মনিকে বুকের কাছে টেনে নিয়ে নূরীও চোখ বন্ধ করে কিন্তু ঘুম তার চোখে আসে না, নানা চিন্তার উদয় হয় তার মনের মধ্যে। রহমান তাকে বাঁচানোর জন্যই আজ সব কিছু ত্যাগ করে। নিঃসম্বলভাবে বেরিয়ে এসেছে। শুধু তার জীবন রক্ষার জন্যই আজ সে সব ত্যাগ করেছে, কিন্তু কি লাভ এতে রহমানের। রহমান নূরীকে গভীরভাবে ভালোবাসে, সমস্ত অন্তর দিয়ে নূরীকে কামনা করে সে, একথা জানে-বুঝে নূরী। তবু নূরী কোন দিন রহমানকে ধরা দেবে না দিতে পারে না। ছোট বেলায় জ্ঞান হাবার পর সে একজনকেই ভালবেসেছে– সে হলো বনহুর। তার। মন প্রাণ জীবন সমর্পণ করেছে ওর কাছে। নূরী যত দূরেই সরে যাক তবু ভুলতে পারবে না কোন দিন তাকে।
বনহুর তাকে হত্যা করতে চেয়েছিলো–কিন্তু তার কি অপরাধ? আইনের চোখে সত্যই সে অপরাধী নরহত্যাকারী, বিচারের মৃত্যুদন্ডই তার প্রাপ্য।
বনহুরকে সে কোন সময় দোষ দিতে পারে না নিয়মের ব্যতিক্রম করা তার কাজ নয়। নিয়ম মেনে চলাই দস্যু বনহুরের কাজ।
কখন ঘুমিয়ে পড়েছে নূরী, হঠাৎ একটা নিশ্বাসের শব্দে ঘুম ভেঙে গেলো তার। চোখ মেলে। তাকাতেই বিস্ময়ে থ’ মেরে গেলো, রহমান বসে আছে তার শিয়রে নিৰ্ণিমেষ নয়নে তাকিয়ে আছে তার মুখের দিকে।
নূরী অস্ফুট কণ্ঠে বললো– তুমি।
রহমান সোজা হয়ে বসলো, শান্ত ধীরে কণ্ঠে বললো–নূরী, তোমাকে দেখছিলাম।
রহমান আমি জানতাম তুমি আমাকে এনে যে কোন সময় একটা কিছু দাবি করে বসবে।
নূরী, তুমি ভুল বুঝছো, আমি তোমাকে শুধু দেখছিলাম, তোমাকে স্পর্শ করার সাহস আমার নেই।
না না, আমি তোমার এ দৃষ্টি সহ্য করতে পারবো না।
নূরী, আমি এতোই হতভাগ্য যে, তোমাকে একটু প্রাণ ভরে দেখতেও পাবো না।
তুমি জানো–আমি ভালোবাসিনা তা—
নূরী, আমাকে মাফ করে দাও নূরী?
রহমান দু’হাতের মুঠোয় নিজের চুল চেপে ধরে। অধর দংশন করতে থাকে সে।
নূরী ক্রুদ্ধকণ্ঠে বলে–রহমান, আমি আর কোন দিন তোমাকে এ ভাবে দেখতে চাই না। যাও তুমি যাও ঘুমাও গে।
বেশ, আমি যাচ্ছি। নূরী, আমাকে ক্ষমা করো।
রহমান কথাটা বলে উঠে নিজের বিছানায় চলে যায়।
নূরী মনিকে বুকে টেনে নিয়ে পাশ ফিরে শোয়।
রাত বেড়ে আসে।
*
মনিরার কক্ষে প্রবেশ করে তার বিছানার পাশে এসে দাঁড়ালো ডক্টর জুলেখা আর বনহুর। বনহুরের শরীরেও ডাক্তারের ড্রেস।
মরিয়ম বেগম আর সরকার সাহেবও রয়েছে তাদের সঙ্গে।
মরিয়ম বেগম বললেন–মা, মনিরা তোমার বান্ধবী ডক্টর জুলেখা এসেছে, আর এসেছে ডক্টর কাওসার।
বনহুর ডক্টর কাওসারের বেশেই আজ এসেছিলো এখানে। তার মুখেছিলো ঘন চাপ দাড়ি আর চোখে কালো চশমা। নিখুঁত ছদ্মবেশ বনহুরের তাই তার জননীও তাকে চিনতে সক্ষম হয়নি।
ডক্টর জুলেখা মনিরার কাঁধে হাত রাখলো–মনিরা আজ তোমার চোখের পটি খুলে দেব? বলো, কাকে তুমি প্রথম দেখতে চাও?
