জুলেখা বললো-মনিরা শান্ত হও। অমন উতলা হলে আবার অন্ধ হয়ে যাবে।
সেই ভাল ছিলাম জুলেখা সেই ভাল ছিলাম। দৃষ্টিশক্তি ফিরে পেয়ে কি লাভ হবে আমার? ওকে যদি না দেখতে পাই তাহলে দৃষ্টিশক্তি ফিরে পেয়ে কি হবে বলো? মনিরা দুই হাতের মধ্যে মুখ ঢেকে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলো।
জুলেখা ইংগিতে কক্ষ থেকে সকলকে বেরিয়ে যেতে বললো।
মরিয়ম বেগম ও সরকার সাহেব বেরিয়ে গেলেন। অন্যান্য সবাইও কক্ষ থেকে চলে গেলো বাইরে।
বনহুর এবার নিজের দাঁড়ি গোঁফ আর চোখের কালো চশমাটা খুলে ফেললো।
জুলেখা বললো–মনিরা চোখ তোল মনিরা।
না না, আমি চোখ তুলবো না। তোমরা যাও জুলেখা, আমাকে বিরক্ত করোনা। তোমরা যাও–
কিন্তু মনে রেখো মনিরা আবার যদি তুমি দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে ফেলে তাহলে নিজের ভুলের জন্য হারাবে। বেশ যেতে বলছো যাচ্ছি–
জুলেখা পাশের একটা থামের আড়ালে এসে দাঁড়ালো।
বনহুর তার মুখমন্ডলে কোন রকম ছদ্মবেশের আড়ম্বর না রেখে পাশে এসে বসলো।
মনিরা তখন হাটুর মধ্যে মাথা গুঁজে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে।
বনহুর মনিরার চিবুক ধরে উঁচু করে তুললো, ডাকলো– মনিরা!
মনিরা বিস্ময় বিস্ফারিত চোখে তাকালো, মুহূর্তে আনন্দে উজ্জল হয়ে উঠলো চোখ দুটো. দীপ্ত হয়ে উঠলো ওর। স্বামীর বুকে মাথা রেখে বললো–তুমি!
আড়ালে দাঁড়িয়ে সব লক্ষ্য করলো ডক্টর জুলেখা। মুখখানা বিষণ্ণ মলিন হলো একটা গভীর বেদনা অনুভব করলো সে অন্তরে। ধীরে ধীরে কক্ষ থেকে বেরিয়ে গেল সকলের অজ্ঞাতে।
বনহুর আর মনিরার মিলন দৃশ্য সে কিছুতেই যেন সহ্য করতে পারছিলোনা। কারণ জুলেখা চরমভাবে ভালোবেসেছিলো একদিন বনহুরকে। সে ভালবাসার মধ্যে ছিলোনা কোন ছলনা। জুলেখা যদি জানতো যাকে সে এমন গভীরভাবে ভালবাসছে সে মনিরার স্বামী, তাহলে হয়তো। ওর সান্নিধ্য জুলেখার হৃদয়ে এতো আলোড়ন সৃষ্টি করতো না।
সকলের অলক্ষ্যে জুলেখা বেরিয়ে এলো বাইরে।
বারান্দায় দেখা হলো মরিয়ম বেগমের সংগে। তিনি জুলেখাকে বেরিয়ে যেতে দেখে বললেন –সে কি মা, অমন করে চলে যাচ্ছ কেনো?
মনিরার চোখ ভাল হয়ে গেছে, আমার আর কোন দরকার হবেনা, কাজেই আমি চলে যাচ্ছি।
কথাটা বলে জুলেখা দ্রুত সিঁড়ি বেয়ে নেমে গেলো নিচে।
মরিয়ম বেগম অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলেন কিছুক্ষণ জুলেখার চলে যাওয়া পথের দিকে। ভাবলেন, জুলেখা চলে গেলো কিন্তু ডক্টর কওসার সাহেব তো গেলেন না।
মরিয়ম বেগম কক্ষে প্রবেশ করে অবাক হলেন, কোথায় ডক্টর কাওসার–এ যে তার সন্তান মনির।
মরিয়ম বেগম কক্ষে প্রবেশ করতেই বনহুর এলো মায়ের পাশে, বললো মা।
মরিয়ম বেগম হাস্য উজ্জল মুখে বললেন–তাই তো আমি চমকে উঠেছিলাম কাওসার সাহেবের কণ্ঠস্বর শুনে কিন্তু সাহস হয়নি কিছু বলবার।
বনহুর বললো এবার–মা মনিরার দৃষ্টিশক্তি লাভের জন্য আমরা সবাই ডক্টর জুলেখার কাছে ঋণী।
হাঁ বাবা, আল্লার ইচ্ছা আর সে না হলে মনিরা আমার কোনদিন এ দুনিয়ার আলো দেখতে পেতোনা। কিন্তু জুলেখা হঠাৎ অমন করে চলে গেলো কেনো?
