এ কথা তুমি আরও বহুবার বলেছো মা, তোমার কথা রাখতে পারিনি, কোনদিন পারবো কিনা।
বনহুরের খাওয়া হয়ে গিয়েছিল, মুখ মুছে উঠে দাঁড়ায়। একটু ভেবে বলে আবার–মা, আমার কি সখ হয় না তোমাদের নিয়ে সুখের সংসার গড়ে তুলি। কিন্তু পারিনা–পারিনা নিশ্চিত হতে শত শত ক্ষুধার্ত ভাই বোনদের অশ্রুসজল আঁখি আমায় পাগল করে তোলে। শুনতে পাই। তাদের করুণ আর্তনাদ–মা, আমি পারিনা তখন নিজকে ধরে রাখতে। তখন আমি উন্মাদ হয়ে উঠি যত রাগ হয় আমার ধনী লোকদের উপর, যারা নিরীহ গরিবদের বুকের রক্ত শুষে নিয়ে গড়ে তুলছে স্বর্গ সমতুল্য ইমারত গড়ে তুলেছে নিজের ভবিষ্যতের কাঠামো স্বর্ণ আসনে উপবেশন করে যারা রাজভোগে ক্ষুধা নিবৃত্ত করছে তাদের উপর। দাঁতে দাঁত পিষে বনহুর চোখ দুটো দিয়ে যেন আগুন ঠিকরে বের হয়।
নিষ্পলক নয়নে তাকিয়ে থাকে মনিরা স্বামীর এই দীপ্তকান্তি সৌম্য সুন্দর। জ্বলন্ত মূর্তির দিকে এ মানুষ পৃথিবীর নয় কোন দেবযুবক।
স্বামীর মুখের দিকে তাকিয়ে হৃদয় ভরে উঠে মনিরার। স্বার্থক তার জীবন স্বার্থক তার নারীত্ব। এমন স্বামী সে পেয়েছে।
বনহুর বলেই চলেছে–মা, আমি তখন স্বাভাবিক জ্ঞান হারিয়ে ফেলি। আমার মধ্যে তখন। জেগে উঠে একটা ভীষণ মানুষ। এক পৈশাচিক প্রাণ। মায়া মমতার বালাই তখন থাকেনা আমার মধ্যে। তখন আপন জনের বুকেও ছোরা বসিয়ে দিতে আমার থাকেনা কোন দ্বিধা।
মনির!
মা, তুমি জানোনা তোমার সন্তান শুধু তোমার নয় সে এই পৃথিবীর সন্তান। পৃথিবী আমার মা, পৃথিবীর বুকে যারা বাস করে সবাই আমার ভাইবোন। বলো মা তুমি যদি তোমার সন্তানকে বুকের মধ্যে আঁকড়ে ধরে রাখে তাহলে আমার চির হতভাগ্য ভাই-বোনদের বেদনার অশ্রুকে মুছে দেবে কে, কে দেবে তাদের ক্ষুধায় অন্ন।
তাই বলে তুই দস্যুতা করে–
দস্যু আমি নই মা, যাদের প্রচুর আছে তাদের কাছ থেকে আমি নিয়ে যাদের নেই তাদের মধ্যে বিলিয়ে দেই। মা, তুমি আমাকে বাধা দিও না! তুমি আমাকে আশীর্বাদ করো, তোমার সন্তান। যেন দেশ ও দেশবাসীর জন্য জীবন উৎসর্গ করতে পারে।
*
নূরীর জীবন রক্ষার জন্যই দেশ ত্যাগ করেছে রহমান। শুধু দেশ ত্যাগই নয়, আত্মীয়-স্বজন বন্ধু-বান্ধব এমনকি তার অতি প্রিয় সর্দারকেও ত্যাগ করে চলে এসেছে সে আরাকান শহরে। কান্দাই এর মায়াও মুছে ফেলে দিয়েছে সে নিজের মন থেকে। আর কোনদিন কান্দাই শহরে ফিরে যাবে কিনা সেই আশাও করেনা।
