মনিরা!
হাঁ। ওগো তুমি আমায় বারণ করো না।
বেশ। কিন্তু সে তোমার কাছে যা চায় আমি জানি।
মনিরা আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে উঠলো–সত্যি বলছো? তুমি জানো আমার বান্ধবী জুলেখা কি চায়? বলো–ওগো বলো কি চায় সে? আমার কাছে যা চাইবে তাই দেবো তাকে।
বনহুর মনিরাকে বাহুবন্ধন থেকে মুক্ত করে দিয়ে গম্ভীর কণ্ঠে বললো–মনিরা যত সহজ মনে করছো তত সহজ নয় দেওয়াটা।
তুমি আমাকে এতো ক্ষুদ্রমনা মনে করছো? যত টাকা সে চায় তাই দেবো। টাকা না চায় অলঙ্কার দেবো, গাড়ি চায় গাড়ি দেবো বাড়ি চায় তাই দেবো– যা চায় দেবো আমি।
হাসলো এবার বনহুর–ও সবের অভাব নেই তার। সে চায় তোমার স্বামীকে! পারবে পারবে দিতে তুমি?
মুহূর্তে মনিরার মুখ কালো হয়ে উঠলো, বললো সে –এ তুমি কি বলছো?
সত্যি কথা বলছি। মনিরা, তোমার বান্ধবীর আশা সামান্য নয়।
না না এ হতে পারে না।
কেনো, পারবে না, একটু আগেই তুমি বলেছে জুলেখা তোর কাছে যা চাইবে তুমি দেবে তাকে?
বলেছি, কিন্তু যা সে চায় তা আমি কল্পনাও করিতে পারিনি। অসম্ভব, এ কখনও হতে পারেনা-না না, কখনই না। তার চেয়ে আমার জীবনটা চাইলেও আমি দিতে রাজি আছি
মনিরা তোমার বান্ধবীকে আমিও সেই কথা বলেছিলাম। বলেছিলাম মনিরা দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে দেবার বিনিময়ে আপনি যা চাইবেন তাই আমি দেবো আপনাকে। আমিও তখন বুঝিনি সে এমন কিছু চাইবে যা দেবার মত নয়।
মনিরা অস্ফুট শব্দ করে উঠলো–তারপর?
তারপর আমার কথায় সে বললো–পারবেন। পারবেন আপনি দিতে? আমি যা চাইবো? আমি বলেছিলাম, পারবো। মনিরা তোমার বান্ধবী আমার হাতখানা মুঠায় চেপে ধরে বলেছিলো, আপনার ভালবাসা আমি চাই। একান্ত নিজের করে পেতে চাই আমি আপনাকে।
তুমি কি জবাব দিলেছিলে?
বলেছিলাম–ডক্টর, আপনি যা চান–অসম্ভব। কারণ আমি বিয়ে করেছি।
সত্যি! সত্যি তুমি তাকে এ কথা বলেছো?
বলেছি।
না না, আমি এ দৃষ্টিশক্তি লাভ করতে চাইনা। চাইনা আমি দুনিয়ার আলো দেখতে। সব অন্ধকার হয়ে যাক তবুও তোমাকে। আমি কারো হাতে দিতে পারবোনা। চাপা ক্রন্দনে কণ্ঠ ধরে আসে মনিরার।
বনহুর ওকে নিবিড়ভাবে টেনে নেয় কাছে আবেগ ভরা গলায় বলে–মনিরা তুমি বিশ্বাস করো আমাকে। তুমি যখন অন্ধ ছিলে, আমি পারতাম জুলেখাকে খুশি করতে। মনে রেখো মনিরা তোমার স্বামী পিশাচ হতে পারে কিন্তু পাশবিক নয়।
মনিরা স্বামীর বুকে মুখ লুকিয়ে আনন্দভরা কণ্ঠে বলে–আমি জানি এ কথা।
