সেই পথেই নূরী আস্তানার বাইরে যাওয়া-আসা করতো শরীরে থাকতো তার জমকালো ড্রেস। জোবাইদার কবরের পাশে যেতো এবং মনের বেদনা লাঘব করার জন্য রোদন করতো সে। কখনও বা যেতো নাসরিনের কারাকক্ষের পাশে। নাসরিনের মৃত্যুদন্ডাদেশ তাকে উন্মাদ করে তুলেছিলো। জোবাইদাকে সে হত্যা করেছে আবার তার জন্যই নির্দোষ নাসরিনের মৃত্যু ঘটবে, ভাবতেই নূরীর বুকের মধ্যে তুফান বয়ে যেতো। নূরী আস্তানার মধ্যে অস্থিরভাবে চলাফেরা করতো। সবাই তাকে দেখেছিলো সন্দেহ করেছিলো ছায়ামূর্তি অন্য কেউ নয়, জোবাইদার প্রেত আত্মা।
আজ বনহুর ছায়ামূর্তির আসল পরিচয় জানতে পেরেছিলো। জানতে পেরেছিলো কে এই জোবাইদার প্রেত আত্মাবেশী ছদ্মবেশিনী। বনহুরের প্রথমেই সন্দেহ জেগেছিলো, সন্দেহ তার সত্যে পরিণত হলো।
নূরী মনিকে বুকে আঁকড়ে ধরে কাঁদতে লাগলো। এই রাতটুকুই তার জীবনের শেষ সময় কাল ভোরে নাসরিনের মুক্তি হবে আর তার হবে মৃত্যু।
নীরবে অশ্রু বর্ষণ করে চলেছে নূরী।
এমন সময় দরজায় মৃদু আঘাতের শব্দ হলো, সঙ্গে সঙ্গে চাপা কণ্ঠস্বর নূরী—
নূরী উঠে দাঁড়ালো দরজা খুলে দিতেই অবাক হলো–রহমান দাঁড়িয়ে আছে দরজায়।
নূরীকে দেখেই রহমান ব্যস্তভাবে বললো–শীগগীর তৈরি হয়ে নাও নূরী এক্ষুণি পালাতে হবে।
অবাক কণ্ঠে বললো নূরী –এ তুমি কি বলছো রহমান?
আর এক মুহূর্ত বিলম্ব করো না–
না না, আমি পালাতে পারবো না। রহমান নূরী মৃত্যু ভয়ে ভীত নয় জেনো।
নূরী, আমি তোমাকে মরতে দেবো না।
তা হয় না রহমান।
তোমাকে বাঁচতে হবে নূরী, তোমাকে বাঁচতে হবে।
তুমি আমাকে ভালবাসো জানি, সেই কারণেই তুমি আমার মৃত্যুদন্ড সহ্য করতে পারবেনা, এই তো?
না, তা নয় নূরী। আমি তোমাকে ভালবাসি সত্য কিন্তু তার চেয়ে তোমাকে বেশি ভালবাসেন আমাদের সর্দার, তোমাকে– তোমাকে বাদ দিয়ে তিনি বাঁচতে পারেন না।
রহমান! অস্ফুট শব্দ করে উঠলো নূরী।
রহমান বললো আবার–আইনের কাছে সর্দার কাউকে ক্ষমা করেন না, করতে পারেন না। তাই–তাই তিনি তোমার প্রতি–কিন্তু জানো নূরী, সর্দারের হৃদয়ে আজ কি মর্মবেদনা শুরু হয়েছে? অসহ্য যন্ত্রণা তার অন্তরকে দগ্ধীভূত করে চলেছে।
আমি সব জানি সব বুঝি নূরী। সর্দার কাল ভোরে তোমার মৃত্যুদন্ড দেবেন সত্য কিন্তু তার জীবনের একটা অংশ খসে যাবে সেই দন্ডে। নূরী সর্দার তোমার মৃত্যু সহ্য করতে পারবে না। আমি জানি তুমি তার কতখানি প্রিয়।
রহমান এসব তুমি কেনো আমাকে শোনাচ্ছো?
