জোবাইদাকে যে তারা ভালোবাসতো না তা নয়, কিন্তু যে গেছে আর সে ফিরে আসবে না– তাই বনহুরের অনুচরগণ চায় না নাসরিনের মৃত্যুদন্ড হয়।
কিন্তু সর্দারের আদেশ লঙ্ঘন হওয়ার উপায় নেই।
বনহুর তার সুউচ্চ আসনে উপবেশন করতেই কায়েস এসে দাঁড়ালো রহমানের স্থানে।
বনহুর গম্ভীর কণ্ঠে বললো–রহমান কোথায়? ওকে দেখছি না কেনো?
কায়েস মাথা নত করে বললো– রহমান কোথায় জানি না, তবে এই চিঠিখানা তার কক্ষে পেয়েছি।
চিঠি!
হাঁ সর্দার।
রহমান কায়েসের হাত থেকে চিঠিখানা নিয়ে একবার দৃষ্টি বুলিয়ে নিলো, তারপর আরও দু’তিনবার পড়লো সে চিঠিখানা।
বনহুরের মুখভাব ক্ষণে ক্ষণে পাল্টাচ্ছিলো লক্ষ্য করছিলো তার অনুচরগণ। সবাই বুঝতে পারলো–ঐ চিঠিখানা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ চিঠি।
বনহুর এবার কায়েসকে লক্ষ্য করে বললো– দরবার কক্ষে নাসরিনকে নিয়ে আসার আদেশ দাও।
কায়েস ইংগিৎ করতেই দুইজন অনুচর বেরিয়ে গেলো।
অল্পক্ষণ পরে ফিরে এলো তারা নাসরিন সহ।
এখনও নাসরিনের হাত ও কোমরে দড়ি বাঁধা রয়েছে।
বনহুরের সম্মুখে নত মস্তকে দাঁড়ালো দড়ি বাধা রয়েছে।
বনহুরের সম্মুখে নত মস্তকে দাঁড়ালো নাসরিন। মুখভাব করুণ ব্যথা ভরা; সারা রাত্রি তার ঘুম হয়নি। মুখ শুকনো, চোখ দুটি জবা ফুলের মত লাল টকটকে হয়ে উঠেছে।
দরবার কক্ষস্থ সকলে একবার বেদনা ভরা চোখে হস্ত-পদ বন্ধন অবস্থায় নাসরিনের দিকে তাকিয়ে দেখে নিলো। সবাই রুদ্ধ নিশ্বাসে প্রতিক্ষা করছে–এবার সর্দার নাসরিনের মৃত্যুদন্ডের আদেশ দেবেন।
দরবার কক্ষে একটু কোন শব্দ হচ্ছে না। সবাই স্থিরভাবে দাঁড়িয়ে আছে পাথরের মূর্তির মত।
বনহুর চিঠিখানায় আর একবার দৃষ্টি বুলিয়ে নিয়ে বললো– জোবাইদার হত্যাকারী সন্দেহে নাসরিনের মৃত্যুদন্ডাদেশ দেওয়া হয়েছিলো, কিন্তু নাসরিন জোবাইদার হত্যাকারী নয়।
কক্ষমধ্যে একটা মৃদু আনন্দধ্বনি হলো।
বনহুরের মুখের পানে তাকালো নাসরিন তার চোখ দুটো যেন জ্বল জ্বল করে জ্বলছে।
বনহুর বললো আবার–নাসরিনকে মুক্ত করে দাও।
কয়েস নিজ হস্তে নাসরিনের হাত এবং কোমরের বন্ধন মুক্ত করে দিলো।
নাসরিন ছুটে গিয়ে বনহুরের পা জড়িয়ে ধরলো-সর্দার।
যাও নাসরিন তুমি মুক্ত।
সর্দার! নাসরিন কথাটা উচ্চারণ করে উঠে দাঁড়ালো।
দরবার কক্ষে সকলেরই মুখের ভাব প্রসন্ন হলো।
মাহবুব বলে উঠলো–সর্দার তাহলে জোবাইদাকে কে হত্যা করেছে আমরা জানতে চাই?