মনিরা তুমি আমাকে বিশ্বাস করো তাই আমার সান্ত্বনা। তাছাড়া এ পৃথিবীর কেউ আমাকে বিশ্বাস করতে পারেনা বা করেনা। সবাই জানে–দস্যু বনহুর শুধু ধন-রত্ন, টাকা-কড়িই হরণ করেনা, নারীর ইজ্জত লুটে নিতেও সে দ্বিধা করেনা, কিন্তু মনিরা তারা জানেনা দস্যু বনহুরের কাছে সবের চেয়ে নারীর মর্যাদা অনেক বেশি।
দরজায় পদশব্দ শোনা যায়।
বনহুর মনিরাকে মুক্ত করে দিয়ে সোজা হয়ে বসে।
মরিয়ম বেগম একটু কেশে নিজের উপস্থিতি জানিয়ে কক্ষে প্রবেশ করেন। হাতে তার রাশিকৃত খাবার।
টেবিলে রেখে বলেন মরিয়ম বেগম–বাবা মনির, এসো খাও মনিরা তুমিও খাও ওর সঙ্গে।
হাঁ এসো মনিরা মায়ের হাতে রান্না জিনিস আমরা দু’জনা মিলে খাই।
মনিরাও উঠে স্বামীর সঙ্গে টেবিলে এসে বসে।
মরিয়ম বেগম নিজে পরিবেশন করে খাওয়ান।
মনিরা খাচ্ছিলো স্বামীর সঙ্গে হঠাৎ মুখভাব গম্ভীর বিষণ্ণ হয়ে উঠে, খাবার মুখে না তুলে চুপ হয়ে থাকে সে।
বনহুর বলে কি হলো মনিরা?
কিছু না।
তুমি খাচ্ছো না কেনো?
খেতে পারবোনা।
মরিয়ম বেগম বললেন–অসুস্থ লাগছে বুঝি?
না মামীমা।
তবে কি হলো মা মনি?
আমার নূরের কথা মনে পড়েছে। না জানি নূর কোথায়? বেঁচে আছে কিনা তাই বা কে জানে।
বনহুর এবার ভাবাপন্ন হয়ে পড়ে বলে সে মনিরা নূরের জন্য তুমি ভেবোনা। নূর যেখানেই থাক সে ভালই আছে।
কিন্তু আমার মন কেমন যেন অস্থির লাগছে। নূরের মুখখানা ভাসছে আমার চোখের সামনে।
মরিয়ম বেগম মনিরার মাথায় হাত বুলিয়ে সান্ত্বনার সুরে বলেন–ছিঃ অতো চিন্তা করলে খারাপ হবে। তোমার নূর নিশ্চয়ই ভাল আছে। খোদা তাকে কিছুতেই কষ্ট দিতে পারে না।
আমার নূর ভাল আছে–কি করে জানবো আমি?
বনহুর এবার বলে উঠে–আমি বলছি সে ভাল আছে।
এক সময় বনহুর আর মনিরার খাওয়া শেষ হয়ে যায়। মরিয়ম বেগম আজ তৃপ্তি সহকারে পুত্র এবং পুত্রবধুকে নিজের হাতে পরিবেশন করে খাওয়ালেন।
সারাটা দিন মরিয়ম বেগম ছেড়ে দিলেন না পুত্রকে। সন্ধ্যা হয়ে এলো এক সময় বনহুর যেন আজ শান্ত ছেলেটির মত চুপ হয়ে রইল। হাসি গল্প আর শুয়ে শুয়ে কাটিয়ে দিলো দিনটা।
মরিয়ম বেগম তো এমনটিই চান। মনে মনে খোদার কাছে হাজার শুকরিয়া করেন তিনি। কত দিনের আশা তার–একমাত্র সন্তান মনিরকে নিয়ে সুখের নীড় গড়বেন। আজ বুঝি আল্লাহতায়ালা তার আরজ কবুল করেছেন। মনিরের তাই বুঝি সুমতি হয়েছে আর সে চলে যাবে না।
মরিয়ম বেগম খেতে দিয়ে তখন বলেছিলেন–মনির, একটা কথা রাখবি বাবা?
বলো মা রাখবো।
আমার গায়ে হাত রেখে শপথ কর।
উঁহু তাহলে আমার শোনাই হোলনা তোমার কথাটা।
মরিয়ম বেগম বললেন–তোকে শুনতেই হবে মনির?
আমি তো শুনবনা বলিনি–বলেছি তোমার গা ছুঁয়ে শপথ করা আমার পক্ষে সম্ভব নয় মা।
তুই আর চলে যাবি না বাবা?