বনহুর বলে উঠলো–ডক্টর জুলেখা চলে গেছেন?
হাঁ আমি তাকে জিজ্ঞাসা করলাম সে এভাবে চলে যাচ্ছে বলে, সে বললো–আমার আর দরকার হবেনা।
মনিরা বললো– আমাকে একটি কথাও না বলে চলে গেলো সে!
বনহুর আনমনা হয়ে গেলো কি যেন চিন্তা করে বললো–যেতে দাও মনিরা তাকে।
সেকি! আমার বান্ধবী আমার জন্য এতো করলো তার জন্যই আবার আমি তোমাকে দেখতে পাচ্ছি। ওগো আমি তাকে সন্তুষ্ট করতে না পারলে কিছুতেই শান্তি পাবোনা। কেননা সে চলে গেলো আমাকে কিছু না বলে? নিশ্চয়ই সে অভিমান করেছে–জুলেখা বড় অভিমানিনী।
মরিয়ম বেগম বললেন–হাঁ মনিরা, আমার সেই রকম মনে হচ্ছে। জুলেখা কেনো যেন, অভিমান করে চলে গেছে। মনিরা তোমরা দু’জনা যাও ওকে খুশি করতে চেষ্টা করো গে।
মনিরা বললো–আমি তাই যাবো। জুলেখা আমার দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে দিয়েছে, সে আমার কাছে যা চাইবে তাই দেবো।
মনিরা জুলেখা যা চায় দিতে পারবে? বললো বনহুর।
পারবো। আমার দৃষ্টির বিনিময়ে আমি তাকে সব দিতে রাজি আছি। তুমি আমাকে তার কাছে নিয়ে চলো।
মরিয়ম বেগম বললেন–মনিরা মা মনিরা ঠিক বলেছে। জুলেখাকে খুশি করতেই হবে যেমন করে হোক। ও যদি মন খারাপ করে তাতে মঙ্গল হবে না। বাবা, তুমি মনিরার কাছে বসো আমি কিছু খাবার তৈরি করে আনি, আমার বড্ড ক্ষুধা পেয়েছে।
বনহুরের কথা বুঝতে পেরে মনিরা হাসলো মুখ ফিরিয়ে।
মরিয়ম বেগম বেরিয়ে গেলেন কক্ষ থেকে। পুত্র এসেছে–আনন্দে আত্মহারা তিনি। বাড়ির চাকর-বাকরদের ডাকাডাকি হাকাহাকি শুরু করলেন। সরকার সাহেবকেও ব্যতিব্যস্ত করে তুললেন মরিয়ম বেগম।
হঠাৎ মরিয়ম বেগমের এতো খুশিভরা ভাব লক্ষ্য করে বাড়ির সবাই অবাক হলো, বিশেষ করে চাকর-বাকরের দল। কেনোনা, মরিয়ম বেগমকে তারা তেমন করে কোনদিন আনন্দ প্রকাশ করতে দেখেনি।
নিজেই উনানের পাশে এসে বসলেন, নিজের হাতে বেঁধে খাওয়াতে না পারলে তার যেন তৃপ্তি হচ্ছে না।
মরিয়ম বেগম চলে যেতেই বনহুর মনিরাকে বাহুবন্ধনে আবদ্ধ করে বললো–তোমার বান্ধবীকে তুমি খুশি করতে চাও কিন্তু সে যা চাইবে পারবে দিতে?
কেন পারবো না? যে আমার এতো বড় উপকার করেছে তাকে আমি আমার সর্বস্ব দিতে পারবো।
