বনহুর বললো–কায়েস, জানো আমি কোন দিন অপরাধীকে ক্ষমা করিনা। রহমান আর নূরীকে পালানোর সুযোগ দিয়ে তুমি ভুল করেছে। যত শীঘ্র পারো রহমান আর নূরীকে খুঁজে বের করে আমার সম্মুখে হাজির করো। যাও–
সর্দার আমি জানি না তারা কোথায় গেছে।
জানোনা আবার মিথ্যা কথা?
সর্দার, আমি শপথ করে বলছি–তারা কোথায় গেছে জানিনা। কান্দাই শহরে তারা নেইএটুকুই শুধু জানি।
বনহুর কিছু চিন্তা করলো, তারপর বললো –যাও, দাইমাকে কারাকক্ষ থেকে বের করে দাও।
আচ্ছা সর্দার।
বেরিয়ে যায় বনহুর।
কায়েস নত মস্তকে অনুসরণ করলো সর্দারকে।
বনহুর বেরিয়ে এলো দরবার কক্ষ থেকে।
এই মুহূর্তে তাকে যেতে হবে কান্দাই রাজধানীতে। মনিরার চোখের পট্টি আজ খুলে দেওয়ার তারিখ, কিন্তু বনহুরের মনের অবস্থা আজ অত্যন্ত খারাপ। কেননা তা সে নিজেই জানেনা।
কায়েসকে বললো বনহুর-কায়েস, তাজকে প্রস্তুত করতে হলো আমাকে যেতে হবে।
এখনই কি বাইরে যাবেন সর্দার?
হাঁ।
কায়েস চলে গেলো।
বনহুর এগুলো নিজের কক্ষে।
স্বাভাবিক ড্রেসে বনহুরের শহরে যাওয়া সম্ভব নয়, রাতের অন্ধকারেই সে শহরে যেতো। আজ তার ব্যতিক্রম ঘটলো। বনহুর যখন ড্রেসিংরুম থেকে বের হলো তখন তার দেহে সম্পূর্ণ ডাক্তারী ড্রেস। চোখে চশমা, গলার সঙ্গে লটকানো স্ট্যাথিসস্কোপ।
বনহুর কায়েসের সঙ্গে কিছুক্ষণ আলাপ করলো, তারপর বেরিয়ে গেলো আস্তানা থেকে।
মস্ত শহর আরাকান।
বিচিত্র শহরে বৈচিত্রময় মানুষ। অদ্ভুত তাদের পোশাক পরিচ্ছদ, অদ্ভুত তাদের কথাবার্তা আর চাল-চলন। শহরে দোকান-পাট এবং দালান-কোঠাগুলিও অন্যান্য দেশের চেয়ে ভিন্ন। রকমের। পথ-ঘাট-গুলিও সম্পূর্ণ আলাদা।
অজানা অচেনা দেশ আরাকান শহর।
রহমান নূরী আর মনি সহ এই শহরে এসে উপস্থিত হলো। কান্দাই শহর থেকে হাজার হাজার মাইল দূরে এই শহর। এখানে কেউ চেনেনা রহমান নূরী আর মনিকে।
একটা গাছের তলায় নেমে দাঁড়ালো ওরা তিন জনা। ক্ষুধায় পিপাসায় অত্যন্ত কাহিল হয়ে পড়েছিলো নূরী আর মনি। বিশেষ করে মনির জন্য চিন্তিত হয়ে পড়েছিলো রহমান।
সারাটা রাত্রি আর গোটা একটা দিন মিলে দ্রুত ঘোড়া ছুটিয়ে তারা এই আরাকান শহরে এসে পৌঁছতে সক্ষম হয়েছে।
নূরী বললো–আর যেতে পারব না, কণ্ঠনালা আমার শুকিয়ে এসেছে। আর মনির অবস্থা দেখছো?
