ষা করে ছিলো। একবার বিরাট এক অজগরের হাত থেকে বাঁচিয়ে নিয়েছিলো সে।
বনহুর তার তরবারী দিয়ে খন্ড খন্ড করে কেটে ফেলেছিলো অজগর সাপটাকে।
আরও কয়েকবার এমনি নানা বিপদের মুখ থেকে রহমানকে রক্ষা করছে বনহুর। শুধু রহমানকেই নয়, আস্তানায় এমন জন নেই যে, বনহুরের কাছে জীবনের বিনিময়ে ঋণী নয়।
রহমান যেদিন জানতে পেরেছিলো–বনহুর নূরীকে ভালবাসে আর নূরীও ভালবাসে তাকে। সেই দিন হতে রহমান নূরী থেকে দূরে সরে পড়তে চেষ্টা করেছে, যতদূর সম্ভব সরে রয়েছে। তার কাছ থেকে।
কিন্তু পুরুষ মন মাঝে মাঝে চঞ্চল হয়ে উঠতো। নূরীকে নিজের করে পাবার জন্য মন তার অস্থির হয়ে পড়তো কিন্তু সর্দারের কথা মনে করে নিজকে সংযত করে নিতো রহমান।
আজ সেই নূরী তার পাশে একেবারে অতি নিকটে। তবু রহমান পাথরের মূর্তির মত কঠিনভাবে নিজকে শক্ত করে রেখেছে। নূরীর সান্নিধ্য তাকে কখনও কখনও উত্তেজিত করে তোলে বটে কিন্তু নিজকে সে দাবিয়ে রাখে মন্ত্রগ্রস্থের মত। নূরীকে সে রক্ষা করতে এনেছে গ্রাস করতে নয়।
রহমান যতই কঠিন হতে চেষ্টা করুক, যতই সে শক্ত হতে চাক কিন্তু সো তো মানুষ–তার দেহেও রক্ত মাংসের তৈরি। তার ধমনীতেও প্রবাহিত হচ্ছে উষ্ণ রক্ত। প্রাণ তারও আছে।
একদিন নূরীর মুখখানা অস্থির করে তুললো রহমানকে। মনি তখন স্কুলে। রহমান টাঙ্গী নিয়ে ফিরে এল বাসায়।
নূরী টাঙ্গীর শব্দ পেয়ে ছুটে এলো হাতের কাজ ফেলে, বিস্ময়ভরা কণ্ঠে বললো–আজ এতো সকাল সকাল এলে যে? মনি কোথায়? ওর কিছু হয়নিতো?
কেননা, সকাল সকাল কি কোনদিনই আসতে নেই নূরী?
আগে বলো মনি কোথায়?
স্কুলে।
আর তুমি তাকে না নিয়েই চলে এলে?
স্কুল ছুটির অনেক দেরী আছে কিনা তাই–
রহমান নূরীর পিছনে কক্ষে প্রবেশ করলো। মাথার পাগড়িটা খুলে এক পাশে রেখে নূরীর খাটিয়ায় গিয়ে বসলো।
নূরীর বিস্ময় তখনও খাটেনি। কিছুটা এগিয়ে এসে বললো– হঠাৎ এলে যে?
নূরী, টাঙ্গী চালাচ্ছি, কেনো যে তোমার কথা মনে পড়ায় হৃদয়টা আমার অস্থির হয়ে পড়লো। তোমার ঐ ঢলঢল মুখখানা আমায় যেন হাতছানি দিয়ে ডাকলো–
রহমানের কণ্ঠস্বর আজ স্বাভাবিক ছিলো না আবেগ ভরা গলায় সে নূরীকে বললো আবার –নুরী আর কতদিন এমনি করে কাটাবে?
রহমান, তোমার কথা আমি ঠিক বুঝতে পারছি না।
একটু স্থির হয়ে চিন্তা করলেই বুঝতে পারবে নূরী।
তুমি কি বলতে চাও?
নূরী, আমি বলছি–নিজের জীবনটা এমনি করে ব্যর্থ করো না। ঐ সুন্দর স্নিগ্ধ রূপরাশি হেলায় নষ্ট করো না নূরী, হেলায় নষ্ট করো না।
রহমান!
হাঁ নূরী জানি আমি যা বলছি তা তোমার কাছে খুব খারাপ লাগছে কিন্তু তুমি গভীরভাবে চিন্তা করে দেখলেই বুঝতে পারবে, আমার কতাগুলো কত মূল্যবান। তোমার ফুলের মত নিষ্পাপ একটি জীবন আমি কিছুতেই নষ্ট হতে দেবো না নূরী।
আজ তোমার মতিছন্ন হয়েছে রহমান। তুমি কি নেশা পান করেছো?
আজতো তুমি নতুন নও নূরী। তুমি জানো, নেশা করা আমার অভ্যাস নেই, কাজেই আমি নেশাগ্রস্ত নই। নূরী, আমি অনেক চিন্তা করেছি, শুধু আজ নয়–মাসের পর মাস বছরের পর বছর আমি তোমার কথা ভেবেছি।
তার মানে?
মানে ভেবেছি তোমার ঐ অপূর্ব রূপরাশি যে কোন পুরুষের পরম কামনার বস্তু, আর সর্দার সেই অমূল্য সম্পদের কোন মর্যাদা দিলো না।
রহমান তুমি সংযতভাবে কথা বলো।
আমি অসংযত কোন কথাই বলবো না নূরী তা ছাড়া আমি জোরপূর্বক তোমাকে কোনদিন স্পর্শও করবো না। যতক্ষণ তুমি আমাকে স্বেচ্ছায় ধরা না দেবে।
নূরীর চোখ দুটো দিয়ে অগ্নিস্ফুলিঙ্গ নির্গত হতে লাগলো। দাঁত পিষে বললো–সে আশা তুমি কোনদিন করো না রহমান।
তুমি কি তাহলে নিজের জীবনটা নষ্ট করে দেবে?
রহমান, তুমি তা হলে এখনও জানো না, আমি কে?
হঠাৎ হেসে উঠলো রহমান হাঃ হাঃ করে, তারপর বললো– জানি তোমার ধ্যান-জ্ঞান স্বপ্ন সাধনা দস্যু বনহুর। কিন্তু মনে রেখো নূরী, কোন দিন তাকে পাবে না–পেতে পারো না।