টাঙ্গী চালায় সারাটা দিন। হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রম করে রহমান। পয়সা উপার্জন যা করে তাই দিয়ে কোন রকমে সংসার চালিয়ে নেয়। নুরী সে আর মনি তিনটি প্রাণী কোন রকমে চলে যায়। দস্যুতা রহমান একেবারে ছেড়ে দিয়েছে, মাঝেমাঝে তার অবাধ্য মন যদিও চঞ্চল হয়ে উঠে তা অতি সংযতভাবে দমিয়ে রাখে শপথ করেছে– আর সে দস্যুতা করবেনা বিশেষ করে মনির জন্য তাকে দস্যুতা ত্যাগ করতে হয়েছে। সর্দারের সন্তান মনি তাকে মানুষ করাই এখন রহমানের কাজ। মনি লেখাপড়া শিখবে দস্যু না হয়ে হবে সে একজরন মস্ত বড় অফিসার কিংবা ঐ রকম একটা বড় কিছু। রহমান তাই মনিকে আরাকান শহরে একটা ভাল ইংলিশ স্কুলে ভর্তি করে দিয়েছে। নূরী ওকে খাইয়ে দাইয়ে সুন্দর করে সাজিয়ে বইগুলি তুলে দেয়, তারপর ওর ছোট্ট ফুটফুটে গালে একটু মৃদু আঘাত করে বলে–যাও মনি স্কুলে যাও।
রহমান টাঙ্গীতে ঘোড়া জুড়ে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করে।
মনি ছুটে আসতেই রহমান ওকে কোলে তুলে নিয়ে গাড়িতে বসিয়ে নিজেও কোচ বাক্সে উঠে বসে। বাম হস্তে মনিকে আঁকড়ে ধরে দক্ষিণ হস্তে অশ্বের লাগাম টেনে ধরে।
গাড়ি ছুটতে শুরু করে।
স্কুলের সম্মুখে টাঙ্গী দাঁড় করিয়ে মনিকে কোলে করে নামিয়ে দেয়।
যতক্ষণ মনি স্কুল কক্ষে প্রবেশ না করে ততক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকে রহমান গাড়ির পাশে।
তারপর গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে যায় স্কুল প্রাঙ্গন থেকে। দিন ভর ভাড়া খেটে ঠিক স্কুলের সময় হলেই ছুটে আসে রহমান তার ঠিক জায়গা।
মনিরের প্রতিক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকে রহমান তার গাড়ির পাশে।
মনি দূর থেকে রহমানকে দেখে ছুটে আসে জড়িয়ে ধরে ওকে।
রহমান তুলে নেয় কোলে–চলো, মনি তোমার মাম্মীর কাছে চলো।
মনি কিন্তু রহমানকে কাকু ডাকাতো, রহমানের কথায় মনি তার গলা জড়িয়ে ধরে বলে– মাম্মীকেও একদিন নিয়ে আসবে এখানে তাই না কাকু?
হাঁ তোমার মাম্মীকেও আনবো।
রহমান যখন মনিকে নিয়ে তাদের ছোট্ট আবাসে এসে পৌঁছালো তখন নূরী তাদের খাবার নিয়ে প্রতিক্ষা করছে।
টাঙ্গী থেকে নেমে রহমান মনিকে নামিয়ে দিলো।
মনি ছুটে গিয়ে জাপটে ধরলো নুরীকে।
নূরী কোলে তুলে নিয়ে চুমোয় চুমোয় ভরিয়ে দিলো মনির গাল দুটো। তারপর খেতে দিলো ওদের দু’জনকে।
*
দিন যায়।
মনি স্কুলে লেখাপড়া করে।
রহমান টাঙ্গী চালায়ে অর্থ উপার্জন করে।
নূরী রান্না করে খাওয়ায় যত্ন করে ওদের। কিন্তু সারাটা দিন তার বড় অশান্তিতে কাটে বড় একা একা মনে হয় আস্তানায় সে ছিলো মুক্ত বিহঙ্গের মত আর এখানে এসে হয়েছে সে খাঁচার বন্দী পাখির মত। প্রাণ খুলে কোথাও বেড়াতে পারে না, কথা কইবার কাউকে কাছে পায় না, চুপচাপ কাটাতে হয় সারাটা দিন। যতক্ষণ ফিরে না আসে রহমান আর মনি ততক্ষণ দরজায় দাঁড়িয়ে তাকিয়ে থাকতো পথের দিকে চেয়ে।