মনিরা একটা দীর্ঘশ্বাস ত্যাগ করে বললো–যাকে দেখতে চাই তাকে তুমি কোথায় পাবে?
বলো আমি তাকে নিয়ে আসবো।
তাকে পাবে না।
আমি কথা দিচ্ছি–যাকে তুমি দেখতে চাও তাকেই তুমি প্রথম দেখতে পাবে।
বেশ, আমার স্বামীকে আমি দেখতে চাই। কিন্তু মনে রেখো, তাকে যদি না দেখতে পাই তাহলে–না না, তাহলে আমি দৃষ্টিশক্তি ফিরে চাইনা। অন্ধ আছি তাই আমি ভাল আছি– জুলেখা তাই আমি ভাল আছি।
মনিরা আমার সমস্ত পরিশ্রম পন্ড করে দিও না। সরে এসো তোমার চোখের পট্টি খুলে দি। কথাটা বলে জুলেখা মনিরার চোখের পট্টি খুলতে গেলো।
মনিরা জুলেখার হাত মুঠায় চেপে ধরলো– সে আজ আসবে। তুমি অপেক্ষা করো। আমি প্রথম দৃষ্টি শক্তি লাভ করে তাকেই দেখতে চাই।
ডক্টর কাওসারের বেশে বনহুর এবার কথা বললো–মিসেস মনিরা, আপনি অযথা সময় নষ্ট করছেন?
মুহূর্তে মনিরার মুখমন্ডল দীপ্ত উজ্জ্বল হয়ে উঠলো। স্বামীর কণ্ঠস্বর তার অন্তরে মধু বর্ষণ করলো যেন। চোখে না দেখলেও বুঝতে পারলো সে, কণ্ঠস্বর তার স্বামীর ছাড়া আর কারো নয়।
বললো এবার মনিরা–দাও জুলেখা আমার চোখের পট্টি খুলে দাও।
জুলেখার মুখ আনন্দে উজ্জ্বল হলো।
মরিয়ম বেগম বেশ চিন্তায় পড়ে গিয়েছিলেন, তিনিও আশ্বস্ত হলেন।
সরকার সাহেব খুশি ভরা চোখে তাকিয়ে আছেন আজ মনিরার চোখের পট্টি খুলে দেওয়া হবে, আবার দেখতে পাবে মনিরা–একি কম খুশির কথা!
ততক্ষণে বাড়ির অন্যান্য সবাই এসে দাঁড়িয়েছে কক্ষ মধ্যে।
নকীবও দাঁড়িয়ে আছে এক পাশে।
ডক্টর জুলেখা মনিরার চোখের পট্টি খোলায় ব্যস্ত।
ব্যাকুল আগ্রহ নিয়ে তাকিয়ে আছে বনহুর মনিরার দিকে। আজ কিছুক্ষণ পূর্বেই সে শহরে এসে পৌঁছতে সক্ষম হয়েছে। তাজের কৃতিত্বেই সে এত দূরের পথ আসতে পেরেছে।
বনহুর মনিরার ঠিক সম্মুখে দাঁড়িয়ে রইলো।
মরিয়ম বেগম ও সরকার সাহেব দাঁড়িয়ে আছেন পাশে।
জুলেখা মনিরার চোখের পট্টি খোলা শেষ করে সোজা হয়ে দাঁড়ালো। কিছুক্ষণ স্থির নয়নে। তাকিয়ে থেকে বললো সে–চোখ মেলো মনিরা।
মনিরা ধীরে ধীরে চোখ মেলে তাকালো।
সমস্ত দুনিয়াটা ঝাপসা লাগছে তার চোখে। কেমন ঘোলাটে সব! মনিরার চোখের সামনে একটি আলো জ্বেলে দিলো জুলেখা উজ্জ্বল আলো।
মনিরা এবার দেখলো তার সম্মুখে একটি অপরিচিত মুখ। মুখটা ওর কালো হয়ে উঠলো, অস্ফুট কণ্ঠে বললো না না, আমি এ দৃষ্টিশক্তি চাই না। আমি এ দৃষ্টিশক্তি চাই না। আলো নিভিয়ে দাও জুলেখা আলো নিভিয়ে দাও!