রহমান মনিকে কোলে নিয়ে রুমালে তার কপালের ঘাম মুছে দিচ্ছিলো, বললো–নূরী, তুমি ভেবোনা, এই আরাকান শহরেই আমরা থাকবো। কান্দাই শহর হতে এ শহর অনেক বড়। এখানে নানা দেশের মানুষ বাস করে। আমরা তাদের মধ্যে আত্মগোপন করে জীবন কাটিয়ে দেবো। নূরী, দস্যুতা আমি করবো না, সৎ উপায়ে অর্থ উপার্জন করাই আমার কাজ। আর মনিকে লেখাপড়া শিখিয়ে মানুষ করাই হবে আমার জীবনের ধর্ম।
নূরীর চোখে মুখে ফুটে উঠে এক দীপ্তভাব, বলে সে–হাঁ আমিও তাই চাই রহমান। দস্যু দুহিতা আমি, কিন্তু দস্যুতাকে আমি এখন ঘৃণা করি।
রহমান অস্ফুট আনন্দধনি করে উঠে নূরী। নূরী সত্যি তুমি এ কথা বলছো?
হাঁ সত্যি।
রহমান আর নূরীর যখন কথাবার্তা হচ্ছিলো তখন মনি নীরবে অশ্রু বর্ষণ করছিলো।
রহমান বললো–মনি কেঁদো না বাবা, আমি তোমার জন্য এক্ষুণি খাবার নিয়ে আসছি।
মনি বলে উঠলো–আমি বাপির কাছে যাবো। আমার ক্ষুধা পায়নি।
মনির কথায় অবাক হলো রহমান।
নূরীর চোখ দুটো অশ্রু ছলছল হলো বললো–তোমার বাপি আমাদের তাড়িয়ে দিয়েছে মনি, আর তার কাছে যাওয়া হবে না।
না, আমি বাপির কাছে যাবো।
রহমান আর নূরী অনেক করে শান্ত করার চেষ্টা করতে লাগলো।
আশ্চর্য হলো নূরী বনহুরের প্রতি মনির এতো অন্তরের টান হলো কি করে।
মনির কথায় নূরী আশ্চর্য হলেও রহমান বিস্মিত হলো না। সে জানে, মনি তার সর্দারকে? বনহুরের সঙ্গে যে মনির রক্তের সম্বন্ধ আছে তা এক রহমান আর কায়েস ছাড়া কেউ জানে না।
একটা হোটেল বাড়িতে আশ্রয় নিল ওরা।
রহমান টাঙ্গী চালায়।
সারাদিন পথচারী আরোহীদের নিয়ে ভাড়া খাটে রহমান ফিরে আসে সন্ধ্যায়। আসার পথে ময়দা আর মাংস নিয়ে আসে।
নূরী প্রতিক্ষা করে রহমানের।
হয়তো মনি ঘুমিয়ে পড়ে।
রহমানের কোনদিন ফিরতে বিলম্ব হয়, চিন্তায়, অস্থির হয়ে পড়ে নূরী, এতোক্ষণ ফিরে না আসারই বা কারণকি? ছোট্ট চালা ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে থাকে।
ঘর্মাক্ত কলেবরে রহমান এসে দাঁড়ায় নূরীর সম্মুখে। গামছায় কপালের ঘাম মুছে বলে– অনেক দূরে গিয়েছিলাম তারই বড্ড দেরী হয়ে গেলো। মনি ঘুমিয়ে পড়েছে বুঝি?
হাঁ, মনি ঘুমিয়ে পড়েছে।
রহমান জামার পকেট থেকে একটা লাল রঙএর জামা বের করে বললো–মনির জন্য এনেছি।
কি দরকার ছিলো এখনই জামার?
একটিমাত্র জামা ওর সম্বল সব তো ছেড়ে এসেছো–তাই নিলাম।
নূরী রহমানের হাত থেকে জামাটা নিয়ে বললো–চলো খাবার ঠান্ডা হয়ে গেছে।
চলো নূরী।
রহমানকে খেতে দিয়ে নূরী পাশে বসে থাকে গল্প করে কত দূরে গিয়েছিলো, কোথায় গিয়েছিলো–সব খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে বলে সে।
রহমান খেতে খেতে নূরীর কথার জবাব দেয়।
রহমানের খাওয়া শেষ হলে শুয়ে পড়ে সে। ওদিকের দড়ির খাটিয়া খানায় রহমান শোয়। আর মেঝেতে কম্বল বিছিয়ে শোয় নূরী আর মনি।
সারাদিনের পরিশ্রমের পর রহমান শুতে শুতেই ঘুমিয়ে পড়ে।