একটু পরেই জানতে পারবে। কায়েস তুমি এই চিঠিখানা পড়ে এদের শুনিয়ে দাও।
কায়েস বনহুরের হাত থেকে রহমানের লিখিত চিঠিখানা নিয়ে পড়তে শুরু করলো—
“সর্দার, জোবাইদার হত্যাকারীর সন্ধান আমি পেয়েছি। নাসরিন সম্পূর্ণ নির্দোষ, জোবাইদার হত্যাকারী সে নয়। আজ কিছু দিন যাবৎ আস্তানায় যে প্রেত আত্মার আবির্ভাব
ঘটেছিলো, আসলে সেই ছিলো জোবাইদার হত্যাকারী। আজ রাতে আমি তাকে গ্রেপ্তার করেছিলাম এবং প্রেত আত্মাবেশী ছায়ামূর্তির আসল পরিচয় আমি পেয়েছি সে হচ্ছে নূরী। নূরীই জোবাইদার হত্যাকারিণী। জানি নূরী অপরাধী এবং তার উচিৎ শাস্তি মৃত্যুদন্ড। কিন্তু আমি তাকে মরতে দিতে পারি না। তাই সর্দারের বিনা অনুমতিতে আমি নূরী আর মনিকে নিয়ে দূরে চলে গেলাম। কোথায় যাচ্ছি জানি না। হয়তো জীবনে আর ফিরে আসবো কিনা। তাও জানি না।
সর্দার, আমাকে ক্ষমা করবেন। নূরীর কোন দোষ নেই, সে মরণে ভয় করে না। আমি তাকে জোরপূর্বক নিয়ে গেলাম। মনির জন্য চিন্তা নেই, ওকে আমি মানুষ করবো।
–আপনার বিশ্বস্ত অনুচর
রহমান”
কায়েস চিঠি পড়া শেষ করলো।
কক্ষমধ্যে একটা সঁচ পড়ার শব্দও শোনা যাবে না। বনহুর স্থিরভাবে বসেছিলো তার আসনে। মুখভাব অত্যন্ত গম্ভীর কঠিন। চোখ দুটো আগুনের ভাটার মত জ্বলছে।
এবার বনহুর উঠে দাঁড়ালো দৃঢ় কণ্ঠে বললো– তোমরা নিশ্চয়ই সব বুঝতে পেরেছে। রহমান নিজের পায়ে নিজে কুঠারাঘাত করেছে। নূরী দোষী জেনেও তাকে সে রক্ষার জন্য এক অদ্ভুত উপায় অবলম্বন করেছে। রহমানকে এর জন্য কঠিন শাস্তি ভোগ করতে হবে–
কায়েস বলে উঠলো–সর্দার, রহমান যা করেছে তা অতি মহান কাজ। আমরা সবাই তার হয়ে ক্ষমা চাইছি।
ক্ষমা!
হাঁ সর্দার, আমরা সবাই রহমানের অপরাধের জন্য ক্ষমা চাই। এক সঙ্গে বলে উঠলো সকলে।
বনহুর পূর্বের ন্যায় হুঙ্কার ছাড়লো আমার আদেশ–তোমরা রহমান আর নূরীকে খুঁজে বের করতে চেষ্টা করো। নিয়মের ব্যতিক্রম করা বনহুরের স্বভাব নয়। যাও, আজ তোমাদের ছুটি।
বনহুরের অনুচরগণ আনন্দে উৎফুল্ল হয়ে উঠলো।
তারা জানে সর্দার ক্রুদ্ধ হয়ে কোনদিন তাদের ছুটি দেন না, আজ তার পরিবর্তন লক্ষ্য করে খুশি হলো সবাই।
অল্পক্ষণে দরবার কক্ষ ফাঁকা হয়ে গেলো।
নাসরিনও বেরিয়ে গেলো ধীর পদক্ষেপে।
কায়েস এবার বললো–সর্দার, রহমান অপরাধী হতে পারে, কিন্তু তার হৃদয় বড়ই উন্নত। তাকে ক্ষমা করে দিন সর্দার।
বার বার এক অনুরোধ আমাকে করো না কায়েস! এই দন্ডে আমি তোমাকে হত্যা করার আদেশ দিতাম, কারণ তুমি ও রহমান ও নূরীকে পালানোর সুযোগ করে দিয়েছে।
সর্দার!
আমার কাছে গোপন করার চেষ্টা করো না কায়েস।
কায়েস আর কোন কথা বলতে পারলোনা। সর্দারের মুখের উপর মিথ্যা বলার সাহস হলো তার।