যেমন করে হোক তোমাকে বাঁচতে হবে। তোমার মৃত্যু শুধু মনিকেই মাতৃহারা করবে না, সমস্ত আস্তানায় বিষাদের কালিমা লেপন করে দেবে। নূরী, সর্দার ভেঙে পড়বে তোমার অদর্শনে
রহমান–রহমান—
নূরী সময় বেশি নেই, তৈরি হয়ে নাও।
কিন্তু—
আর কিন্তু নয়।
নাসরিন মৃত্যু! বিনা দোষে নাসরিনের মৃত্যু হবে–এই তুমি চাও?
না। নাসরিনের মৃত্যুদন্ড হবে না। আমি একটা চিঠিতে সব লিখেছি এবং কায়েসকে সব খুলে বলেছি। কাল ভোরে প্রকাশ্য দরবারে সে ঐ চিঠি পাঠ করে সবাইকে জানিয়ে দেবে– নাসরিন জোবাইদার হত্যাকারী নয়। সর্দার নিশ্চয়ই ক্রুদ্ধ হবেন তোমাকে আর আমাকে না দেখে। নূরী, এখন আমরা বহুদূরে চলে যাবো, কান্দাই সীমানা পার হয়ে আর এক রাজ্যে।
এটা কি ভাল হবে রহমান?
আমি জানি ভাল হবে, তুমি বাঁচতে না চাইলেও তোমাকে বাঁচতে হবে নূরী—
আর মনি? মনিকে ছেড়ে আমি বাঁচতে পারবো?
মনিও থাকবে আমার সঙ্গে।
রহমান!
চলো নূরী আর বিলম্ব করো না।
নূরী ঘুমন্ত মনিকে কোলে তুলে নিলো–চলো।
রহমান নূরীর কোলে থেকে মনিকে নিজের কোলে নিয়ে অন্ধকারে অগ্রসর হলো।
রহমান কায়েসকে সব কথা বলেছিলো।
আস্তানার বাইরে কায়েস অশ্ব দুলকী ও আরও একটি অশ্ব নিয়ে অপেক্ষা করছিলো।
রহমান নূরী ও মনিসহ এসে দাঁড়ালো কায়েস এবং অশ্ব দুইটির পাশে।
মনি জেগে উঠেছিলো বললো–আমাকে নিয়ে তোমরা কোথায় যাচ্ছো আম্মি?
নূরী বললো–অনেক দূরে–পরে শুনো। এখন চুপ করে থাকো বাবা।
রহমান মনিসহ উঠে বসলো দুকীর পিঠে। আর নূরী অপর অশ্বটির পিঠে।
কায়েস অশ্রুভরা নয়নে, বাষ্পরুদ্ধ কণ্ঠে বললো–আবার কবে দেখা হবে?
রহমান বললো- জানিনা।
নূরী বললো–কায়েস, আমার বনহুর রইলো ওকে দেখো।
কায়েস বললো–আমরা থাকতে সর্দারের জন্যে চিন্তা করোনা নূরী। খোদ হাফেজ। বললো নূরী।
অশ্ব দুটি তখন ছুটতে শুরু করেছে।
রহমান আর নূরীর অশ্ব অদৃশ্য হতেই কায়েস ফিরে চললো। আজ থেকে রহমানের সমস্ত কাজ তারই করতে হবে। সব দায়িত্ব এখন কায়েসের।
রহমান জানতো তার অবর্তমানে একমাত্র কায়েস ছাড়া কেউ তার কার্যভার গ্রহণ করতে সক্ষম হবে না। রহমান তাই কায়েসকেই বিশ্বাস করে সব কথা বলেছিলো, আর একটা চিঠি সে লিখে রেখে গিয়েছিলো বনহুরের কাছে।
*
বনহুর দরবার কক্ষে এসে পৌঁছলো, তার মুখমন্ডল গম্ভীর ভাবাপন্ন।
সবাই তখন দরবার কক্ষে এসে জমায়েত হয়েছে।
বনহুরের অনুচরগণের প্রত্যেকেরই মুখে আজ বিষাদের ছায়া। সকলেই নত মুখে দাঁড়িয়ে আছে, কেউ কোন কথা বলছে না। আজ নাসরিনের মৃত্যুদন্ড এ কথা জানে বলেই কারো মুখ। হাসি নেই। আস্তানায় সকলেই ভালবাসতো নাসরিনকে। তাই নাসরিনের মৃত্যুদন্ড কেউ খুশি মনে গ্রহণ করতে পারছিলো না।
